প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

অধ্যাপক ড. কামরুল হাসান মামুন: উন্নয়নের কোনো ছোঁয়া দেশের জনগণের ওপর কি পড়েছে?

অধ্যাপক ড. কামরুল হাসান মামুন
বিশ্ব অর্থনীতিতে অবদান রাখার সূচকে আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে বাংলাদেশ কানাডার সমান হয়ে যাবেÑ বলছেন আমাদের অর্থমন্ত্রী। তার আগে বলেছিলেন বিশ্ব অর্থনীতিতে প্রবৃদ্ধি অর্জনের দিক দিয়ে বাংলাদেশের অর্থনীতি কানাডা ও থাইল্যান্ডের সমান। আমাদের অর্থনীতি যদি এতোই ভালো হবে দেশের অধিকাংশ মানুষ কেন ইউরোপ, আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া বা কানাডা যেতে মরিয়া? কেন দেশের দুর্নীতিবাজ মানুষরা কানাডার বেগমপাড়ায় পাড়ি দেবে? বরং তাহলে এখন উল্টো স্রোত হওয়ার কথা। কানাডা ও থাইল্যান্ডের সমানই যদি হবে দেশ থেকে প্রতিবছর কেন হাজার হাজার মানুষ চিকিৎসার জন্য কানাডা থাইল্যান্ডে যায়? কানাডা ও থাইল্যান্ডের সমানই যদি হবে দেশ থেকে প্রতিবছর কেন হাজার হাজার শিক্ষার্থী পড়াশোনার জন্য পশ্চিমা দেশে যায়? স্বয়ং রাজধানীর রাস্তা দিয়ে হাঁটলে কি মনে হয় আমরা কানাডা ও থাইল্যান্ডের রাস্তা দিয়ে হাঁটছি? উন্নয়নের কোনো ছোঁয়া দেশের ৯৮ শতাংশ জনগণের ওপর কি আদৌ পড়েছে? দেশ যদি সত্যি সত্যি উন্নত হতো তাহলে দেশের ট্রাফিক সিস্টেম অটোমেটিক হতো। যেই দেশের রাজধানীর ট্রাফিক ব্যবস্থাকেই অটোমেটিক বা স্বয়ংক্রিয় করতে পারে না তারা কোনমুখে বলে দেশের অর্থনীতি সিঙ্গাপুর, কানাডা থাইল্যান্ডকে ছুঁই ছুঁই করছে? মানহীন কদর্যপূর্ণ ভবন নির্মাণ ব্যতীত উন্নয়নের কোনো ছোঁয়া কোনো ক্ষেত্রে কি আছে?

প্রবৃদ্ধিই কি সব? দেশের ১০০ জন মানুষের যদি অঢেল সম্পদ থাকে, অঢেল টাকা কামায় আর কামানো সেই টাকার আল্টিমেট গন্তব্য যদি হয় ইউরোপ আমেরিকা বা কানাডা তাহলে এই প্রবৃদ্ধির কি কোনো মূল্য আছে? এই মানুষগুলো যদি দেশে থাকার টার্গেট থাকতো তাহলে দেশকে সুন্দর করে তৈরি করতে আপ্রাণ চেষ্টা করতো। এখন তারা আপ্রাণ চেষ্টা করে কতো দ্রæত টাকা কামিয়ে তা নিয়ে স্ত্রী-সন্তানসহ কীভাবে বিদেশে পালানো যায়। তবে হ্যাঁ কিছু কিছু ক্ষেত্রে আমরা সত্যি সত্যি সিঙ্গাপুর, কানাডা থাইল্যান্ডসহ বিশ্বের বড় অর্থনীতির দেশকে ছুঁই ছুঁই করছি। সেটি কোন খাত? দ্রব্য মূল্যের দিক দিয়ে। কানাডার টরেন্টোতে এক কেজি গরুর মাংস বাংলাদেশি টাকায় ২৫৬ টাকা। সিঙ্গাপুরে ফ্রোজেন গরুর মাংসের কেজি ৫৫৮ টাকা। ইতালির ভেনিসে গরুর মাংসের কেজি ৫৫০ টাকা। ভারতের কলকাতায় গরুর মাংসের কেজি ২১০ থেকে ২৪০ টাকা। সেই জায়গায় বাংলাদেশে এক কেজি গরুর মাংসের দাম প্রায় ৬০০ টাকা যা কলকাতার দ্বিগুণ আর কানাডা সিঙ্গাপুরে দামের সমান। এই দিক থেকে মন্ত্রীরাতো ঠিকই বলেন। মানে খারাপ দিক দিয়ে আমরা তাদের সমান ঠিকই। কিন্তু তাদের দেশের মানুষরা যে সামাজিক সুরক্ষা পায়, মানসম্পন্ন চিকিৎসা ও শিক্ষা পায়, পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন এবং জ্যামমুক্ত রাস্তা পায়। তার ওপর সামাজিক সুরক্ষা পায়।

জিনিসপত্রের দামের দিক থেকে উন্নত দেশের সমান আর প্রতিবেশী কলকাতার দামের অর্ধেক। একই কথা বলা চলে বাসা ভাড়ার ক্ষেত্রে। ভারতের একজন অধ্যাপকের বেতন হলো বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ২ লাখ ৫০ হাজার। সেখানে বাংলাদেশে একজন অধ্যাপকের বেতন হলো ১ লাখ টাকার মতো। এটি অন্যান্য পেশার ক্ষেত্রেও একই। দ্রব্য মূল্যের অবস্থা, বাসা ভাড়ার অবস্থা আর সঙ্গে সন্তানের লেখাপড়ার কথা ভাবুন। তাহলে মানুষ কেন দুর্নীতিগ্রস্ত হবে না? অনেক ক্ষেত্রে মানুষ বাধ্য হচ্ছে। কয়েকদিন আগে বিজিবির এক সদস্য আত্মহত্যা করেছে কারণ সে তার বেতন দিয়ে মায়ের চিকিৎসা এবং পরিবারের খরচ সামাল দিতে পারছিলো না। পুরো শাসন ব্যবস্থায় গলদ। যাদের ক্ষমতা আছে তারা সেই ক্ষমতাকে ব্যবহার করে যেভাবেই হোক টাকা বানাচ্ছে। পারলে বেশি করে বানিয়ে দেশ থেকে ভাগছে। কারণ এটি আর বাসযোগ্য দেশ নয়। যদি হতোই সবাই কেন দেশ ছেড়ে ভাগতে চায়? লেখক : শিক্ষক, পদার্থবিজ্ঞান বিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত