এম আর আমিন, চট্টগ্রাম : চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) বাস্তবায়নাধীন মেগাপ্রকল্পের কাজ দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করতে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্টরা জোর তৎপরতা চালাচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, প্রকল্পের আওতায় নদী খনন, তীর সংরক্ষণ, বাঁধ নির্মাণ ও অবকাঠামো উন্নয়ন কার্যক্রম চলছে। ইতোমধ্যে প্রকল্পের উল্লেখযোগ্য অংশ সম্পন্ন হয়েছে, যা স্থানীয়দের মাঝে আশার সঞ্চার করেছে।
প্রকল্প সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, কাজের গতি বাড়াতে দিন-রাত শ্রমিকরা কাজ করছেন। আধুনিক যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে দ্রুত সময়ের মধ্যে কাজ এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই প্রকল্পের কাজ শেষ করা সম্ভব হবে বলে তারা আশা প্রকাশ করেন।
১১৫৮ কোটি ৩৬ লাখ টাকা ব্যয়ে বাস্তবায়নাধীন এই বন্যা নিয়ন্ত্রণ, নিষ্কাশন ও সেচ প্রকল্পটি ৭টি ভাগে বিভক্ত। এর মধ্যে রয়েছে ফুটওভার ব্রিজ নির্মাণ, সেচ অবকাঠামো উন্নয়ন, খাল পুনঃখনন, বাঁধ নির্মাণ, নদীতীর সংরক্ষণ, ফ্লাড ওয়াল নির্মাণ এবং ভূমি অধিগ্রহণ।
বর্তমানে খালের দু’পাশে আরসিসি ব্লক দিয়ে তীর প্রতিরক্ষা কাজ চলছে। ভাটিখাইন, ছনহরা ও হাইদগাঁও ইউনিয়নে ৪.৪০ কিলোমিটার তীর প্রতিরক্ষা কাজের মধ্যে প্রায় ৩.৫০ কিলোমিটার ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। এসব ব্লক স্থাপনের ফলে শ্রীমাই খালের ভাঙন রোধ হবে।
পটিয়া বন্যা নিয়ন্ত্রণ প্রকল্পের আওতায় ৮টি রেগুলেটর নির্মাণ এবং ৩০.১০ কিলোমিটার খাল পুনঃখননের কাজ ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে। এছাড়া ১.৮০ কিলোমিটার নদীতীর সংরক্ষণ এবং ২.৭০ কিলোমিটার ফ্লাড ওয়াল নির্মাণ সম্পন্ন হয়েছে।
এ প্রকল্পের আওতায় মোট ৪৫টি প্যাকেজের মধ্যে বর্তমানে কাজ চলমান রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ২৫.৫১ কিলোমিটার বাঁধ নির্মাণ, ২৫টি রেগুলেটর, ২.৯৫ কিলোমিটার তীর সংরক্ষণ, একটি ফুটওভার ব্রিজ এবং ৩০.৫০ কিলোমিটার খাল খনন।
বাস্তব কাজের অগ্রগতিতে দেখা যায়, ১১টি খালের ৩০.২০ কিলোমিটার পুনঃখননের কাজ শতভাগ সম্পন্ন হয়েছে। এর মধ্যে গরুলুডা খালের ১০ কিলোমিটার, শ্রীমাই খালের ৫ কিলোমিটার, চানখালি খালের ৩.৫ কিলোমিটারসহ অন্যান্য খালের কাজ শেষ হয়েছে।
নদীতীর সংরক্ষণ কাজের ৯২ শতাংশ এবং ৪.১০ কিলোমিটার ফ্লাড ওয়াল নির্মাণের ৮৩ শতাংশ সম্পন্ন হয়েছে। এছাড়া নাইখাইন গ্রামে ফুটওভার ব্রিজ নির্মাণকাজের ৪০ শতাংশ শেষ হয়েছে। ২৫টি সেচ রেগুলেটরের মধ্যে ৬৮ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হয়েছে।
প্রকল্পের লক্ষ্য হলো পানি নিয়ন্ত্রণ অবকাঠামো নির্মাণের মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ খালগুলোতে পানি নিষ্কাশন ও ধারণক্ষমতা বৃদ্ধি করা এবং ফসল উৎপাদনের নিবিড়তা ১৯৪ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ২৩০.৫৪ শতাংশে উন্নীত করা। এছাড়া ১১টি খালে ৩০.২০ কিলোমিটার পুনঃখননের মাধ্যমে পানি ধারণক্ষমতা বৃদ্ধি করা হচ্ছে।
