ফারুকুজ্জামান, কিশোরগঞ্জ: বোরো মৌসুম শুরুর আগেই কিশোরগঞ্জে দেখা দিয়েছে তীব্র সার সংকট। জেলার বিভিন্ন এলাকায় কৃষকেরা প্রয়োজনীয় সার না পেয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। বিষয়টি স্বীকার করেছেন কৃষি কর্মকর্তারাও। তাদের মতে, চলতি মৌসুমে চাহিদার প্রায় অর্ধেক সার বরাদ্দ এসেছে জেলায়; ফলে বোরো ও ভুট্টা আবাদের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
নিকলী উপজেলার দামপাড়া ইউনিয়নের কৃষক মো. কামরুল হাসান চলতি মৌসুমে ১২ একর জমিতে বোরো আবাদ করছেন। সপ্তাহখানেক আগে তিনি বিসিআইসির ডিলারের কাছে পাঁচ বস্তা সার চাইলে পেয়েছেন মাত্র দুই বস্তা। ডিলাররা জানিয়েছেন—বরাদ্দ কম এসেছে।
গতকাল নিকলীর দামপাড়া, শিংপুর ইউনিয়নের গোড়াদিঘা, রশিদপুরসহ বিভিন্ন গ্রাম ঘুরে দেখা গেছে—সার সংকট নিয়ে কৃষকদের চরম হতাশা। সারাদিন অপেক্ষা করেও একজন কৃষক কেবল এক বস্তা সার পাচ্ছেন। স্থানীয়রা বলছেন, এভাবে সংকট চলতে থাকলে আবাদ ব্যাহত হবে, ফসলের ফলন কমবে।
শিংপুর গ্রামের কৃষক রমিজ মিয়া ও করিম মিয়া জানান, তাদের পাঁচ একর জমির জন্য প্রয়োজনীয় সার মিলছে না। একই অভিযোগ করেন গোড়াদিঘার আলম মিয়া, হারিছ মিয়াসহ অন্যান্য কৃষক।
কৃষকদের অভিযোগ—শিংপুর ইউনিয়নে বিসিআইসির ডিলার নিয়োগ দেওয়া হয়েছে ৪০ কিলোমিটার দূরের ভৈরব এলাকার বাসিন্দাদের। বর্তমান ডিলার আল আমিন জানান, তিনি শিগগিরই শিংপুরে সার সরবরাহ করবেন।
ডিলারশিপ নিয়ম নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয় কৃষকরা। কৃষি মন্ত্রণালয়ের নীতিমালা অনুযায়ী পার্শ্ববর্তী এলাকার ডিলার নিয়োগের সুযোগ থাকলেও, অন্য উপজেলার বাসিন্দার লাইসেন্স দেওয়া সাধারণত হয় না। এতে প্রায়ই অভিযোগ ওঠে—বরাদ্দকৃত সার কৃষি এলাকার বাইরে চলে যায় এবং বাড়তি দামে বিক্রি হয়।
বাংলাদেশ ফার্টিলাইজার অ্যাসোসিয়েশনের জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক খালেকুজ্জামান জানান, জেলায় বিসিআইসির ১৭৫ জন এবং বিএডিসির ৬৫ জন ডিলার আছে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, নভেম্বর মাসে ইউরিয়া সারের চাহিদা ছিল ১০ হাজার ১৬৪ টন; বরাদ্দ হয়েছে ৪ হাজার ৮৭৭ টন। টিএসপি, ডিএপি ও এমওপি সারের ক্ষেত্রেও চাহিদার প্রায় অর্ধেক বরাদ্দ মিলেছে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. সাদিকুর রহমান জানান, এক সপ্তাহের মধ্যেই হাওর এলাকায় বোরো বীজতলা তৈরির কাজ শুরু হবে। একই সময়ে ভুট্টার আবাদ শুরু হচ্ছে। এ পর্যায়ে সারের প্রয়োজন সবচেয়ে বেশি। তিনি আশা করছেন, অল্প সময়ের মধ্যেই সংকট দূর হবে।
জেলায় বোরো বীজতলার লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৭ হাজার ৮৪৩ হেক্টর, আর বোরো আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ১ লাখ ৬৮ হাজার ২৬০ হেক্টর। উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ৭ লাখ ৯৬ হাজার টন চাল। ভুট্টা আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ১১ হাজার ৭৮০ হেক্টর; যার বেশিরভাগই হাওর অঞ্চলে।
এদিকে, বিসিআইসির প্রায় ৩০ জন ডিলার নিজ উপজেলাবহির্ভূত এলাকায় লাইসেন্স পেয়েছেন বলে জানিয়েছেন ড. সাদিকুর রহমান। তিনি বলেন, কৃষি মন্ত্রণালয়ের ‘সার ডিলার নিয়োগ ও সার বিতরণ সংক্রান্ত সমন্বিত নীতিমালা–২০২৫’ প্রণয়নাধীন রয়েছে। ডিসেম্বরের মধ্যে এটি চূড়ান্ত হলে নিজ ইউনিয়নের বাইরে ডিলার নিয়োগের সুযোগ থাকবে না।
কৃষকদের আশা—নীতি পরিবর্তন ও সরবরাহ স্বাভাবিক হলে সংকট দ্রুত কাটবে। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে মৌসুমী আবাদ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে।