প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

শওগাত আলী সাগর: নির্ভার প্রশান্তিতে, উদ্বেগহীনভাবে ধর্মীয় উৎসব নিশ্চয়তা পাক

শওগাত আলী সাগর: [১] মে আই সি ইউর প্রুফ অব ডাবল ভ্যাকসিনেশন!- বার্চমাউন্ট রোডের টরন্টো দুর্গাবাড়িতে ঢোকার মুখেই সিকিউরিটি আটকে দেয়। দুর্গাপূজার নবমীর দিনে ভিড়টা একটু বেশিই। তবু প্রবেশমুখে নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছে তরুণ সিকিউরিটি। ডাবল ভ্যাকসিনেশনের প্রমাণ দিয়ে পাশে রক্ষিত খাতায় নাম ঠিকানা লিখে মন্দিরে প্রবেশ। আনুষ্ঠানিকতা সেরে আমি পাশে দাঁড়িয়ে যাই। রূপা, অনুশ্রী, আজিম আসবে- অপেক্ষাটা তাদের জন্য হলেও মুহূর্তে সেসব ভুলে আমি মানুষের মুখের দিকে তীক্ষè দৃষ্টিতে তাকাতে থাকি। আমি কী কিছু খুঁজছি তাদের চোখমুখে!

[২] মন্দিরে ঢুকেই হলওয়েতে কবি আসাদ চৌধুরীকে মধ্যমণি করে বসে আছেন মন্দিরের কর্মকর্তারা। ভেতরে পূজার আনুষ্ঠানিকতা। মানুষ ঢুকছে, পূজা করছে, আবার বেরিয়ে যাচ্ছে। আমি স্থির হয়ে দাঁড়াতে পারি না। মন্দিরের ভেতর, হলওয়েতে, আবার বাইরের গেটটার পাশে ঘুরে ঘুরে মানুষের চোখেমুখে কিছু একটা খুঁজতে থাকি। কী সেটা! কী খুঁজি আমি!
[৩] দুর্গাবাড়ী থেকে দলবেঁধে আমরা চলে যাই ১৬ ডোমের হিন্দু কালচারাল সেন্টার এবং হিন্দু মন্দিরে। সেখানকার ভিড় দেখেও ভিমড়ি খাওয়ার যোগাড়। সুভাষ দা একেবারে প্রবেশ পথ থেকেই ভিড় ঠেলে আমাদের নিয়ে যান মন্দিরের ভেতর। তার আগে অবশ্য কোভিড সংক্রান্ত আনুষ্ঠানিকতাটা সারতে হয়েছে। মন্দিরে রুপা আর তার মেয়েরা পূজায় মগ্ন হয়, আমি আবারও ঘুরে ঘুরে ভিড় দেখতে থাকি, ভিড়ের মধ্যে মানুষের মুখ দেখি, তাদের চোখেমুখের অভিব্যক্তি দেখি। কী খুঁজি আমি মানুষের চোখে! মুখে!

[৪] কোভিডের কারণে এবার টরন্টোয় দুর্গাপূজার আয়োজন হচ্ছে সীমিত পরিসরে। তবু মন্দিরগুলোয় মানুষের ভিড় একেবারে কম হয়নি। সেই ভিড়ে আনুষ্ঠানিকতা নেই, কিন্তু প্রাণ আছে, প্রাণের ছোঁয়া আছে। আর আছে উদ্বেগহীন, নির্ভার এক প্রশান্তি। হঠাৎ মনে হয়- আমি ঠিক বুঝে গেছি- এতোক্ষণ আসলে আমি কী খুঁজছিলাম।

[৫] ফেসবুকে একটা ভিডিও দেখেছিলাম। দুর্গাবাড়িতে পূজার ঢাক বাজাচ্ছেন স্থানীয় সিটি কাউন্সিলর গ্যারি ক্রফর্ড। পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত ফেডারেল এমপি সালমা জাহিদ পূজামণ্ডপ ঘুরে এসে ফেসবুকে ছবি পোস্ট করেছেন। মুসলমানদের ঈদের মাঠে মন্ত্রী, এমপি, মেয়র সিটি কাউন্সিলররা ছুটে যান, তারা যান মুসলমানদের পোশাক পরেই। ঈদের জামাতেও আমি মানুষের চোখমুখের দিকে কিছু একটা খুঁজেছি। যেটা আজ পূজার মন্দিরেও খুঁজছি। কী আশ্চর্য! এই দেশটায় হিন্দু-মুসলমান- দুইই সংখ্যালঘু। অথচ দুই সম্প্রদায়ই তাদের ধর্মীয় উৎসব উদযাপন করে নির্ভার প্রশান্তিময় মন নিয়ে, চোখেমুখে সেই প্রশান্তির প্রলেপ স্পষ্ট দৃশ্যমান হয়। তাদের জন্য রাষ্ট্রকে কোনো পাহারার ব্যবস্থা করতে হয় না, তাদের ভুল করেও ভাবতে হয় না- এই দেশটায় তারা সংখ্যালঘু।

[৬] হিন্দু মন্দিরে উত্তম দা সার্বক্ষণিক আমাদের দিকে মনোযোগ রাখছিলেন। সুবল দা, সুদান নিশ্চিত করলেন- আমরা যেন ভিড় দেখে পূজার প্রসাদ না নিয়েই ফিরে না আসি। দুর্গাবাড়িতে সেটি নিশ্চিত করেছিলো বন্ধু অরুণ। ধর্মীয় বিশ্বাস বিবেচনায় নিলে আমাদের দলটিতে তিন ধর্ম বিশ্বাসের মানুষের সমাহার। আমরা কী পরম নিশ্চিন্তে, নির্ভার প্রশান্তিতে মন্দির থেকে মন্দিরে পূজার উৎসবে ঘুরে বেড়ালাম!

[৭] হিন্দু মন্দির থেকে বেরিয়ে এসে আবার পেছন ফিরে তাকাই। আলো আঁধারিতে মন্দিরের সামনের ভিড়টায় চোখ আটকে থাকে। ফিসফিস করে নিজে নিজেই বলি- পৃথিবীর দেশে দেশে, বাংলাদেশে, সর্বত্র- মানুষ এমন নির্ভার প্রশান্তিতে, উদ্বেগহীনভাবে তাদের ধর্মীয় উৎসব উদযাপনের, জীবনযাপনের নিশ্চয়তা পাক। লেখক : কানাডা প্রবাসী সাংবাদিক

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত