প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

কবীর চৌধুরী তন্ময়: জিয়াউর রহমান কখনোই বাংলাদেশের স্বাধীন-সার্বভৌমত্বের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ছিলেন না

কবীর চৌধুরী তন্ময়: জিয়াউর রহমানের সময়ে (১৯৭৫-৮১) দেশে ২৬টির মতো সামরিক অভ্যুত্থান ঘটেছিলো বলে বিভিন্ন ভাষ্যে জানা যায়। আবার কেউ কেউ ২১টি বলেও উল্লেখ করেছেন। ২১ বা ২৬টি অভ্যুত্থানের মধ্যে সবচেয়ে বড় ঘটনাটি ঘটেছিল ১৯৭৭ সালের ২ অক্টোবর। এই অভ্যুত্থানটি সম্পর্কে সবচেয়ে বেশি তথ্য পাওয়া গেলেও বাকিগুলো একপ্রকার ধোঁয়াশার রহস্যে ঘেরা। ১৯৭৭ সালের ২ অক্টোবরের অভ্যুত্থানে ঘটনাস্থলেই নিহত হয়েছিলেন শতাধিক সেনা অফিসার। অনেকে নিহত হয়েছিলেন অভ্যুত্থান দমাতে গিয়ে। আবার বিচারের নামে মেরে ফেলা হয় কয়েকশ সেনাকর্মকর্তাকে। সব মিলিয়ে মোট সংখ্যাটি আড়াই হাজারের মতো। তাদের মধ্যে ১৩০০ জনের বেশি সেনাকর্মকর্তাকে ফাঁসি ও ফায়ারিং স্কোয়াডের মাধ্যমে হত্যা করা হয়। বাকিদের মৃত্যুর কোনো দালিলিক প্রমাণ রাখেনি।

১৯৭৭ সালের ২ অক্টোবর থেকে আজও নিহতরা তাদের পরিবারের কাছে নিখোঁজ হিসেবেই আছেন। ১৯৭৭ সালের ২ অক্টোবরের অভ্যুত্থান নিয়ে জায়েদুল আহসান পিন্টু ভাইয়ের লেখা বই ‘রহস্যময় অভ্যুত্থান ও গণফাঁসি’। তিনি ওই ঘটনায় সামরিক আদালতের রায়ে মৃত্যুদ কার্যকর হওয়া ব্যক্তিদের আংশিক তালিকা উদঘাটন করেছিলেন ঢাকা, বগুড়া ও কুমিল্লা কারাগারের নথি ঘেঁটে। ‘রহস্যময় অভ্যুত্থান ও গণফাঁসি বইতে তিনি লিখেছেন, ‘১৯৭৭ সালের ২ অক্টোবর ঢাকায় সামরিক বাহিনীর একটি অংশের অভ্যুত্থানের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে তৎকালীন সেনাশাসক জেনারেল জিয়াউর রহমানের নির্দেশে গঠিত বিশেষ সামরিক ট্রাইব্যুনালের কথিত বিচারে সেনা ও বিমানবাহিনীর যেসব সদস্যকে ফাঁসি দেওয়া হয়েছিলো, তাদের মধ্যে ১৯৩ জনের নাম-পরিচয় পাওয়া যায়। ওই ঘটনায় পূর্বাপর মৃতের সংখ্যা অনেক বেশি হওয়ায় এটা স্পষ্ট যে বিচারের আওতার বাইরেও অনেককে মরতে হয়েছে।

‘অভ্যুত্থান-পরবর্তী দুই মাস ১ হাজার ১শ থেকে ১ হাজার ৪শ সৈনিককে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে কিংবা ফায়ারিং স্কোয়াডে হত্যা করা হয়েছিল। ওই সময় শুধু ঢাকা ও কুমিল্লা কেন্দ্রীয় কারাগারে সৈনিকদের ফাঁসি কার্যকর করা হয়। ঢাকায় ১২১ জন আর কুমিল্লায় ৭২ জনের ফাঁসি হয়। এ ছাড়া ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে পাঁচ শতাধিক সৈনিককে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদ দত করা হয়।’

অক্টোবরের ওই অভ্যুত্থান প্রসঙ্গে প্রখ্যাত সাংবাদিক এন্থনি ম্যাসকারেনহাস ‘আ লিগ্যাসি অব বড’ গ্রন্থে বলেছেন, ‘এ সময় পরবর্তী দুই মাসে বাংলাদেশের সরকারি রেকর্ড অনুযায়ী ১১৪৩ জন সৈনিকের মৃত্যুদ কার্যকর করা হয়েছিলো। বাংলাদেশে সে সময়ে প্রায় সকল কারাগারে গণফাঁসি দেওয়ার ঘটনা ঘটেছিল। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালসহ দেশের প্রায় সকল প্রগতিশীল সংগঠনই তখন এর প্রতিবাদ করেছিল। অভিযোগ উঠেছিলো, প্রহসন ও কোনো আইনকানুনের পরোয়া না করে নামকাওয়াস্তে বিচার ও ফাঁসির ঘটনাগুলো ঘটানো হচ্ছিলো।’

