মহসিন কবির: রাজধানীর বিভিন্ন দাবিতে সড়ক অবরোধ করেছেন আন্দোলনকারীরা। এতে রাজধানীর বিভিন্ন সড়কে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়। সড়ক বন্ধ ও যানজটের কারণে ভোগান্তিতে পড়েন সাধারণ যাত্রীরা। যান চলাচল স্বাভাবিক করতে হিমশিম খেতে হয়েছে ট্রাফিক পুলিশের। সাধারণ মানুষ চায় আন্দোলনের সহজ সমাধান।
দাবি আদায়ে অনড় সরকারি সাত কলেজের আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা। তারা বলছেন, দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাবেন। সাত কলেজকে বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরের দাবিতে শিক্ষা ভবনের পেছনের অংশে সোমবার সকালে দুই শতাধিকা শিক্ষার্থী কর্মসূচি পালন করছেন। রাত পর্যন্ত চলে তাদের কর্মসূচি। এ সময় তারা আলোচনা সাপেক্ষে পরবর্তী কর্মসূচি ঠিক করার কথা জানান।
একই সঙ্গে দাবি না মানা পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার হুঁশিয়ারি দেন। আন্দোলনে অংশ নেওয়া এক শিক্ষার্থী বলেন, আমাদের কর্মসূচি অব্যাহত রয়েছে। রাতেও আমরা এখানে অবস্থান করেছি। সরকারের পক্ষ থেকে ইতিবাচক কোনো সিদ্ধান্ত না এলে আমরা আন্দোলন থেকে সরে যাব না।
রাজধানীর যাত্রাবাড়ীর শনিরআখড়ায় গ্যাসের দাবিতে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেছেন ভুক্তভোগী গ্রাহকরা। সোমবার (৮ ডিসেম্বর) দুপুর ১২টা থেকে বিকাল সোয়া ৩টা পর্যন্ত ব্যানার প্ল্যাকার্ড হাতে নিয়ে— গ্যাস চাই গ্যাস চাই, সিন্ডিকেটের কালো হাত ভেঙে দাও, জ্বালিয়ে দাও- বলে বিক্ষোভ করেন।
বিকাল সোয়া ৩টার দিকে ডিএমপির ওয়ারী জোনের এডিসি আকরাম তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলাপ করে গ্যাস সরবরাহের আশ্বাস দেওয়ার পর আন্দোলনকারীরা অবরোধ প্রত্যাহার করে নিলে যান চলাচল স্বাভাবিক হতে শুরু করে।
এদিকে ৩ ঘণ্টা সড়ক অবরোধের ফলে মহাসড়কের দুইপাশের কাঁচপুর-মদনপুর ও মেয়র হানিফ ফ্লাইওভার, গুলিস্তান, ঢাকা মেডিকেলসহ আশপাশের ৮-৯ কিলোমিটারজুড়ে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়। এতে ঢাকা অভিমুখী ও ঢাকা থেকে ছেড়ে যাওয়া দুরপাল্লার যাত্রীসহ রাজধানীর শহর সার্ভিসের বাসের যাত্রী এবং প্রাইভেটকারের যাত্রীদের চরম ভোগান্তি হয়। বিশেষ করে ঢাকা মেডিকেলসহ রাজধানীর বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা অ্যাম্বুলেন্সের রোগীরা চরম ভোগান্তির শিকার হন। নোয়াখালী থেকে অ্যাম্বুলেন্সে ঢাকা মেডিকেলে চিকিৎসা নিতে আসার পথে এক রোগীর মৃত্যু হয়।
এর আগে গতকাল রোববার সকাল ১০টার দিকে বাংলাদেশ মোবাইল বিজনেস কমিউনিটির ব্যানারে আগারগাঁওয়ের বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) ভবনের সামনের সড়ক অবরোধ করেন মোবাইল ব্যবসায়ীরা। দুপুর ১টায় প্রস্তাবিত ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটির অধ্যাদেশ জারির দাবিতে শিক্ষাভবন ঘেরাও কর্মসূচি করেন সাত কলেজের শিক্ষার্থীরা। এ ছাড়া সাত কলেজ নিয়ে গঠন হতে যাওয়া ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি প্রস্তাবিত ‘স্কুলিং কাঠামো’ বাতিল করার দাবিতে শাহবাগ মোড় আটকে বিক্ষোভ করেন উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীরা।
