প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

নবনীতা চক্রবর্তী: সহিংস উগ্রবাদ ও সাম্প্রদায়িক সমাজ

নবনীতা চক্রবর্তী: উগ্রবাদ আসলে কী ? যুক্তি পরাস্ত হওয়া । কোন ব্যাক্তি বা সমষ্টি একধরনের উগ্র মতবাদ বা বিশ্বাস পোষণ করে থাকে । এই উগ্রবাদের রুপান্তর ঘটে সন্ত্রাসবাদে । যা থেকে সহিংসতার জন্ম নেয় । তখন মানুষ হিংস্র হয়ে উঠে । নিজের স্বার্থ উদ্ধারের উদ্দেশ্যে ক্ষেত্রবিশেষে নিজের ক্ষতি করে হলেও অন্যের ক্ষতি করে নিজের মত ও জোর স্থাপন করে। এই উগ্রবাদ নীতির সাথে ধর্মীয় বিশ্বাসকে গুলে যে নব্য সন্ত্রাসবাদের উত্থান যা শুধু সামরিক মহড়া বা যুদ্ধকালীন ও যুদ্ধ পরবর্তী প্রভাবের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয় এর প্রভাব আরো গভীরে । খুব ধীরে ধীরে মানুষের মগজ উগ্রবাদের শিকার হচ্ছে । যা সমাজ ব্যবস্থাকে অস্থিতিশীল তৈরী করার মধ্য দিয়ে একই সাথে তৈরী করছে উগ্রবাদী মানুষ । এই উগ্রবাদের রাজনৈতিক , ধর্মীয় ও অর্থনৈতিক দিক রয়েছে । রয়েছে নানা মেরুকরণ । যা খুব স্বাভাবিকভাবেই সমাজকে প্রাভাবিত করে এবং সমাজ গঠনে গুরুত্বপুর্ণ নির্ণায়ক হয়ে উঠে । গভীর মনোযোগ নিয়ে দৃষ্টি রাখলে উগ্রবাদের নানান উপসর্গ সমাজে দৃশ্যমান ।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে ধর্মীয় উগ্রবাদ সূচনার মূলশিকড় সেই ৭০ দশকে । বাংলাদেশের স্বাধীনতা প্রশ্নে ধর্মজীবিরা বরাবরই খুব স্পষ্টভাবে বিরোধী অবস্থানে ছিল । যার প্রতিফলন দেহা যায় সত্তরের নির্বাচনে । সত্তরের নির্বাচনের মুল বিষয় ছিল স্বাধীন বাংলাদেশ । যার  প্রশ্নে ৭২ শতাংশ ভোট  স্বাধীন বাংলাদেশ হওয়ার পক্ষে হলেও ২৮ শতাংশ ভোট বিপক্ষে পরেছিল । সেই ২৮ শতাংশ বাংলাদেশ জন্মের বিপক্ষকারী ভোটদর্শনধারীদের প্রেতত্মা  উগ্রবাদের যে বীজ রোপণ করেছে তা আজ মহীরুহ । সমাজে তাদের আদর্শিক প্রতিনিধিত্ব চর্চা দেশের রাজনৈতিক তথা সামজিক মেরুকরণে ভূমিকা রেখে চলেছিল । তাই ৭৫ এর ১৫ আগষ্ট এর অন্ধকারময় ন্যাক্কারজনক অধ্যায়,এরপরেরই ধর্মভিত্তিক রাজনীতির উত্থান,বিচারহীনতার সংস্কৃতির গোড়াপত্তন , ২১ অগাষ্ট এর নৃশংসতা , সহিংস উগ্রবাদ একই সুতোয় গাথাঁ ।

সহিংস উগ্রবাদের ফলে সমাজে সহনশীলতারপ্রবণতা উদ্বেগজক ভাবে হ্রাস পাচ্ছে । যার পরিনতিতে কুমিল্লার নানুয়াদিঘী ,নোয়াখালী , চাপাইনবাবগঞ্জ, পীরগঞ্জ, চাদপুর এর ঘটনা আমরা ঘটতে দেখছি অথবা দেখব । রামু , নাসিরগঞ্জ বা বাশখালি কোন ঘটনাই এখন আর বিচ্ছিন্ন নয় । শুধু বিশ্বব্যাপী উগ্রবাদ নয় উগ্রবাদের চর্চার খুব সুকৌশলে সমাজে প্রাত্যহিক জীবনে চর্চিত হচ্ছে । কেউ আমরা কারো মতবাদের উপর সহনশীল হতে পারছি না , শ্রদ্ধাশীল হতে পারছি না । সত্যি বলতে, সহবস্থান বিষয়টির ক্রমশ বিলুপ্ত হচ্ছে । সেই সাথে রয়েছে আত্মাকেন্দ্রিকতা । সবাই নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত ।  কথা শুনবার কেউ নেই বুঝবার কেউ নেই । সবাই এক অস্থির এক সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি । নীতি নৈতিকতার কোন চর্চা নেই । নেই পারস্পারিক সম্মানবোধ । কার্যত বিজ্ঞান বলে প্রত্যেকটি মানুষ আলাদা। তাদের স্বায়ুকোষ ,নিউরন , শ্বাস প্রশ্বাসের ধারা ,গঠন সবটাই সম্পূর্ণ ভিন্ন । প্রতিটি মানুষের বেড়ে উঠাও আলাদা । তার পারিবারিক ও প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ,পারিপাশ্বির্ক পরিবেশ , সামাজিকরণ ও অভিজ্ঞতা তার চারিত্রিক বৈশিষ্টকে নির্ধারণ করে তাকে প্রভাবিত করে এবং মতাদর্শ সৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে । । সুতারাং আমিই সেরা বাকিরা কিছু না , আমার মতটাই ঠিক বাকি সব ভুল এই উন্নাসিক চিন্তা ও চর্চা থেকে অবমুক্তি দরকার । অপরের চিন্তা ,ধারনা , বিশ্বাস ও মূল্যবোধের অস্বিত্বকে স্বীকার করা এবং শ্রদ্ধাশীল হওয়ার বিষয়টিও  চর্চিত হতে হবে ।