১৯৮৭ সালে বিমানবাহিনী থেকে প্রকাশিত বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর ইতিহাস বইতে এই অভ্যুত্থানের দিনকে ‘কালো দিন’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। বইটিতে এই বিদ্রোহের কারণে সরকার নির্দেশিত বিশেষ সামরিক আদালতে বিচার ও পরে প্রশাসনিক ব্যবস্থায় মোট ৫৬১ জন বিমান সেনা হারানোর ঘটনার কথা উল্লেখ করা হয়। আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্সের বরাত দিয়ে ১৯৭৭ সালে ৩ অক্টোবর নিউ ইয়র্ক টাইমস-এ ‘100 Reported killed in Dacca Coup Attempt’ শিরোনামে অভ্যুত্থান সম্পর্কিত একটি সংবাদ প্রকাশিত হয়।

১৯৭৮ সালের ১০ ফেব্রয়ারি ওয়াশিংটন পোস্টে ‘Bangladesh Executions: A Discrepancy’ শিরোনামে এক প্রতিবেদনে বলা হয়: ‘১৯৭৮ সালের ১৯ জানুয়ারি স্টেট ডিপার্টমেন্টে পাঠানো একটি গোপন তারবার্তায় ঢাকার আমেরিকান দূতাবাসের চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স জানান, তার পাওয়া তথ্য অনুসারে ২১৭ জন মিলিটারি সদস্যকে ক্যু প্রচেষ্টার পরবর্তীকালে হত্যা করা হয়। ‘আমাদের মনে হয় মিলিটারি কোর্ট স্থাপনের আগেই সম্ভবত এদের ৩০-৩৪ জনকে হত্যা করা হয়েছিলো’- বলেন চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স আলফ্রেড ই বার্গেনসেন। জায়েদুল আহসান পিন্টু ভাই তার ‘রহস্যময় অভ্যুত্থান ও গণফাঁসি’ বইতে লিখেছেন, ‘৭৭-এর ২ অক্টোবর অভ্যুত্থান দমনের পর থেকেই সশস্ত্র বাহিনীর সহস্রাধিক সদস্যকে কোনো কিছু না জানিয়ে কর্তব্যরত অবস্থায় আটক করা হয়। তাদের প্রায় সবাইকে পরে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠানো হয়। কারাগারে ঠাঁই না পাওয়াদের রাখা হয় সেনানিবাসের ভেতরে বিভিন্ন নির্যাতন সেলে।

‘তাদের হাত-পা-চোখ বেঁধে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে দিনের পর দিন আটকে রাখা হয়েছিল। জিজ্ঞাসাবাদের নামে চলতো অকথ্য নির্যাতন। সম্পূর্ণ উলঙ্গ করে ছোট একটি কক্ষে ৫০-৬০ জনকে একই সঙ্গে রাখা হতো। অপরদিকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দিদের ৭ অক্টোবর থেকে সামরিক ট্রাইব্যুনালে বিচারকার্য শুরু হয়। বন্দিদের এই বিচার চলে ২৬ অক্টোবর পর্যন্ত। ট্রাইব্যুনালে হাজিরা দেওয়ার জন্য প্রতিদিন কারাগার থেকে বাসভর্তি করে সশস্ত্র প্রহরায় তাদের সেনানিবাসে নিয়ে যাওয়া এবং ফিরিয়ে আনা হতো।

‘সামরিক আদালতের রায় প্রতিদিন রাত ৯টার মধ্যে বন্দি সামরিক ব্যক্তিদের জানানো হতো। যাদের ফাঁসির আদেশ হতো তাদের সঙ্গে সঙ্গে কনডেমড সেলে পাঠানো হতো। রায় জানানোর রাতেই কিংবা পরের রাতে তাদের ফাঁসি কার্যকর করা হতো। ‘৭৭-এর অক্টোবর-নভেম্বর মাসে কারাগারগুলোতে যখন সন্ধ্যা নেমে আসতো, তখন প্রতিটি কক্ষ থেকে ভেসে আসতো গগনবিদারী কান্নার রোল। সামরিক বাহিনীর তত্ত¡াবধানে কারা কর্তৃপক্ষ এতোই তড়িঘড়ি করে ফাঁসি দিচ্ছিল যে, একই নামের একজনকে ফেলে অন্যজনকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে দিচ্ছিলো। পশুপাখির মতো, জোর করে টেনেহিঁচড়ে নিয়ে গলায় রশি বেঁধে ঝুলিয়ে দেয়া হতো। প্রাণ যাওয়ার আগেই হাত-পায়ের রগ কেটে ফেলা হতো। কারাগারের ড্রেনগুলো সৈনিকদের রক্তে ভরপুর হয়ে যেতো।’

এদিকে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আ স ম হান্নান শাহ জিয়াউর রহমান হত্যাকা প্রসঙ্গে বিবিসি বাংলাকে বলেছিলেন, ‘সেনাবাহিনীর একদল অফিসার প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের কর্মকা সন্তুষ্ট ছিলেন না। তারা মনে করছিলেন, যেসব অফিসার এবং সৈনিক মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানে আটকা ছিলেন এবং পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়েছেন, জিয়াউর রহমান তাদের প্রতি বেশি সহানুভ‚তিশীল এবং তাদের বেশি সুযোগ-সুবিধা দিচ্ছেন।’

জিয়াউর রহমান অধ্যায়ের বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত পর্যালোচনা করলে এটাই প্রতীয়মান হয়, জিয়াউর রহমান কখনোই বাংলাদেশ ও বাংলাদেশের স্বাধীন-সার্বভৌমত্বের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ছিলেন না। বরং একাত্তরের পরাজিত শক্তির প্রতি শুধু নৈতিক সমর্থনই নয় বরং তাদের প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী তার শাসনামলকে পরিচালিত করেছে। ফেসবুক থেকে

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