মোঃ জালাল উদ্দিন, মৌলভীবাজার জেলা প্রতিনিধি: শীতের সকালে আখের রসে মুখ ভেজানোর যে গ্রামীণ ঐতিহ্য, তা আজ অনেক জায়গাতেই স্মৃতির পাতায় বন্দী। তবে মৌলভীবাজারের রাজনগর উপজেলার প্রত্যন্ত মিঠিপুর গ্রামে এখনো সেই ঐতিহ্যের শেষ আলো জ্বলে আছে। শীত এলেই এই গ্রামে ভেসে আসে আখমাড়াই যন্ত্রের পরিচিত শব্দ, সঙ্গে আখের রস আর গুড়ের মিষ্টি সুবাস।
একসময় শীত মৌসুমে মিঠিপুর গ্রামে জমে উঠত আখ মাড়াইয়ের উৎসব। মাঠের এক কোণে মহিষের টানে ঘুরত আখ মাড়াই কল। পুরুষেরা করতেন আখ মাড়াই, আর নারীরা বড় হাঁড়িতে জ্বাল দিতেন আখের রস। সেই রস থেকে তৈরি হতো সুস্বাদু লালিগুড়। বাতাসে ভেসে বেড়াত গুড়ের মোহনীয় গন্ধ, আর গ্রামের সকাল হয়ে উঠত প্রাণবন্ত।
সময় বদলেছে। আধুনিকতার ছোঁয়ায় বিলীন হয়ে গেছে সেই সোনালি দিনগুলোর অনেকটাই। মহিষের টানে মাড়াই এখন আর নেই, জায়গা করে নিয়েছে ডিজেলচালিত পাওয়ার মেশিন। নেই আগের মতো সকালের ব্যস্ততা, নেই কিশোরদের দল বেঁধে রস খাওয়ার সেই আনন্দ। তবু গ্রামের বয়োজ্যেষ্ঠদের স্মৃতিচারণে আজও বেঁচে আছে আখ, গুড় আর রসের সেই প্রাণবন্ত সময়।
রাজনগরের টেংরাজার ইউনিয়ন থেকে মনু নদে নৌকা পাড়ি দিয়ে মেঠোপথ ধরে হাঁটলেই পৌঁছানো যায় কামারচাঁক ইউনিয়নের মিঠিপুর গ্রামে। গ্রামের নামের মধ্যেই লুকিয়ে আছে এর ইতিহাস—আখের রসের মিঠাস। শীত এলেই এখানকার মাঠে ভোরের আলো ফোটার আগেই নেমে পড়েন চাষিরা। সূর্য ওঠার আগেই আখ কেটে মাড়াই করে সংগ্রহ করা হয় রস।
সরেজমিনে ঘুরে সাংবাদিক মোঃ জালাল উদ্দিন জানান, কেউ রস বিক্রি করছেন, কেউ আবার বড় হাঁড়িতে রস জ্বাল দিয়ে তৈরি করছেন গুড় ও তরল ‘লালি’। পাইকাররা ভোরবেলা টিনে করে রস নিয়ে ছুটে চলেন দূরদূরান্তের গ্রামে। সময়মতো পৌঁছাতে না পারলে রস নষ্ট হয়ে যাওয়ার শঙ্কা থাকে। এই ফেরি করাই অনেকের জীবিকার প্রধান অবলম্বন।
স্থানীয় আখ চাষিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, একসময় মিঠিপুর গ্রামের শতাধিক পরিবার আখ চাষে জড়িত থাকলেও বর্তমানে টিকে আছে মাত্র ৫ থেকে ৭টি পরিবার। খরচ বৃদ্ধি, শ্রমিক সংকট ও আধুনিক মাড়াই যন্ত্রের অভাবকে তারা এর প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন। তবে আখ চাষ লাভজনক হওয়ায় মনুপাড়ের অনেক কৃষক নতুন করে আগ্রহী হয়ে উঠছেন।
মিঠিপুর গ্রামের পঞ্চাশোর্ধ্ব আখ চাষি সিরাজুল ইসলাম গেন্দু বলেন, ‘প্রায় ৩৫ বছর ধরে আমি আখ চাষ করছি। বাবার পর এই চাষ ধরে রেখেছি। এখন যতদিন বাঁচব, পূর্বপুরুষদের এই পেশা আঁকড়ে ধরে রাখব।’
তিনি জানান, তিন কিয়ার জমিতে আখ চাষে তার খরচ হয়েছে প্রায় ৫০ থেকে ৫৫ হাজার টাকা। ইতোমধ্যে এক লাখ টাকার মতো বিক্রি করেছেন, আরও দেড় লাখ টাকা বিক্রির আশা করছেন। প্রায় ২০ বছর ধরে তিনি মহিষের বদলে যন্ত্র দিয়ে আখ মাড়াই করছেন। নিজের পাশাপাশি অন্য কৃষকদের আখও ভাড়ায় মাড়াই করে দেন।
আরেক আখ চাষি জহিরুল ইসলাম বলেন, ‘আখ চাষ খুবই পরিশ্রমের কাজ। শ্রমিক পাওয়া যায় না। আখ কাটা, মেশিনে দেওয়া, রস জ্বাল দেওয়া—সব মিলিয়ে অনেক মানুষের প্রয়োজন হয়। এ কারণেই অনেকেই এই চাষে আগ্রহ হারাচ্ছেন।’
গ্রামের বাসিন্দা মোঃতোফায়েল আহমেদ বলেন, ‘আগে রাস্তার দুই পাশে আখ থাকত। এখন অনেক কমে গেছে।’
স্থানীয়দের ভাষ্য, মিঠিপুর ও আশপাশের এলাকায় শত বছরের বেশি সময় ধরে আখ চাষ হয়ে আসছে। বর্তমানে এখানে প্রতি লিটার আখের রস ৬০ টাকা, প্রতি কেজি গুড় ২৫০ টাকা এবং লালির দাম কেজিপ্রতি ২২০ টাকা।
প্রবীণ শিক্ষক আব্দুল আজিজ বলেন, ‘এই জনপদের শীতের সকাল আখের রসের পিঠা, গুড়ের পিঠা আর মিষ্টি খিচুড়ির গন্ধে মুখর থাকে। এই ঐতিহ্য আমাদের গর্ব, আর আগত অতিথিদের জন্য এক অনন্য অভিজ্ঞতা।’
এ বিষয়ে মৌলভীবাজার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোঃ জালাল উদ্দিন বলেন, ‘জেলায় সীমিত আকারে আখ চাষ হয়। তবে সমতল ভূমিতে এর যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে। প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও সাথী ফসল চাষের মাধ্যমে কৃষকেরা আরও লাভবান হতে পারেন।’
শীতের সকালের কুয়াশার ভেতর আখমাড়াই যন্ত্রের একটানা শব্দ আজও জানান দেয়—মিঠিপুরে এখনো পুরোপুরি হারায়নি আখের রসের মিষ্টি ঐতিহ্য।