এই প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে শুষ্ক মৌসুমে প্রায় ৩২০০ হেক্টর জমিতে সেচ সুবিধা পাওয়া যাবে। পাশাপাশি ২.৯৫ কিলোমিটার নদীতীর সংরক্ষণ, ২৫.৫১ কিলোমিটার বাঁধ এবং ৪.১০ কিলোমিটার ফ্লাড ওয়াল নির্মাণের মাধ্যমে প্রায় ১৩,৫০০ হেক্টর জমির ফসল বন্যার ক্ষতি থেকে রক্ষা পাবে।
চান্দখালী নদীর ওপর ৮০ মিটার দৈর্ঘ্য ও ২ মিটার প্রস্থের একটি পথচারী সেতু নির্মাণের মাধ্যমে খানমোহনা ও ধলঘাট স্টেশনের মধ্যে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটবে।
এছাড়া ভূ-উপরিস্থ পানি ব্যবহারের মাধ্যমে সারা বছর সেচ কার্যক্রম চালু রাখা, রবি, খরিফ ও বোরো ফসল উৎপাদন নিশ্চিত করা, বন্যা নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে মিঠা পানির মৎস্য চাষ বৃদ্ধি এবং খাল পুনঃখননের ফলে প্রাকৃতিক মাছের চলাচল (মাইগ্রেশন) সহজ হবে, যা এলাকার বাস্তুসংস্থানের ভারসাম্য রক্ষায় সহায়ক হবে।
প্রকল্পটির বাস্তবায়নকাল জুলাই ২০২১ থেকে জুন ২০২৭ পর্যন্ত নির্ধারিত। প্রাক্কলিত ব্যয় ১,১৫৮৩৬.০০ লাখ টাকা। চলতি এডিপিতে বরাদ্দ রয়েছে ১০,০০৯.০০ লাখ টাকা। চলতি অর্থবছরে আর্থিক অগ্রগতি ৫.৯৮ শতাংশ এবং বাস্তব অগ্রগতি ৬.২০ শতাংশ। তবে ভৌত কাজের প্রায় ৭০ শতাংশ ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে।
কাজের অগ্রগতি দেখে স্থানীয়রা সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। এলাকাবাসী জানান, আগে জলাবদ্ধতা ও বন্যার কারণে ধান নষ্ট হতো। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে ১৭টি ইউনিয়নের মানুষ উপকৃত হবে।
জানা গেছে, দীর্ঘদিন ধরে পটিয়ার অনেক কৃষিজমি অনাবাদি পড়ে ছিল। এই প্রকল্প বাস্তবায়নের ফলে সেসব জমি আবার চাষাবাদের আওতায় আসবে। তবে ভূমি অধিগ্রহণের কাজ এখন পর্যন্ত ১৭.১০ শতাংশ সম্পন্ন হয়েছে।
চট্টগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ড ডিভিশন-১-এর নির্বাহী প্রকৌশলী শওকত ইবনে সাহীদ বলেন, প্রকল্পের ফ্লাড ওয়াল, বেড়িবাঁধ ও সিসি ব্লকের কাজসহ প্রায় ৭০ শতাংশ ভৌত কাজ শেষ হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে পটিয়ার কয়েক লাখ মানুষ উপকৃত হবে। বছরে প্রায় ২ লাখ মেট্রিক টন খাদ্যশস্য উৎপাদন সম্ভব হবে এবং যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটবে। পাশাপাশি নদী ও খালের ভাঙন থেকে সুরক্ষা এবং লবণাক্ত পানির প্রবেশও রোধ করা যাবে।
তবে তিনি জানান, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের প্রভাবে সৃষ্ট জ্বালানি সংকটের কারণে প্রকল্পের অগ্রগতি কিছুটা ধীর হয়েছে। এ অবস্থায় ঠিকাদাররা চিঠির মাধ্যমে উদ্বেগ জানিয়ে বলেছেন, জ্বালানি তেলের সংকট অব্যাহত থাকলে চলমান উন্নয়ন কাজ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়ে স্থবিরতা দেখা দিতে পারে।