সড়ক আটকে ব্যবসায়ীদের বিক্ষোভ : তাদের দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে ন্যাশনাল ইকুইপমেন্ট আইডেনটিটি রেজিস্ট্রার (এনইআইআর), সিন্ডিকেট প্রথা বাতিল এবং মোবাইল ফোন আমদানির সুযোগ উন্মুক্ত করা। আন্দোলনকারী ব্যবসায়ীরা জানান, অতিরিক্ত ট্যাক্স আরোপের কারণে বাজারে মোবাইল ফোনের স্বাভাবিক কেনাবেচা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। ৫৭ শতাংশ ট্যাক্সের ফলে আমদানি করা মোবাইল ফোনের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় সাধারণ ভোক্তা ও ব্যবসায়ীরা উভয়েই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। এ ছাড়া এনইআইআর প্রক্রিয়ার বিভিন্ন জটিলতা, ফোন রেজিস্ট্রেশনে বিলম্ব, ভুল আইএমইআইয়ের কারণে ডিভাইস ব্লক হওয়া এসব সমস্যায় ব্যবসায়ীদের দীর্ঘদিনের ক্ষোভ চরমে পৌঁছেছে।
মোবাইল ব্যবসায়ীদের আগারগাঁও সড়ক অবরোধের কারণে ডাইভারশন দিয়ে অন্য সড়কে যান চলাচলের ব্যবস্থা করেছে ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগ। যার ফলে জাতীয় আর্কাইভ ভবনের সামনে, শ্যামলী, শিশু মেলাসহ আগারগাঁওয়ের আশপাশের সড়কগুলোয় যানবাহনের চাপ বেড়ে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়েছে।
এতে গন্তব্যে যেতে যাত্রীদের দীর্ঘ সময় যানবাহনে আটকে থাকতে হচ্ছে। অনেক যাত্রীকে ভোগান্তি নিয়ে হেঁটেই গন্তব্যের উদ্দেশ্যে যেতে দেখা গেছে। বেলা সাড়ে ৩টা পর্যন্ত মোবাইল ব্যবসায়ীরা সড়ক অবরোধ করে রেখেছেন।
এ বিষয়ে ডিএমপির ট্রাফিক তেজগাঁও বিভাগের শেরেবাংলা নগর জোনের সহকারী পুলিশ কমিশনার (এসি) জাকির হোসেন বলেন, ‘বিটিআরসি ভবনের সামনে মোবাইল ব্যবসায়ীদের সড়ক অবরোধের কারণে যান চলাচল বন্ধ রয়েছে। আমরা ডাইভারশন দিয়ে অন্য রাস্তায় যানবাহন চলাচলের ব্যবস্থা করেছি। আগারগাঁও একটি গুরুত্বপূর্ণ সড়ক। এটি বন্ধ থাকায় অন্য রাস্তায় ব্যাপক চাপ পড়েছে। বিভিন্ন সড়কে যানজটের সৃষ্টি হয়েছে। আমরা যান চলাচল স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করছি।’
‘স্কুলিং কাঠামো’ বাতিল করার দাবিতে উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষার্থীরা : একই দিন দুপুর পৌনে ১২টায় ঢাকা কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রস্তাবিত রূপরেখায় বর্ণিত স্কুলিং পদ্ধতি বাতিলের দাবিতে শাহবাগ মোড় অবরোধ করেন ঢাকা কলেজসহ পাঁচ কলেজের উচ্চমাধ্যমিকের শিক্ষার্থীরা। বেলা ১১টার পর ঢাকা কলেজের উচ্চমাধ্যমিকের শিক্ষার্থীরা সায়েন্স ল্যাব মোড়ে জড়ো হন। পরে সরকারি বাংলা কলেজ, কবি নজরুল সরকারি কলেজ, শহীদ সোহরাওয়ার্দী সরকারি কলেজ এবং বেগম বদরুন্নেসা সরকারি মহিলা কলেজের শিক্ষার্থীরা একসঙ্গে মিছিল নিয়ে এসে শাহবাগ মোড় অবরোধ করেন।