এখানে আইন কানুনের প্রয়োগ যতটা কঠিন ভাবে জরুরি তারচেয়েও জরুরি সমাজিক কাঠামো বা সমাজ ব্যাবস্থাকে সুন্দর ভাবে গড়ে তোলা । সামাজিক প্রতিরোধ এখানে সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করতে পারে । যেকোন ঘটনা বা প্রেক্ষাপটে সমাজের দায় সবচেয়ে বেশি । প্রশাসনেরভুমিকা অবশ্যই  থাকবে কিন্তু সমাজের ভুমিকা কোথায় ? আমরা কি সমাজ তৈরী করছি ?

আমাদের সমাজে জাতি ,ধর্ম ,বর্ণ নিবিশেষে একত্রে বহু ধরনের মানুষের বাস । তাদের নিজস্ব ভিন্ন ভিন্ন সংস্কৃতি,মত ও বিশ্বাস রয়েছে । রয়েছে ভিন্ন ভিন্ন অভিজ্ঞতা ,অভ্যাস , বইশিষ্ট এবং জীবনাচারণ । এই বিচিত্রতা নিয়ে আমাদের সবার সহবস্থান । এই নীতি ,রীতি এবং ঐতিহ্য আমাদের আবহমান বাংলার । তাই আমাদের কবিরা লেখেন ,

“পাড়ার ছেলে মোরা ভাই ভাই /থাকি সেথা সবে মিলে /নাহি কেহ পর ।“

আবার ,” সকলে আমরা সকলের তরে / প্রত্যেকে আমরা পরের তরে ।“

এই জীবনবোধ ও দর্শন আমাদের চিরায়িত বাংলার । এই পারস্পারিক সম্প্রীতির রাখিবন্ধনে আমাদের সহবস্থান । সেই জীবনবোধ ও সমাজ কাঠামোয় আজ ব্যাপক পরিবর্তন । অবশ্যই সমাজ পরিবর্তনমুখি কিন্তু সেটি যদি আমাদের মূল্যবোধ ও সংস্কৃতিকে ক্ষয় করে ফেলে তাহলে তার পচন অবশ্যম্ভাবী । বর্তমান সমাজে আমরা কি দেখি , ধর্ম ও সংস্কৃতি পারস্পারিক দ্বিমুখী অবস্থানে এসে দাড়িয়েছে । আমরা কি শিখছি ? কি শেখাতে আমরা চাইছি ? শুধু পাঠ্যপুস্তকের বিষয় পরিবর্তনই নয় এই যে কোমলমতি  শিশুদের  জিপি ফাইভের ইদুর দৌড়ে  বিবেক ও যুক্তি বির্সজন দিয়ে আমরা লেলিয়ে দিচ্ছি । আমরা এমন শিক্ষা প্রদান করছি যেখানে আমিই সেরা বাকি সব তুচ্ছ । আত্মকেন্দ্রিকতা ও আত্মপ্রেমে মগ্ন থাকার বোধ প্রতিনিয়ত মগজে ঠুকে দিচ্ছি , যখন ভোগ বিলাস মানুষের মূল লক্ষ্য হয়ে উঠছে তখন মুখ থুবড়ে পরে মানবিকতা ,আর্দশ তথা মূল্যবোধ । আমাদের বেশভূষা ,আদবকায়দা ,শব্দ চয়ন কোনটাই ঠিক আমাদের ঐতিহ্যকে প্রকাশ করে না । অবাধ আকাশ সংস্কৃতির জোয়ারে আমরা একটা জগাখিচুড়ির সংস্কৃতিকেই আমাদের নিজের করে তুলেছি । সাংস্কৃতিক সংগঠন ও দলগুলোর রয়েছে নামমাত্র কার্যক্রম । অথচ তাদের সরব থাকবার সময় এখনই । আমাদের নিক্রিয়তা আরো সুযোগ তৈরী করে দিচ্ছে উগ্রবাদ বিকাশের । না বুঝে অনুষ্ঠান আর দিবস পালনের ঘনঘটা আমাদের ক্ষণিকের ঘটনামুখী করে তুলছে । স্বার্থসিদ্ধির একটি উপায় হয়ে উঠছে মাত্র ।প্রগতিশীল উদারমনস্ক মানুষ যারা সত্যি সত্যি আছি বা আছেন বলে দাবি করি করছি বা করছেন তাদের সোচ্চার হওয়ার দায় আছে ।

