প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী: ছোট ফুল – রাসেল ফুল!

১৯৬৪ সালের ১৮ অক্টোবর ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধু পরিবারে একটি শিশু জন্মগ্রহণ করলো। দেখতে সতেজ ও ফুটফুটে ফুলের মতো। সব ভাইবোনরা ভীষণ খুশি। বাবা শেখ মুজিব আদর করে নাম রাখলেন রাসেল। বঙ্গবন্ধু পরিবারের সবার নামে আগে শেখ উপাধি অনিবার্যভাবেই থাকে। সুতরাং রাসেলের নাম শেখ রাসেল হলো। বঙ্গবন্ধুর এই নামটি বাছাইয়ের পেছনে ছিলো এখন বিশ্ববিখ্যাত দার্শনিকের প্রতি সম্মান ও শ্রদ্ধা। সেই সময়ে পৃথিবীব্যাপী পরিচিত দার্শনিকের নাম বার্ট্রান্ড রাসেল। তিনি ছিলেন একজন ইংরেজ দার্শনিক। মানবতাবাদের প্রতি তার ছিলো অগাধ বিশ্বাস। সেকারণে তিনি লেখালেখিতেই শুধু নয়, যুদ্ধবিরোধী মানবতাবাদের আন্দোলনে তখন ছিলেন পৃথিবীর অন্যতম আলোচিত ব্যক্তিত্ব। আমাদের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন একজন স্বভাবজাত চিন্তাশীল ও উদারবাদী রাজনীতিবিদ। তার রাজনীতিতে দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক মহৎ সব নেতার মতাদর্শের প্রভাব পড়েছিলো। বার্ট্রান্ড রাসেল ছিলেন সেই সময়ের জীবিত দার্শনিকদের মধ্যে অন্যতম। যাকে তিনি গভীরভাবে শ্রদ্ধা করতেন। তার এই শ্রদ্ধার প্রতিফলন ঘটে নিজের শিশুপুত্রের নাম রাখার ক্ষেত্রে। সদ্য ভূমিষ্ঠ হওয়া শিশুটির নাম তিনি রাখলেন রাসেল। তার হয়তো মনে রাসেলকে নিয়ে কোনো স্বপ্ন থেকে থাকতে পারে। বার্ট্রান্ড রাসেলের মতো শেখ রাসেলও হয়তো জীবনে তার কর্ম দিয়ে সকলের শ্রদ্ধার মানুষ হয়ে ওঠবেন। বঙ্গবন্ধুর মতো নেতারা তো এমনভাবেই ভাবেন। সময়টি তখন বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক জীবনের জন্য একটি বড় ধরনের মোড় পরিবর্তেন ঘটানোর।

রাসেল ধীরে ধীরে বড় হচ্ছিলো। ভাইবোনদের মধ্যে সেই ছিলো সবার নজরকাড়ার, আদর নেওয়া ও পাওয়ার। যেন একুল থেকে ওকুলে সারাক্ষণই তাকে বড় ভাইবোনোরা আদর করতে টানাটানি করতো। দেখতেও ছিলো দারুণ ফুটফুটে যেন বাগানের হলুদ কিংবা লাল ফুল। বঙ্গবন্ধু যখন জেলে যান বেগম ফজিলাতুন নেছা মুজিব রাসেলকে জেলগেটে নিয়ে যেতেন। বঙ্গবন্ধু তাকে কোলে টেনে তুলে নিতেন, আদর করতেন, চুমু খেতেন। রাসেলও বাবাকে জড়িয়ে ধরে অনেকক্ষণ বুকের উত্তাপ নিতেন। বাবা-পুত্রের এমন দৃশ্য প্রায়ই জেলখানায় কিছুক্ষণের জন্য সবাই উপভোগ করতো। বাড়িতে যখন রাসেল ফিরতো সবাই তাকে এটা-সেটা খাওয়ার জন্য হাতে তুলে দিতো। রাসেল ৩২ নম্বরের নিচতলায় খেলাধুলায় মেতে থাকতো। বঙ্গবন্ধু পরিবারের সব সন্তানই তো খেলাধুলায় বিশেষভাবে আগ্রহী ছিলো। নানা ধরনের বল, খেলনা, খেলার গাড়ি, বেলুন নিয়ে তার ছিলো নানা ব্যস্ততা। ভাইবোনরা যখনই বাসায় প্রবেশ করতো রাসেলকে কিছুটা সময় দিতে সবাই যেন তৎপর ছিলো। বড় বোন হাসু আপার সঙ্গে তার ছিলো বড়ই সখ্যতা। হাসু আপার কোলে না গেলে তার যেন মন ভরতো না। এভাবেই তো তার শৈশবের দিনগুলো কেটে যেতে থাকে। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর বাবা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব যখনই রাতের বেলায় বাসায় ফিরতেন রাসেল ছুটে আসতো বাবার আদর নিতে। শুনেছি রাসেল খুব পছন্দ করতো কোক খেতে। বঙ্গবন্ধু সবাইকে কিছুটা নিষেধও করতেন বেশি মাত্রায় কোক তাকে খেতে দিতে। তারপরও ভাইবোনদের কেউ ঘরে ঢুকলেই কোক পেলে রাসেলের খুশি দেখে কে? সবকিছু মিলিয়ে রাসেল ঘরটাকে মাতিয়ে রাখতো। তার ছিলো গৃহশিক্ষক। বঙ্গবন্ধু মাঝে মধ্যে উঁকি দিয়ে দেখতেন রাসেল পড়াশোনায় কেমন মনোযোগ দিচ্ছে। উপদেশ দিতেন ভালো করে পড়ার, বড় হওয়ার। রাসেল মাথা নেড়ে সায় দিতো। বাবা হাত নেড়ে আদর দিয়ে উপরে চলে যেতেন। পড়া শেষে রাসেল বাবার ঘরে হাজির হতেই এঘর ওঘর করে রাসেল সবার ঘরেই যেন তদারকি করতে যেতো। তাকে আদর না করে ভাইবোনদের যেন উপায় ছিলো না। মা-বাবা, ভাইবোন ছাড়াও ৩২ নম্বরের প্রহরীদের সঙ্গে তার ছিলো দারুণ বন্ধুত্ব। বঙ্গবন্ধুর ব্যক্তিগত সহকারী ছিলেন এএফএম মহিতুল ইসলাম। তার সঙ্গে রাসেলের ঘনিষ্ঠতা ছিলো অবাক করার মতো। কিছু হলেই মহিত ভাইয়ার কাছে ছুটে যেতো রাসেল। রাসেলের যতো অভাব-অভিযোগ মহিতের কাছে অকপটে বলতো।

