এস. এম. সাইফুল ইসলাম কবির, বাগেরহাট জেলা প্রতিনিধি: বিশ্বের সর্ববৃহৎ ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল সুন্দরবনের দুবলার চরে প্রতি বছর পাঁচ মাস ধরে চলে শুটকি প্রস্তুতের ব্যস্ততা। সমুদ্র থেকে মাছ ধরে বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় শুকিয়ে প্রস্তুত করা হয় শুটকি, যা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ব্যাপক চাহিদা পায়। তবে চলতি মৌসুমে সাগরে ডাকাতির প্রবণতা বেড়ে যাওয়ায় আতঙ্কে রয়েছেন জেলেরা। পাশাপাশি পরিবেশ রক্ষার স্বার্থে সংরক্ষিত এই বনাঞ্চল থেকে শুটকি পল্লি সরানোর পরিকল্পনা করছে বন বিভাগ।
ডাকাত আতঙ্কে জেলেরা
ভোর থেকে সমুদ্রে মাছ ধরে তীরে ফিরছেন শত শত জেলে। তবে এবার জেলেদের মুখে চাপা শঙ্কা। কয়েক বছর ডাকাত-মুক্ত থাকার পর চলতি মৌসুমে ফের সক্রিয় হয়ে উঠেছে জলদস্যুরা—এমন অভিযোগ স্থানীয়দের।
বঙ্গোপসাগরে জেলেদের নিরাপত্তায় কোস্টগার্ড তৎপর রয়েছে। কোস্ট গার্ড পশ্চিম জোনের অপারেশন অফিসার লেফটেন্যান্ট কমান্ডার আবরার হাসান জানান, “জেলেদের আশঙ্কা সম্পর্কে আমরা অবগত। সুন্দরবনে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে।”
শুটকি মৌসুমে হাজারো মানুষের কর্মব্যস্ততা
আলোরকোল, মাঝেরকেল্লা, নারিকেল বাড়ীয়া, শেলারচর ও মেহের আলীর চরে তৈরি হয় লইট্টা, তেলফ্যাসা, ছুরি, রূপচাঁদা ও চাকা চিংড়ির শুটকি। নভেম্বর থেকে মার্চ পর্যন্ত এ অঞ্চলে কাজ করেন প্রায় ৪০ হাজার শ্রমিক। কাঁচা মাছ শুকাতে সময় লাগে তিন থেকে পাঁচ দিন। প্রতি কেজি শুটকির দাম ৬০০ থেকে ১,৮০০ টাকা।
খুলনা অঞ্চলের বন সংরক্ষক ইমরান আহমেদ বলেন, “দুবলার চরের শুটকি উৎপাদন অনেক পুরোনো প্রথা হলেও এটি বনের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। বিপুল সংখ্যক মানুষের উপস্থিতিতে বনের পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।”
পরিবেশ চাপ, মৌসুম শেষে বর্জ্যে নষ্ট হচ্ছে বন
অক্টোবর থেকে মার্চ পর্যন্ত এখানে বসবাস করেন হাজারো শ্রমিক। তারা ফেলা বর্জ্য ও মানবচাপে বনের পরিবেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। শুটকি পল্লির পাশাপাশি বাজার, দোকান, ট্রলার কারখানা ও অস্থায়ী বসতি গড়ে ওঠায় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য। তাই দ্রুত শুটকি পল্লি সংরক্ষিত এলাকা থেকে সরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নিচ্ছে বন বিভাগ।
অর্থনীতিতে বড় ভূমিকা
প্রতিবছর দুবলার চর থেকে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে যায় প্রায় ৩০০ থেকে ৫০০ কোটি টাকার শুটকি। বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী—
২০১৮–১৯ অর্থবছর: ৪,১০৫ টন শুটকি, আয় ২.৬৮ কোটি টাকা
২০২২–২৩ অর্থবছর: ৫,১০০ টন শুটকি, আয় ৬.৬৮ কোটি টাকা
২০২৩–২৪ অর্থবছর: ৫,০৯৫ টন শুটকি, আয় ৭.২০ কোটি টাকা
২০২৪–২৫ অর্থবছর: ২০,০০০ মেট্রিক টন উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা, সম্ভাব্য আয় ৭.৫০ কোটি টাকা
২০২৫–২৬ অর্থবছর: লক্ষ্যমাত্রা ২১,০০০ মেট্রিক টন, সম্ভাব্য আয় ৮ কোটি টাকা
শুটকি ব্যবসায়ীরা বলছেন, সরকারি উদ্যোগ পেলে এ শুটকি বিদেশে রপ্তানির সুযোগ তৈরি হতে পারে।
জল, আশ্রয় ও চিকিৎসা—সবখানেই সংকট
দুবলার চরে সুপেয় পানির তীব্র সংকট। কয়েকটি পাতকুয়ার ওপর নির্ভর করতে হয় শ্রমিকদের। চিকিৎসা সেবার অভাবে নানা রোগ বহুলাংশে অচিকিৎসিত থাকে। বাজারে কিছু ওষুধের দোকান থাকলেও সেগুলোতে প্রশিক্ষিত চিকিৎসক নেই।
স্থানীয় স্বাস্থ্যসেবাদাতা হাবিবুর রহমান বলেন, “এখানে সরকারি চিকিৎসা ব্যবস্থা নেই। জেলেরা সাধারণত পেটব্যথা, গ্যাস্ট্রিকসহ বিভিন্ন সমস্যায় আসেন, আমরা শুধু ওষুধ দিই।”
এদিকে সাইক্লোন আশ্রয়কেন্দ্রগুলো অচল থাকায় ঝড়ঝঞ্ঝার সময় শ্রমিকদের নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়ে।
দুবলার চর বিখ্যাত ঐতিহ্যবাহী রাস উৎসবের কারণে। আলোরকোলে অনুষ্ঠিত এ পূজা ও পুণ্যস্নানে প্রতিবছর প্রায় ৫০ হাজার মানুষ অংশ নেন।
সরকারি পদক্ষেপ জরুরি: দাবি সংশ্লিষ্টদের
দুবলার চর ফিশারম্যান গ্রুপের সভাপতি কামাল উদ্দিন আহমেদ বলেন, “সরকারি উদ্যোগে জেলেদের নিরাপত্তা ও উন্নয়ন নিশ্চিত করা জরুরি। এই চর দেশের মাছের বড় চাহিদা পূরণ করে।”
পরিবেশবিদরা বলছেন, সংরক্ষিত বনে মানবচাপ কমিয়ে পরিবেশবান্ধব বিকল্প স্থানে শুটকি পল্লি স্থানান্তর করা প্রয়োজন।
অন্যথায়, সুন্দরবনের এই ব্যতিক্রমী চরের প্রাকৃতিক ভারসাম্য আরও বিপন্ন হবে বলে তাদের আশঙ্কা।