ফয়সাল চৌধুরীর, জেলা প্রতিনিধি: কুষ্টিয়া সদর উপজেলার ৩২টি হাট ও বাজার ইজারা দেওয়ার ক্ষেত্রে ভাগাভাগি করে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। ৩২ হাটের বিপরীতে ৬৩টি দরপত্র বিক্রি হলেও শেষ দিন পর্যন্ত জমা পড়েছে মাত্র ৩০টি শিডিউল। এর মধ্যে নয়টি হাটবাজারে কোনো দরপত্র জমা পড়েনি। আর ১৬ হাটবাজারে জমা পড়েছে একটি করে দরপত্র। বাকি পাঁচটি হাটে দুটি করে দরপত্র জমা পড়েছে। অভিযোগ উঠেছে, ঠিকাদারদের দরপত্র জমাদানে বাধা দেওয়া হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ ও বড় হাটবাজারগুলোর দরপত্র ফোন করে ডেকে নিয়ে দরপত্র ক্লোজ করে নেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। অনেকের সাথে সমন্বয় করেও নেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে।
জানা গেছে, গত বছরও যুবদল নেতা আব্দুল মাজেদ ও বিএনপির কয়েকজন মিলে হাটবাজার ভাগাভাগি করে নেন। এবারও দরপত্র নিয়ন্ত্রণ করে পছন্দের লোকজনের মাঝে হাটবাজার ভাগাভাগি করে দেওয়ার অভিযোগ তুলেছেন স্থানীয়রা।
এদিকে পহেলা বৈশাখ থেকে কুষ্টিয়া সদর উপজেলার ৩২ হাটবাজার নতুন করে ইজারা দেওয়ার জন্য দরপত্র আহ্বান করা হয়। এ বিষয়ে ২৮ জানুয়ারি পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়। ৩২টি হাটবাজার ইজারা নেওয়ার জন্য ৬৩ জন ঠিকাদার দরপত্র সংগ্রহ করেন। সোমবার দরপত্র জমাদানের শেষ সময় ছিল। তবে তার আগেই হাটবাজার নিয়ন্ত্রণে নিতে ভেতরে ভেতরে কাজ করেন যুবদল নেতা আব্দুল মাজেদসহ বিএনপির কয়েকজন নেতা। পুরো বিষয়টি সমন্বয় করেন মাজেদ ও তার অনুগতরা।
হাটবাজার ভাগাভাগির বিষয়টি সমন্বয় করেন সদর উপজেলা যুবদলের আহ্বায়ক আব্দুল মাজেদ। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পরবর্তী সময় এক সভায় তার নেতৃত্বে কুষ্টিয়া সদর থানায় হামলা চালিয়ে পুড়িয়ে দেওয়ার বক্তব্য দিয়ে আলোচিত হন। এরপর গত দেড় বছরে মাজেদের নেতৃত্বে কুষ্টিয়ার খাজানগর চাল মোকাম থেকে চাঁদাবাজির বিষয়ে গোয়েন্দা প্রতিবেদনে তার নাম আসায় বিব্রতকর অবস্থায় পড়ে বিএনপি। সর্বশেষ সদরের হাটবাজার ভাগাভাগির সঙ্গেও তার নাম উঠে এসেছে। মঙ্গলবার দুপুরে সদর উপজেলা পরিষদে গিয়ে দেখা যায় দলবল নিয়ে মাজেদ উপজেলা চত্বরের একপাশে অবস্থান নিয়েছেন।
দরপত্র কিনেছিলেন এমন তিনজন নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘এবার ৬৩টি দরপত্র বিক্রি হয়। কিন্তু জমা হয় ৩২টি। এতে করে প্রতিযোগিতা থাকছে না। কয়েকজন নেতার ইচ্ছামতো এবার বাইরে থেকে কলকাঠি নাড়ানো হচ্ছে। এতে সরকার তার কাঙ্ক্ষিত রাজস্ব পেলেও প্রতিযোগিতা থাকলে আরও বেশি রাজস্ব পেত। নির্বাচনের ভেতর কার্যক্রম চলায় অনেকেই সময়মতো অংশ নিতে পারেননি কার্যক্রমে। আবার যারা দরপত্র কিনেছিলেন তারাও চাপের কারণে জমা দিতে পারেননি। ঝামেলা হতে পারে ভেবে সবাই সমঝোতা করে নিয়েছেন।
যুবদল নেতা আব্দুল মাজেদ ও তার লোকজন যেসব ব্যক্তি দরপত্র কিনেছিলেন তাদের ফোন করে জমা না দেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়। আবার অনেকের কাছে সরাসরি গিয়ে দরপত্র জমা না দেওয়ার জন্য ভয় ভীতি প্রদর্শন করে তারা।
যারা দরপত্র কিনেছিলেন তাদের চাপ প্রয়োগ করা হয়। অনেকেই ভয়ে আর দরপত্র জমা দিতে সাহস করেননি। বাকি কয়েকজন টাকার বিনিময়ে সমঝোতা করে নেন।
সদর উপজেলার সব থেকে বড় হাটবাজার আছে চার-পাঁচটি। এর মধ্যে সব থেকে বেশি আয় হয় খোর্দ্দ আইলচারা পশুহাট, বালিয়াপাড়া পশুহাট, মধুপুর কলার হাট, মধুপুর ইটভাটা পশুহাট, বিত্তিপাড়া হাট, লক্ষ্মীপুর বাসস্ট্যান্ড হাট, ঝাউদিয়া, কবুরহাট ও খাজানগর বাজার। এসব হাটের ওপর নজর থাকে সবার। ৩২টি হাটের মধ্যে পাঁচটি হাটে দুটি করে দরপত্র জমা পড়েছে। বাকিগুলোতে জমা পড়েছে একটি করে। এছাড়া নয়টি হাটবাজারে দরপত্র কেনা হলেও একটিও জমা পড়েনি। নতুন করে এসব হাটবাজারের দরপত্র আহ্বান করা হবে।
একটি সূত্র জানিয়েছে, যে নয়টি হাটবাজারে একটিও দরপত্র জমা পড়েনি সেগুলো সমঝোতা হয়েছে। প্রতিযোগিতা হলে এখানে সরকারি যে সর্বনিম্ন দর নির্ধারণ করা হয়েছে তার থেকে দুই থেকে তিনগুণ বেশি দর উঠত। এবার সেটা হচ্ছে না। সরকারি দর থেকে সামান্য টাকা বেশি দিয়ে এসব হাটবাজার নেওয়ার চেষ্টা করা হতে পারে। এ কারণে প্রথম দফায় ৯টি হাটবাজারের বিপরীতে একটি শিডিউলও জমা পড়েনি। দ্বিতীয় দফায় ১ থেকে ৮ মার্চ পর্যন্ত দরপত্র বিক্রি করা হবে। জমাদানের শেষ তারিখ রাখা হয়েছে ৯ মার্চ পর্র্যন্ত। এভাবে চতুর্থবার পর্যন্ত দরপত্র কেনা ও জমার সুযোগ রাখা হয়েছে।
বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে আব্দুল মাজেদ বলেন, ‘এলাকায় যাই হোক না কেন আমার নাম হয়। যারা জমা দেননি তারা কেন জমা দেননি সেটা তাদের ব্যাপার। আমি কোনো ঝামেলায় নেই। এসব বিষয়ে জানি না। এসব সিন্ডিকেটের মধ্যে আমি নেই বলেও তিনি জানান। আমার বিরোধী পার্টি আমার বিরুদ্ধে এ ধরনের মিথ্যাচার করে গুজব ছড়াচ্ছে।'
কুষ্টিয়া সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. রোকনুজ জামান বলেন, ‘নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ৬৩ দরপত্র বিক্রি হয়েছিল। তবে বেশির ভাগ হাটবাজারের বিপরীতে একটি করে জমা পড়েছে। বেশ কয়েকটি হাটে দুটি করেও জমা পড়েছে। আবার একটিও জমা পড়েনি এমন বাজারও আছে। সরকারি নিয়মের বাইরে গিয়ে হাটবাজার নেওয়ার সুযোগ নেই। সরকারি রাজস্ব দিয়ে হাটবাজার ইজারা নিতে হবে।