প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

নোমান মোহাম্মদ: কথার আগুনে পুড়ছে বাংলাদেশের বিশ্বকাপ স্বপ্ন!

নোমান মোহাম্মদ
কথার লড়াই চলছে খুব। যেন যুদ্ধ! যেন সবাই সবার প্রতিপক্ষ। বিসিবি প্রেসিডেন্ট ঢিল ছুড়ছেন। অধিনায়ক থেকে সিনিয়র ক্রিকেটাররা ছুড়ছেন পালটা পাটকেল। স্বজনরাও কাদা ছোড়াছুড়ি করছেন। আছে সামাজিক মাধ্যমে আমজনতার নিরন্তর কাটাছেঁড়াও। এসবের ফাঁকে ক্রিকেটটাই কেবল মিইয়ে যায় হাওয়াই মিঠাইয়ের মতো। অথবা কে জানে, টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে বাংলাদেশের প্রত্যাশিত ক্রিকেটটা হাওয়ায় মিলিয়ে গেছে বলেই এসব!

বড় আশা নিয়ে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে গিয়েছিল এবার বাংলাদেশ। বড় বড় কথা বলে; বড় স্বপ্নের মাদল বাজিয়ে। ক্রিকেট-মাদকতায় বুঁদ হয়ে থাকা ১৭ কোটির হৃদয়ে সেমিফাইনালের আশার রঙ ছড়িয়ে। কিন্তু প্রত্যাশার সঙ্গে পারফরম্যান্সের বিশ্বাসঘাতকতা তো বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচেই! আঁততায়ী স্কটল্যান্ডের কাছে অতর্কিত পরাজয়ে।

ব্যস, ঢোলে বাড়ি! বিসিবি প্রেসিডেন্ট নাজমুল হোসেন পাপন কাঠগড়ায় দাঁড় করান পুরো দলকে। বিশেষত তিন সিনিয়র মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ, মুশফিকুর রহিম ও সাকিব আল হাসানকে। জবাব দিতে তারাও সময় নেননি। না, মাঠের ক্রিকেটে না। মুখের কথার তুবড়িতে। তাতে মিশে থাকে যাবতীয় যন্ত্রণা, হতাশা, কষ্ট, ক্রোধ।

হোঁচটে শুরুর পর খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে ওমানের বিপক্ষে জয় বাংলাদেশের। বিশ্বকাপের সুপার টুয়েলভস, মানে মূল পর্বে ওঠাটাই তখন অনেক যদি-কিন্তুর বিন্দুতে। সেমির স্বপ্ন বুঝি-বা দূরের অলৌকিক অদেখা ভুবন। কিন্তু এ নিয়ে সংবাদ সম্মেলনে প্রশ্ন করতেই সাকিবের অহমে আঘাত লাগে। ‘স্বপ্ন কি প্রতিদিন বদলায় নাকি? আপনারা বললে বদলে ফেলবো’Ñ এমন উত্তরে মিশে থাকে ব্যঙ্গ। তাচ্ছিল্য।

পরের ম্যাচ শেষে অধিনায়ক মাহমুদউল্লাহর আবেগের অগ্নুৎপাত। ক্রিকেটারদের ‘ছোট’ করা, পরিবারের দুঃখগাঁথা, পেইনকিলারের ব্যথা- সব উঠে আসে তাঁর ব্যথাতুর শব্দ-বাক্যে। ত্রয়ীর তৃতীয়জন মুশফিক এরপর দেন আয়না-তত্ত্ব। সমালোচকদের আয়নায় মুখ দেখার পরামর্শে।

ক্রিকেটাররা এভাবেই প্রথমে ঠারেঠোরে, এরপর একরকম ঘোষণা দিয়ে প্রতিপক্ষ বানিয়ে তোলেন সবাইকে। বিসিবি প্রেসিডেন্ট। গণমাধ্যম। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম। বুঝ-অবুঝ সাধারণ ক্রিকেটপ্রেমী। নির্বিশেষে। স্ফূলিঙ্গ হয়ে ওঠে দাবানল। সমালোচনার দাউ দাউ আগুনে মোমের মতো পুড়তে থাকে বাংলাদেশের টি-টোয়েন্টি বিশ^কাপ স্বপ্ন। জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক মোহাম্মদ আশরাফুল এখানে দায় দেখেন সব পক্ষের, ‘এটা আমাদের সবার দোষ। স্কটল্যান্ডের কাছে প্রথম ম্যাচ হারের পর বোর্ড প্রেসিডেন্ট যেভাবে মিডিয়ার সঙ্গে কথা বলেছেন, সেভাবে না বললেই হতো। এটার প্রভাব সবার মধ্যেই পড়েছে।’

বোর্ড প্রেসিডেন্টের কথাতেই কি সাকিব-মুশফিক-মাহমুদউল্লাহদের অমন প্রতিক্রিয়া? ‘আমার কাছে তাই মনে হয়। এটা স্পষ্ট বোঝা গেছে। ওমানের সঙ্গে ম্যাচে সব ক্রিকেটারের চেহারা দেখে খুব টেনসড মনে হয়েছে। সবাই একদম ছোট হয়েছিল। মাহমুদউল্লাহ, মুশফিককে সাত-আট নম্বরে পাঠানো…। টুর্নামেন্টের শুরুতে এ ধরনের ব্যাপারের একটা প্রভাব পড়েছে’ বলে উপলব্ধি আশরাফুলের।