৪।

এর সমাধান কোথায় ? আজ কুমিল্লা , নোয়াখালী , চট্টগ্রাম , ফেনী ,চাপাইনবাবগঞ্জ,পীরগঞ্জের এই আঘাত শুধু একটি গোষ্ঠীর উপরে নয়  কারন  বর্তমানে প্রগতিশীল ,যুক্তিমনস্কমানুষরা সবচেয়ে বেশি কোণঠাসা এবং তারাই সংখ্যালঘু ।এই আঘাত বাংলাদেশের সংবিধানের উপর । মানুষের মৌলিক অধিকারের উপর। বাংলাদেশের মানুষের সম্প্রীতির চিন্তা চেতনার উপর । মুক্তিযুদ্ধের চেতনার উপর ।একে অপরকে দোষারোপ করার মধ্য দিয়ে এই অপ্শক্তি রোধ  করা সম্ভব হবে না । সহিংস উগ্রবাদ ও সাম্প্রদায়িকতার চর্চার জন্য শুধু একটি কারন যেমন শেষকথা  নয় তেমন সমাধান বা দায়িত্বের বিষয়টিও একপাক্ষিক নয় । রাষ্ট্রকে অবশ্যই সাধারণ নাগরিকের জানমালের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। কিন্তু একক অর্থে সরকার প্রধানের দিকে তাকিয়ে থাকলে  আর কাদা ছোড়াছুড়ি করলে দিনশেষে সমাধানের পথ সেই আড়ালেই থেকে যাবে । কারন সরকার একটি সামষ্টিক বিষয় । সমাজের সর্বস্তরে  স্ব-স্ব- দায়িত্বে নিয়োজিত মানুষদের দায়িতত্বশীলতার প্রশ্নে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে । একটি উদারমনস্ক অসাম্প্রদায়িক  সমাজ চাই বা হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করলেই হবেনা এবার সবার যার যার অবস্থান থেকে কর্মী হবার পালা । আর্দশিক মানুষ হবার লড়াইটাই এখন সবচেয়ে জরুরি । আমাদের রাজনীতি , শিক্ষানীতি , অর্থনীতি ,কর্মনীতি এবং সমাজনীতি সবখানে এই অসাম্প্রদায়িক  এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনার চর্চা নিশ্চিত করা সময়ের দাবি ।যে গণতান্ত্রিক চিন্তা ও দেশপ্রেমকে সম্বল করে বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রাম সংঘটিত হয়েছিল আজ আবার তাসমাজ ব্যবস্থায় প্রতিষ্ঠা লাভ করুক । মানুষের মগজে মননে সেই চিন্তার ও যৌক্তিকবোধের শুভ উদয় ঘটুক । শুধু কোন সম্প্রদায়ের ক্ষেত্রে নয় একটি মানুষেরও যেন গনতান্ত্রিক অধিকার ক্ষুন্ন হয় মানবিক মর্যাদা ভূলুন্ঠিত হয় এমন একটি ঘটনাও আর দেখতে চাইনা, ঘটাতে দিতে চাইনা । ১৯৬৪ সালের প্রেক্ষাপটে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বলেছিলেন “ পূর্ব বাংলা রুখিয়া দাঁড়াও “।

আজ মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ৭২র সংবিধানে ফিরতে চাইছেন । উদারমনস্ক , প্রগতিশীল ,গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ নির্মাণে এ এক সাহসী এবং নিঃসন্দেহে সময়োপযোগী পদক্ষেপ ।রাতারাতি হয়ত সমাজ পরিবর্তন করা সম্ভব হবে না । তবে আর্দশিক রাষ্ট্রগঠনে সংবিধান একটি দায়বদ্ধতা ।  সর্বোপরি মানুষের কল্যাণে মানুষের শুভ চৈতন্যের বোধোদয় ঘটূক ।  লাল সবুজের প্রিয় স্বদেশ হোক ধর্ম , বর্ণ , জাতি নির্বিশেষে সবার ।

নবনীতা চক্রবর্তী: শিক্ষক , ইউনিভারর্সিটি অফ ইনফরমেশন সায়েন্স এ্যান্ড টেকনোলজি , ঢাকা ।

সর্বাধিক পঠিত