ফারুক আহাম্মদ, ব্রাহ্মণপাড়াঃ রমজানের ছুটি শুরু হলেও সরকারি নির্দেশনা উপেক্ষা করে কুমিল্লার ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলার চান্দলা করিম বক্স হাই স্কুল এন্ড কলেজে চলছে রমরমা কোচিং বাণিজ্য। অষ্টম থেকে একাদশ শ্রেণির প্রায় ছয় শতাধিক শিক্ষার্থীকে স্কুলে আসতে বাধ্য করার পাশাপাশি নামী প্রকাশনী থেকে ‘ঘুষ’ নিয়ে নির্দিষ্ট গাইড বই কিনতে চাপ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে প্রতিষ্ঠানটির একাংশের বিরুদ্ধে।
ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের অভিযোগ, কোচিং ও গাইড বই বাণিজ্যের নেপথ্যে রয়েছেন বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ, ভারপ্রাপ্ত সহকারী প্রধান শিক্ষক এবং কলেজ শাখার ইনচার্জসহ একটি প্রভাবশালী চক্র। এমনকি ফি কমাতে আবেদন করায় শিক্ষার্থীদের পরীক্ষায় ফেল করিয়ে দেওয়ার ভয়ভীতিও দেখানো হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণির তিনটি শাখায় তিন শতাধিক, দশম শ্রেণিতে দুই শতাধিক এবং একাদশ শ্রেণিতে দুই শতাধিক শিক্ষার্থীকে এই ছুটিতে নিয়মিত কোচিং করানো হচ্ছে। এর বাইরে এসএসসি পরীক্ষার্থীদের মডেল টেস্টের নামে পরীক্ষা নেওয়া হচ্ছে। একাদশ শ্রেণির এক শিক্ষার্থী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, সামনে কোনো পরীক্ষা নেই, তাও রোজা রেখে আমাদের জোর করে ১২ দিনের কোচিং করতে বাধ্য করা হচ্ছে। এর জন্য ১৪০০ টাকা ফি চাওয়া হয়েছে। আমরা ফি কমানোর আবেদন করলে তা গ্রহণ করা হয়নি। অভিযোগ রয়েছে, যারা কোচিং করছে না, তাদের কাছ থেকেও মাসে ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা করে আদায় করা হচ্ছে। একই সময় পরীক্ষা নেওয়া হচ্ছে সে বাবদ ফি ৫০০ টাকা এই সময়ে কোচিং না করিয়েও আরো অতিরিক্ত ৬০০ টাকা সহ মোট ১২০০ থেকে ১৫০০ টাকা আদায় করা হচ্ছে। টাকা না দিলে এসএসসি পরীক্ষার্থীদের প্রবেশপত্র (অ্যাডমিট কার্ড) না দেওয়ার হুমকি দেওয়া হচ্ছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, দুটি নামী প্রকাশনী সংস্থার কাছ থেকে প্রায় ৫ লাখ টাকা উৎকোচ নিয়ে শিক্ষার্থীদের নির্দিষ্ট গাইড বই কিনতে বাধ্য করছে স্কুল কর্তৃপক্ষ। স্কুল শাখায় ‘লেকচার’ ও কলেজ শাখায় ‘পাঞ্জেরি’ পাবলিকেশন্সের গাইড ব্যবহারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সম্প্রতি এই টাকার ভাগ-বাঁটোয়ারা নিয়ে শিক্ষকদের মধ্যে দ্বন্দ্ব শুরু হলে বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে।বিদ্যালয়ের একাধিক শিক্ষক জানান, মাত্র ৪-৫ জন শিক্ষককে দিয়ে নামমাত্র ক্লাস করিয়ে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন কিছু লোভী শিক্ষক। আওয়ামী রাজনীতির সাথে জড়িত একটি প্রভাবশালী চক্র বিগত সরকারের আমল থেকে বই বিক্রি, কোচিং ও ফরম পূরণে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের এই সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করছে। কোচিং ও গাইড বাণিজ্যের পাশাপাশি উপবৃত্তির আবেদনের কথা বলে কলেজ শাখার শিক্ষার্থীপ্রতি ২০০ টাকা করে আদায়ের অভিযোগ করেছেন একাধিক অভিভাবক।বিদ্যালয়ের সাবেক অভিভাবক সদস্য আল মামুন বলেন, ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ আমাকে ১০ হাজার টাকা উৎকোচ দিয়ে মুখ বন্ধ রাখতে চেয়েছিলেন, যা আমি প্রত্যাখ্যান করেছি। বড় অঙ্কের টাকা নিয়ে গাইড কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি করা হয়েছে।
এছাড়া নাম মাত্র অতিরিক্ত ক্লাসের নামে মোটা অংকের টাকার আদায় কোচিং বাণিজ্যের নামান্তর এসব ঘটনা বিদ্যালয়ের সুনাম ক্ষুণ্ণ করবে। এসব অভিযোগের বিষয়ে বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ শরিফুল ইসলাম ভূঁইয়া বলেন, পড়াশোনার মানোন্নয়নের জন্য অতিরিক্ত ক্লাসের ব্যবস্থা করা হয়েছে। গাইড বই কোম্পানির থেকে টাকা নেওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, যা শুনেছেন আমরা অত টাকা নেইনি। অল্প টাকা নিয়েছি। সব প্রতিষ্ঠানই নেয়। তবে কাউকে গাইড কিনতে বাধ্য করা হয়নি। কলেজ শাখার ইনচার্জ আবুল কালাম আজাদ বলেন, বিষয়টি আমার জানা নাই। আমি কলেজে পরে এসেছি ছাত্রদের ক্লাস বয়কট কিংবা তাদের আবেদনপত্র গ্রহণ না করার বিষয়টি আমার জানা নাই।
ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার শহীদুল করিম বলেন, অতিরিক্ত অর্থ আদায় করে সব ক্লাসে কোচিং করানোর বিধান নেই। অর্থের বিনিময়ে নির্দিষ্ট গাইড বই কিনতে বাধ্য করা অপরাধ। তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও প্রতিষ্ঠানের অ্যাডহক কমিটির সভাপতি মাহমুদা জাহান বলেন, "বিষয়টি আমি শুনেছি। দ্রুত তদন্ত করে আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হবে।