এতে ওই মোড় দিয়ে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। পরে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ১০ সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল দাবির বিষয়ে আলোচনা করতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে গেলে দুপুর ১২টা ২০ মিনিটে তারা সড়ক ছেড়ে দেন। আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা জানান, ঢাকা কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুলিং পদ্ধতির ওপর ভিত্তি করে প্রকাশিত অধ্যাদেশ ও মন্ত্রণালয়ের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিকে কেন্দ্র করে উচ্চমাধ্যমিকের অস্তিত্ব নিয়ে অনিশ্চয়তা সৃষ্টি হওয়ায় তারা এই অবরোধ করেছেন।
এ বিষয়ে ডিএমপির রমনা বিভাগের উপপুলিশ কমিশনার (ডিসি) মাসুদ আলম বলেছেন, শিক্ষার্থীদের আন্দোলন বিষয়ে কথা বলতে ১০ সদস্যের প্রতিনিধিদলকে সচিবালয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
অধ্যাদেশ জারির দাবিতে শিক্ষাভবন ঘেরাও : বেলা ৩টা ২৫ মিনিটে হাইকোর্ট মোড় অবরোধ করেন কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাদেশ ঘোষণার দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা। এতে হাইকোর্ট মোড় দিয়ে প্রেস ক্লাব, গুলিস্তান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও সচিবালয় অভিমুখী যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। সন্ধ্যা ৬টায় এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত তাদের সেখানে অবস্থান করতে দেখা যায়। এর আগে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা দুপুর ১টা থেকে শিক্ষাভবনের সামনে অবস্থান নেন। আন্দোলনকারীরা জানান, তারা আজকের মধ্যেই অধ্যাদেশ ঘোষণা চান। অধ্যাদেশ ছাড়া তারা ফিরবেন না।
একদিনে গুরুত্বপূর্ণ তিন স্থানে সড়ক অবরোধের কারণে যান চলাচল নিয়ন্ত্রণে ট্রাফিক পুলিশ সদস্যদের ব্যাপক বেগ পেতে হয়েছে। ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগের অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মো. আনিছুর রহমান বলেন, ‘বিভিন্ন দাবিতে সড়ক অবরোধের কারণে আমাদের প্রতিদিন ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা করতে খুবই কষ্ট হয়। আমাদের (ট্রাফিক) দম বেরিয়ে যাওয়ার মতো অবস্থা। এমনিতেই জনবহুল ঢাকায় পর্যাপ্ত রাস্তা নেই যানবাহন চলাচলের। তার মধ্যে বিভিন্ন দাবি-দাওয়া নিয়ে রাস্তা বন্ধের কারণে আমাদের খুবই কষ্ট পোহাতে হয়। যাত্রীদেরও ভোগান্তি হয়।’
আন্দোলনকারীদের উদ্দেশে তিনি আরও বলেন, ‘সবাই দেশের নাগরিক, সবাই দেশের ভালোটা বুঝি। কিন্তু আপনি (আন্দোলনকারী) সড়ক বন্ধ করে আন্দোলন করছেন, আপনি হয়তো জানেনও না আপনার কোনো আত্মীয় আন্দোলনের কারণে আটকা পড়ে হাসপাতালে যেতে না পেরে মারা গেছেন। আপনি হয়তো পরে খবর পাবেন। আপনার কর্মকা-ে যদি একজন নিকট-আত্মীয় চিকিৎসা না পেয়ে মারা যান, তখন কেমন লাগবে এই কথাটা বুঝলেই হয়।