মো. কামরুল ইসলাম, নবীনগর (ব্রাহ্মণবাড়িয়া) প্রতিনিধি : দখল ও দীর্ঘদিন খনন না হওয়ায় ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর উপজেলার ঐতিহ্যবাহী আলীয়াবাদ খাল এখন প্রায় অস্তিত্ব সংকটে। একসময় খরস্রোতা এ খাল এখন সরু ড্রেনে পরিণত হয়েছে। পানি চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সামান্য বৃষ্টিতেই জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হচ্ছে। তলিয়ে যাচ্ছে ইরি-বোরো ধানের ক্ষেত। অন্যদিকে শুকনো মৌসুমে সেচের পানির অভাবে দুর্ভোগে পড়েছেন শত শত কৃষক।
উপজেলার শ্রীরামপুর মৌজার ২৪৫ দাগের ১ নম্বর খাস খতিয়ানভুক্ত খালটি জেলা এলএ শাখায় ‘কুট্টাপাড়া ফিসারি জলমহাল’ নামে পরিচিত। সরকারি ম্যাপে খালটির দৈর্ঘ্য প্রায় ২ হাজার ৪০০ ফুট এবং প্রস্থ ৬০ থেকে ১০০ ফুট থাকলেও বর্তমানে সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, খালটির অধিকাংশ অংশ ভরাট হয়ে মাত্র তিন থেকে চার ফুট প্রশস্ত সরু ড্রেনে রূপ নিয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বুড়ি নদী থেকে শুরু হয়ে মাঝিকাড়া ও আলীয়াবাদ গ্রামের উত্তর পাশ দিয়ে প্রবাহিত হয়ে খালটি ভাটা নদীতে গিয়ে মিশেছে। স্থানীয় প্রবীণদের ভাষ্যমতে, ১৯৭৯ সালে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এ খালের পাড় দিয়ে হেঁটে ভাটা নদী খনন কাজের উদ্বোধন করেছিলেন। তখন খালটি ছিল প্রশস্ত ও গভীর।
স্থানীয় সার্ভেয়ারদের পরিমাপে জানা গেছে, কয়েক দশক আগেও খালটির প্রস্থ কোথাও ৬০, কোথাও ৮০, আবার কোথাও ১০০ ফুট পর্যন্ত ছিল। তবে দীর্ঘদিন খনন না হওয়ায় প্রভাবশালীরা খালের পাড় ভরাট করে জমির সঙ্গে সমান করে ফেলেছেন। ফলে খালটি তার স্বাভাবিক প্রবাহ হারিয়েছে। খালটি ভরাট হয়ে যাওয়ায় এখন পানি নিষ্কাশন প্রায় বন্ধ। সামান্য বৃষ্টিতেই আলীয়াবাদ বিল এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হচ্ছে। চলতি মাসে কালবৈশাখী ঝড় ও টানা বৃষ্টিতে বহু কৃষকের পাকা ধান পানির নিচে তলিয়ে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
আলীয়াবাদ গ্রামের কৃষক ইউনুস আলী বলেন, “আগে এই খাল দিয়েই বিলের পানি দ্রুত নেমে যেত। এখন পানি নামতে না পারায় ফসল নষ্ট হচ্ছে। আবার শুকনো মৌসুমে সেচের পানিও পাওয়া যায় না।”
স্থানীয় বাসিন্দা ইকবাল হোসেন বসু বলেন, “খালটি ভরাট হয়ে যাওয়ার কারণে অনেক জমি অনাবাদি পড়ে থাকে। সামান্য বৃষ্টিতেই জমি পানির নিচে তলিয়ে যায়।”
হুমায়ুন কবির বলেন, “জমিতে দেওয়া সার ও কীটনাশক পানির সঙ্গে ভেসে যাচ্ছে। বাসাবাড়ি ও নর্দমার ময়লাও জমিতে গিয়ে ফসলের ক্ষতি করছে।”
স্থানীয় জেলেদের অভিযোগ, একসময় এই খালে প্রচুর মাছ পাওয়া যেত। মাছ বিক্রি করেই তাদের সংসার চলত। এখন খালটি প্রায় বিলুপ্ত হয়ে যাওয়ায় জীবিকা নির্বাহ কঠিন হয়ে পড়েছে। আলীয়াবাদ গ্রামের বীর মুক্তিযোদ্ধা আবদুল মান্নান বলেন, “ছোটবেলায় আমরা এই খালে সাঁতার কাটতাম, মাছ ধরতাম। বর্ষাকালে পালতোলা নৌকা চলত। এখন দেখে বোঝার উপায় নেই, এখানে একসময় বড় খাল ছিল।”
গ্রামের প্রবীণ বাসিন্দা জহিরুল হক সর্দার বলেন, “আলীয়াবাদ, মাঝিকাড়া ও নবীনগর শহরের বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনের অন্যতম মাধ্যম ছিল এই খাল। স্বাধীনতার আগে একবার খনন হয়েছিল। এরপর আর খনন না হওয়ায় মানুষ ধীরে ধীরে খাল ভরাট করে ফেলেছে।” খালটির সীমানা নির্ধারণ ও পুনঃখননের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা। তাদের মতে, খালটি পুনরুদ্ধার করা গেলে বৃষ্টির পানি সহজে নিষ্কাশন হবে এবং শুকনো মৌসুমে সেচব্যবস্থাও স্বাভাবিক হবে।
নবীনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মাহমুদুল হাসান বলেন, “খালটি দখল ও ভরাট হয়ে যাওয়ার বিষয়টি খোঁজ নিয়ে দেখা হবে। স্থানীয় সংসদ সদস্যের সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) খালিদ বিন মনসুর বলেন, “খালের জায়গা লিজ দেওয়ার কোনো বিধান নেই। কেউ লিজ নেওয়ার দাবি করলে প্রমাণপত্র নিয়ে আসতে হবে। তখন বিষয়টি যাচাই করা হবে।”