কিন্তু মাঠে গিয়ে তো শেষ পর্যন্ত ক্রিকেটাররা খেলেন। তারা যদি অমন প্রকাশ্য প্রতিক্রিয়া না দেখাতেন, তাহলে তাদের জন্য আরেকটু নির্ভার হয়ে খেলাটা সম্ভব ছিল? নাকি নিজেদের হতাশা দূর করার জন্য এভাবে বলাটাও প্রয়োজন ছিল? আশরাফুল তুলে আনেন অতীতের উদাহরণ, ‘বোর্ড প্রেসিডেন্ট তো ৯ বছর ধরে আছেন। উনি সবসময়ই এমন বলেন। (২০১৫ সালে) দক্ষিণ আফ্রিকার সঙ্গে প্রথম ম্যাচে আমরা ১৬০ রানে অলআউট হয়ে গেলাম। উনি সবাইকে ডেকে কথা বললেন। এরপর আমরা সিরিজ জিতে গেলাম। আসলে একেকজন একেকভাবে প্রতিক্রিয়া দেখায়। তখন মাশরাফি অধিনায়ক ছিল; সে একভাবে রিঅ্যাক্ট করেছে। তখন হাতুরাসিংহে কোচ থাকায় এবং সুজন ভাই (খালেদ মাহমুদ) দলের সঙ্গে থাকায় ব্যাপারটি ভালোভাবে সামলাতে পেরেছে। এখন ওই জায়গাতে কেউ নেই বলেই হয়তো ক্রিকেটারদের প্রতিক্রিয়া একটু বেশি হয়েছে। তবে ক্রিকেটাররা এমনভাবে প্রতিক্রিয়া না দেখালে আরেকটু ভালো পারফর্ম করতে পারত।’

এ সামগ্রিকতায় কি বোর্ডের সঙ্গে জাতীয় দলের ক্রিকেটারদের দূরত্বটাই মিডিয়ার সামনে বেরিয়ে এল? আশরাফুলের সেটাই মনে হচ্ছে, ‘ভেতরের খবর তো জানি না। বাইরে থেকে আমার কাছে তো তাই মনে হচ্ছে। বোর্ড প্রেসিডেন্ট এমন কথা নতুন বলছেন না। যখনই খারাপ হয়, বলেন। এরপর আমরা আবার সাফল্যও পেয়ে যাই। ক্রিকেটাররা ওভাবে রিঅ্যাক্ট না করে টুর্নামেন্টটা ভালোভাবে শেষ করার কথা ভাবতে পারত। আসলে দুই দিকেই আছে। ক্রিকেটাররাও হয়তো ভেবেছে, যথেষ্ট হয়েছে। প্রতি সিরিজেই হয়তো-বা এসব শুনতে আর ভালো লাগে না।’

বাংলাদেশের প্রথম টি-টোয়েন্টি অধিনায়ক শাহরিয়ার নাফীস সামনে আনতে চান বিশ^কাপে বাংলাদেশের পারফরম্যান্স। এসব কথা চালাচালির প্রভাবেই কি দল খারাপ খেলছে? ‘আমার মনে হয় উলটা। দলের পারফরম্যান্স খারাপ হয়েছে বলেই এতোকিছু হচ্ছে। পাপন ভাইয়ের সঙ্গে ক্রিকেটারদের সম্পর্কের ব্যাপারে তো আগে আমার খুব স্পষ্ট ধারণা ছিল না। কিন্তু এখন বোর্ডে কাজ করার সূত্রে সেটি জানি। বোর্ড প্রেসিডেন্টের সঙ্গে ক্রিকেটারদের যেমন সম্পর্ক, তাতে এমন কিছু বলার অধিকার পাপন ভাইয়ের আছে। সাকিবও তো সেদিন বললেন, পাপন ভাই যে কথা বলেন, সেগুলো মাঝেমধ্যে আমাদের কাজে লাগে। সব মিলিয়ে আমার মনে হয়, মাঠের ক্রিকেটে আমাদের প্রত্যাশা পূরণ হচ্ছে না বলেই সবাই চাপ অনুভব করছে। সে চাপ থেকেই সব কিছু হচ্ছে’ – নাফীসের উপলব্ধি।

আর গণমাধ্যমের সঙ্গে ক্রিকেটারদের কথা বলার সময় আরো সতর্কতার প্রয়োজনীয়তাও দেখেন তিনি, ‘পরিস্থিতি ক্রিকেটারদের পক্ষে যাচ্ছে না। মিডিয়ার সঙ্গে কথা বলার সময় ক্রিকেটারদের আরো অনেক সচেতন থাকা উচিত। হ্যাঁ, সামাজিক মাধ্যমে সবসময় যে রেসপন্সিবল বিহেভিয়ার হয়, তা আমি বলবো না। এটি ঝোঁকের ওপর চলে, নিয়ন্ত্রণের উপায় তো নেই।

ক্রিকেটারদের সেদিকে মনোযোগ দেবার প্রয়োজনও আমি দেখি না। তবে মূলধারার গণমাধ্যমের সঙ্গে কথাবার্তা বলার সময় অবশ্যই ওদের আরও সতর্ক হওয়া উচিত। তাহলে শেষ পর্যন্ত ওদেরই লাভ হবে।’

টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ থেকে বাংলাদেশের লাভের খাতায় কিছু যোগ হবে কিনা, কে জানে! তবে সব পক্ষ ফুঁ দিয়ে জ্বালিয়েছে যে আগুন, সেটি নেভাতে পারে কেবল মাঠের পারফরম্যান্স। নইলে মাঠ ও মাঠের বাইরে বাংলাদেশ ক্রিকেট হয়ে উঠবে জতুগৃহ। সে আগুনের আঁচ এড়াতে পারবেন কি কেউ! সূত্র : ডয়চে ভেলে

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত