শিরোনাম

প্রকাশিত : ২৯ নভেম্বর, ২০২৫, ০৬:৫৩ বিকাল
আপডেট : ২৯ নভেম্বর, ২০২৫, ১০:০০ রাত

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

ভূমিদস্যুদের গ্রাস থেকে মুক্ত, পুনর্খননে ফিরছে কালির ছড়ার আসল প্রবাহ

এম আর আমিন, চট্টগ্রাম: চট্টগ্রাম নগরীর প্রবাহমান খালগুলোর মধ্যে অন্যতম কালির ছড়া দীর্ঘদিন ধরে দখল, ভরাট ও অবহেলার শিকার হয়ে কার্যত বিলুপ্তির পথে ঠেলে দেওয়া হয়েছিল। ভূমিদস্যুদের দখলদারিত্ব, অনিয়ন্ত্রিত বর্জ্য ফেলা এবং পরিকল্পনাহীন উন্নয়ন কার্যক্রমের কারণে খালটির স্বাভাবিক জলপ্রবাহ ধীরে ধীরে সংকুচিত হয়ে পড়ে। এক সময় যে খাল দিয়ে এলাকার জলাবদ্ধতা নিরসন হতো, তা গত কয়েক বছরেই পরিণত হয় ময়লার স্তূপে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, বিভিন্ন প্রভাবশালী চক্র খালের দুইপাড়ে অবৈধভাবে স্থাপনা গড়ে তোলে। খালের প্রস্থ কমে যাওয়ায় বর্ষাকালে পানি প্রবাহ ব্যাহত হয় এবং আশপাশের এলাকায় সৃষ্টি হয় তীব্র জলাবদ্ধতা। নগরীর অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ জলাবদ্ধতার কারণ হিসেবে উঠে আসে কালির ছড়ার দখল ও ভরাট সমস্যা।

ভূমিদস্যু আগ্রাসনে প্রায় বিলিন হওয়া চট্টগ্রামের কালির ছড়া খালটি পুনরায় খননের মাধ্যমে স্বরূপে ফিরে আসতে শুরু করেছে। নানা প্রতিকূলতার দেয়াল টপকে ৩ কোটি ২০ লাখ টাকা ব্যয়ে খালটি খনন ও পরিস্কারের কাজ করছে পানি উন্নয়ন বোর্ড। ফলে এটি নিজের স্বরূপে ফিরবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। আর এই কাজের মাধ্যমে নগরের জলাবদ্ধতা নিরসণে গুরুত্বপূণূ ভূমিকা রাখবে বলেও জানিয়েছেন তাঁরা। 

জানা যায়, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের নগরের ৯ নং উত্তর পাহাড়তলী ও ১০ নম্বর উত্তর কাট্টলি ওয়ার্ডের মাঝে প্রবাহিত কালির ছড়া খাল। এক সময় এর প্রস্থ ছিল ২৫ থেকে ৪০ ফুট। কিন্তু দখলদারের কবলে পড়ে সেটির প্রস্থ ঠেকেছে ৫ থেকে ৭ ফুটে। বর্ষা মৌসুমে এই খাল নগরের আকবরশাহ, বিশ্বব্যাংক কলোনি আবাসিক এলাকা, শাহের পাড়া, লেকসিটি, জয়ন্তিকা, রামপুরা, ভূমিহীন, ছিন্নমূল, যমুনা, সবুজ বাংলা, শাপলা ও কর্নেলহাট সিডিএ আবাসিক এলাকা ও কাট্টলীসহ অন্তত ১১ এলাকার পানি প্রবাহের গুরুত্বপূর্ণ পথ। জলাবদ্ধতার দুর্ভোগ থেকে মুক্তি পেতে এই ১১ এলাকার বাসিন্দারা দীর্ঘদিন ধরে  খাল উদ্ধারের দাবি জানিয়ে আসছিল। দখল বেদখলের খেলার প্রতিবাদ করেছিল ‘কালির ছড়া খাল অবমুক্তকরণ সংগ্রামী জনতা’ নামের একটি সংগঠন। তারা এটি রক্ষার জন্য ২০১৬ সালে মানববন্ধন করেছিল। স্থানীয়রা। ফলে পরিবেশের বিপর্যয় ঠেকাতে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন এবং পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানের হস্তক্ষেপে খালটি উদ্ধারের বিশেষ বরাদ্দ দেয়া হয় পানি উন্নয়ন বোর্ডকে। সেই বরাদ্দে খালটি সচলের উদ্যোগ নিয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ড।  

কালিরছড়া খাল খনন ও প্রয়োজনীয় সংস্কারের অভাবে দীর্ঘ দুই যুগ ধরে চাষাবাদ হচ্ছে না কাট্টলি ও পতেঙ্গা এলাকার বিস্তীর্ণ ফসলি জমিতে। ফলে নিজেদের জমি বিক্রি করা শুরু করেন কৃষকরা। ক্রেতারা গড়ে তোলা শুরু করেন বসতি ও বিভিন্ন বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান।

দূষনের ফলে আশেপাশে এলাকাটিতে মাছ বসবাস করার অযোগ্য হয়ে পড়ে। ফলে এই খালপাড়ের হাজারো জেলে পরিবার দীর্ঘ সময় বেকারত্বের করালগ্রাসে অভাব-অনটনে দিন পার করছেন। আর সেই কালিরছড়া খাল খননে এখন জীবিকায় ফিরতে পারবেন জেলেরা।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা জানান, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা ও জলঅবদ্ধতা নিরসনে চট্টগ্রাম আকবরশাহ থানাধীন হারবাতলী থেকে উজানের দিকে বায়েজিদ লিংক রোড পর্যন্ত ঐতিহ্যবাহী কালীর ছড়া খালের শাখা প্রশাখাসহ প্রায় ৫.৩ কিলোমিটার খালের সংস্কার কাজ করা হচ্ছে। এরমধ্যে ৪ কিলোমিটার খালের জঙ্গল পরিষ্কার ও ১৩০০ মিটার (১.৩ কিমি)  খাল খননের কাজ শুরু হয়েছে।

স্থানীয়রা জানান, চসিকের ৯ ও ১০ নম্বর ওয়ার্ডের মাঝে দিয়ে প্রবাহিত কালির ছড়া খালটি দখলের কারণে প্রশস্ততা হারিয়ে সরু নালায় পরিণত হয়েছিল। দখলদাররা অনেক এলাকায় খালের গতিপথও পরিবর্তন করেছেন। খালটি দখল হয়ে যাওয়ায় বর্ষা মৌসুমে এসব এলাকা পানিতে তলিয়ে যায়। জলাবদ্ধতার মধ্যে পড়ে অবর্ণনীয় দুর্ভোগে পড়তে হয়েছে হাজার হাজার পরিবারকে। 

এসব ভোগান্তি থেকে রক্ষা পেতে অবশেষে অন্তবর্তি সরকারের পানি সম্পদ উপদেষ্টা কালিরছড়া খাল খনন ও সংস্কারের উদ্যোগ নেন। যা তত্ত্বাবধান করছেন বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড, চট্টগ্রাম পওর বিভাগ-১ খাল সংস্কার শুরু করায় স্থানীয়দের মুখে আনন্দের ছাপ দেখা যাচ্ছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে,চট্টগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পওর ১) উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী  বর্ণ হক বলেন, অবৈধ দখলদারদের টনক নড়েছে। তারা বুঝতে পেরেছে যে, এভাবে অবৈধভাবে দখলদারিত্ব ধরে রাখা যাবে না। সকল বাধাবিপত্তি পেরিয়ে আমরা অবৈধ দখলদার উচ্ছেদ করছি। খালের মধ্যে কোন স্থাপণা থাকতে পারবে না এটা আমাদের অঙ্গীকার।

তিনি আরও বলেন, জলপথনির্ভর   বিবেচনা করে, পরিবেশের কথাটাকে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দিয়ে আমারা কাজ করছি। আশা করছি ঐতিহ্যবাহী কালীর ছড়া খাল সংস্কারের কাজ সম্পন্ন হলে জলাবদ্ধতার অভিশাপ থেকে এই এলাকাটি রক্ষা পাবে।

এ বিষয়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মো. ইউনুস এন্ড ব্রাদার্স (প্রা:) লিমিটেডের  কর্ণধার মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, অবৈধ দখলদারের দৌরাত্ম্যে অস্তিত্ব সংকটে পড়া কালির ছড়া খাল খনন ও সংস্কার কাজ বাস্তবায়ন করা চ্যালেঞ্জিং হয়ে দাড়িয়েছে, দখলদাররা অনেক প্রভাবশালী। তারা বাধা দেয়ার চেষ্টা করছে, আমরা আমাদেও সাধ্য মতো চেষ্টা করছি। সরকারের যথেষ্ঠ আন্তরিকতা আছে। আশা করছি শত বাধা সত্ত্বেও প্রকল্পের কাজ যথাযথ বাস্তবায়ন করা হবে।

উল্লেখ্য, এই কালির ছড়া খাল ভরাট করে স্থাপনা নির্মাণের অভিযোগ পেয়ে ২০২৩ সালের জানুয়ারি মাসে পরিদর্শনে গিয়ে হামলার শিকার হয়েছিলেন বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা)  তৎকালীন প্রধান নির্বাহী ও বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান।

ওই সময় চসিকের স্থানীয় কাউন্সিলর জহুরুল আলম জসীমের নেতৃত্বে বেশ কয়েকজন বেলার টিমের সদস্যদের হুমকি দেন। এরপর তাদের বহনকারী গাড়ি আটকে দেন জসীমের সহযোগীরা। পরে ধারালো অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে রিজওয়ানা হাসানের গাড়ি লেকসিটি আবাসিক এলাকায় তার কার্যালয়ে নিয়ে আটকে রাখেন। ওই ঘটনায় কাউন্সিলর জসীমকে প্রধান আসামি করে থানায় মামলা দায়ের করা হয়েছিল।

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়