মো. কামরুল ইসলাম, নবীনগর (ব্রাহ্মণবাড়িয়া) প্রতিনিধি : ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর উপজেলার শ্যামগ্রাম বাজারের একসময়ের বিখ্যাত মিষ্টির দোকান—কিংবদন্তি কারিগর ‘লেবু হাউলাই’র সেই ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠান আজ কালের স্রোতে হারিয়ে যেতে বসেছে। একসময় দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে মানুষ ছুটে আসতেন তাঁর তৈরি মিষ্টির স্বাদ নিতে, আর এখন সেই গৌরবময় অতীতই কেবল স্মৃতিতে বেঁচে আছে।
স্থানীয় প্রবীণদের ভাষ্যমতে, লেবু হাউলাই ছিলেন পেশায় একজন ময়রা, কিন্তু তাঁর পরিচয় ছিল স্বাদের এক অনন্য শিল্পী হিসেবে। ছানা তৈরি, চিনির নিখুঁত অনুপাত এবং জ্বালের সূক্ষ্ম নিয়ন্ত্রণে তাঁর দক্ষতা ছিল অসাধারণ। বিশেষ করে তাঁর তৈরি সন্দেশ ও রসগোল্লা ছিল স্বাদে অতুলনীয় এবং দীর্ঘ সময় সতেজ থাকত।
একসময় শ্যামগ্রাম বাজারে তাঁর দোকান ছিল ক্রেতাদের ভিড়ে মুখর। আশপাশের উপজেলা ছাড়িয়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকেও মানুষ তাঁর দোকানে মিষ্টি নিতে আসতেন। বিয়ে, সামাজিক অনুষ্ঠান কিংবা জমিদার বাড়ির আপ্যায়নে লেবু হাউলাইয়ের মিষ্টি ছিল অন্যতম আকর্ষণ। তাঁর দোকান ঘিরে গড়ে উঠেছিল এক বিশেষ লোকঐতিহ্য।
‘হাউলাই’ উপাধিটি তিনি পেয়েছিলেন মানুষের ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা থেকে। সাধারণ কারিগর হয়েও তিনি সততা ও কর্মনিষ্ঠার মাধ্যমে মানুষের মনে জায়গা করে নিয়েছিলেন। খাঁটি দুধ ও উন্নতমানের উপকরণ ব্যবহার করে সম্পূর্ণ কায়িক শ্রমে, কাঠের জ্বালানিতে তৈরি করতেন মিষ্টি—যার মান ছিল অনন্য।
বর্তমানে সময়ের পরিবর্তনে সেই ঐতিহ্য অনেকটাই ম্লান হয়ে গেছে। আধুনিক মিষ্টির দোকানের প্রতিযোগিতা, যান্ত্রিক উৎপাদন এবং পরিবর্তিত জীবনযাত্রার কারণে আগের সেই জৌলুস আর নেই। তবে সম্পূর্ণভাবে হারিয়ে যায়নি ঐতিহ্যটি—লেবু হাউলাইয়ের নাতি-নাতনিরাই এখনো সীমিত পরিসরে দোকানটি পরিচালনা করছেন এবং পূর্বপুরুষের সেই স্বাদ ও সুনাম ধরে রাখার চেষ্টা করে যাচ্ছেন।
স্থানীয়রা বলছেন, যথাযথ পৃষ্ঠপোষকতা ও সংরক্ষণ উদ্যোগ থাকলে এই ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠানটি আবারও আগের অবস্থানে ফিরতে পারে। তাদের মতে, এটি শুধু একটি দোকান নয়, বরং শ্যামগ্রামের ইতিহাস ও সংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
লেবু হাউলাই হয়তো আজ নেই, কিন্তু তাঁর উত্তরসূরিদের হাত ধরে তাঁর ঐতিহ্য এখনো টিকে আছে—সময়ের সাথে লড়াই করে।