জামাল হোসেন খোকন: প্রথম স্বামী ও সন্তানের খোঁজে বৈধ পাসপোর্ট-ভিসা নিয়ে বাংলাদেশে এসেছিলেন ভারতের উত্তর ২৪ পরগনা জেলার বাসিন্দা ফাল্গুনী রায় (২৯)। কিন্তু সেই খোঁজই শেষ পর্যন্ত তাকে ঠেলে দেয় প্রতারণা, অবৈধ সীমান্ত পারাপার এবং কারাবাসের কঠিন বাস্তবতায়। প্রায় আট মাস কারাভোগের পর অবশেষে আন্তর্জাতিক নারী দিবসের দিন নিজ দেশে ফিরেছেন তিনি।
জানা যায়, প্রায় ১০–১১ বছর আগে বাংলাদেশের পিরোজপুর জেলার স্বরূপকাঠি উপজেলার বাসিন্দা গৌরাঙ্গ সরকার পরিচয় গোপন করে ভারতে যান এবং সেখানে ফাল্গুনী রায়কে বিয়ে করেন। দাম্পত্য জীবনে তাদের একটি পুত্র সন্তানও জন্ম নেয়। কয়েক বছর সংসার করার পর প্রায় পাঁচ-ছয় বছর আগে গৌরাঙ্গ ছেলেকে নিয়ে বাংলাদেশে ফিরে আসেন এবং স্ত্রীর সঙ্গে সব ধরনের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।
দীর্ঘদিন অপেক্ষা করেও স্বামী ও সন্তানের কোনো খোঁজ না পেয়ে ফাল্গুনী পরে নতুন করে সংসার শুরু করলেও প্রথম স্বামী ও সন্তানকে অন্তত একবার দেখার আকাঙ্ক্ষা তার মনে থেকেই যায়। সেই আকাঙ্ক্ষা থেকেই ২০২৫ সালের জুন মাসে বৈধ পাসপোর্ট ও ভিসা নিয়ে বাংলাদেশে আসেন তিনি।
বাংলাদেশে এসে পিরোজপুরের স্বরূপকাঠিতে স্বামীর বাড়িতে গেলে তার সঙ্গে দুর্ব্যবহার করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এ সময় তার পাসপোর্ট ও অন্যান্য কাগজপত্র কেড়ে নেওয়া হয় এবং মারধর করে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া হয়।
অসহায় অবস্থায় পড়ে ফাল্গুনী দালালের সহায়তায় ঝিনাইদহের মহেশপুর সীমান্ত দিয়ে অবৈধভাবে ভারতে ফেরার চেষ্টা করেন। কিন্তু ২০২৫ সালের ৩০ জুন মহেশপুর সীমান্ত এলাকায় প্রবেশের সময় মহেশপুর ব্যাটালিয়ন (৫৮ বিজিবি)-এর সদস্যরা তাকে আটক করে।
পরে তাকে মহেশপুর থানায় সোপর্দ করা হলে আদালত দুটি পৃথক মামলায় তাকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেন। সেই সাজা ভোগ করতে গিয়ে ঝিনাইদহ ও চুয়াডাঙ্গা জেলা কারাগারে প্রায় আট মাস কাটাতে হয় তাকে।
দীর্ঘ আইনি ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া শেষে রোববার (৮ মার্চ) বেলা সাড়ে ১১টার দিকে চুয়াডাঙ্গার দর্শনা জয়নগর সীমান্তের শূন্যরেখায় আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তাকে ভারতের অভিবাসন পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়। এ সময় দর্শনা ইমিগ্রেশন চেকপোস্ট পুলিশ, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ও ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ)-এর সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।
দর্শনা ইমিগ্রেশন চেকপোস্টের উপ-পরিদর্শক (এসআই) তুহিন জানান, ফাল্গুনী রায় ভারতের উত্তর ২৪ পরগনা জেলার বনগাঁ থানার টেংরা কলোনি এলাকার মৃত বিশ্বনাথ রায়ের মেয়ে। দীর্ঘ আট মাস সাজাভোগ শেষে বিজিবি ও বিএসএফের পতাকা বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তাকে নিজ দেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে।
হস্তান্তরের সময় বিজিবির পক্ষ থেকে দর্শনা ক্যাম্পের সুবেদার মো. এনামুল হক এবং ভারতের বিএসএফের পক্ষ থেকে গেদে ক্যাম্পের সহকারী কমান্ড্যান্ট রাজেশ কুমার উপস্থিত ছিলেন।
আন্তর্জাতিক নারী দিবসের দিন ফাল্গুনীর এই ঘরে ফেরা যেন এক নারীর সংগ্রাম, প্রতারণা ও সীমান্তের কঠিন বাস্তবতার মধ্য দিয়ে দীর্ঘ পথ পেরিয়ে অবশেষে নিজ দেশে ফিরে যাওয়ার গল্প হয়ে রইল।