১৯৭৫ সালে রাসেল ইউনিভার্সিটি ল্যাবরেটরি স্কুলের চতুর্থ শ্রেণির ছাত্র ছিলো। পড়াশোনা ও খেলাধুলা নিয়েই তার শৈশবের দিনগুলো আনন্দময় ছিলো। সবার দৃষ্টিতে আদুরে রাসেল যেন বঙ্গবন্ধু পরিবারের ছোট ফুল হয়ে দ্রুত ফুটে ওঠতে থাকে। কিন্তু কে জানে এই রাসেলও ঘাতকদের হাত থেকে নিষ্কৃতি পাওয়ার তালিকায় ছিলো না। ঘাতকরা যখন বঙ্গবন্ধুর বাসায় প্রবেশ করেছিলো রাসেল ওপর থেকে দৌড়ে মহিতুল ইসলামের কাছে ছুটে এসেছিলো। অবুঝ শিশুটি বুঝতে পেরেছিলো ঘাতকরা বাড়িতে একের পর এক হত্যাকাণ্ড সংঘটিত করছিলো। রাসেল মহিতুল ইসলামকে বলেছিলো ‘আমি মায়ের কাছে যেতে চাই’। ঘাতকদের একজন বলেছিলো, ‘চলো তোমাকে মায়ের কাছে নিয়ে যাই’। ওপরে নিয়ে রাসেলকে গুলি করে হত্যা করা হলো। তার মায়ের সঙ্গে দেখার আশা পূরণ হয়নি। তারা বঙ্গবন্ধু পরিবারের কাউকেই বাঁচতে দিতে চায়নি। ছোট ফুল, রাসেল ফুলও তাদের হাত থেকে বাঁচতে পারেনি। কিন্তু রাসেল বেঁচে আছে বাংলাদেশের আনাচে-কানাচে। রাসেল নামে অসংখ্য শিশুর নাম রাখা হয়েছিলো ১৯৭৫ এর হত্যাকাণ্ডের পর। রাসেলের হত্যাকে কেউ মেনে নিতে পারেনি। তাই ঘরে ঘরে অনেক রাসেল জন্ম নিয়েছে। রাসেলে নামে এখন অনেক প্রতিষ্ঠান হয়েছে। ইতিহাসে রাসেল হয়তো এগারো বছরকে আর কোনোদিন অতিক্রম করতে পারবে না। কিন্তু বাংলাদেশের ইতিহাসে শিশু রাসেল হত্যার বেদনা বেশিরভাগ মানুষকে প্রতিবছর বহন করতে হচ্ছে। কারণ নিষ্পাপ এই রাসেল কারও শত্রু ছিলো না। সে ছিলো বঙ্গবন্ধু পরিবারের সবচেয়ে আদরের ফুটফুটে সম্ভাবনাময় এক শিশু- যার নামের মধ্যেই পিতা বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের এক মহান দার্শনিকের নাম যুক্ত ছিলো। হয়তো এই রাসেলও বেঁচে থাকলে বাংলাদেশের জাতীয় জীবনে আরেক বিস্ময়কর প্রতিভাধর ব্যক্তিত্ব হয়ে ওঠতেন। যিনি দেশ ও বিদেশে বার্ট্রান্ড রাসেলের মতোই অমর হয়ে থাকার ভূমিকা পালন করতেন। কিন্তু ঘাতকরা তাকে বেঁচে থাকার সেই অধিকারটি দিইনি। আজকের এই জন্মদিনে রাসেলকে স্মরণ করি। তার হত্যাকারীদের ঘৃণা করি। রাসেল চিরজীবী হয়ে থাকবে- এটিই আমাদের বিশ্বাস।
পরিচিতি : শিক্ষাবিদ। শ্রুতিলিখন : আমিরুল ইসলাম

সর্বাধিক পঠিত