প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

টেকসই আবাসন ব্যবস্থা গড়ে তোলা বর্তমান সরকারের অঙ্গীকার

রেজাউল করিম সিদ্দিকী: ৪ অক্টোবর বিশ্ব বসতি দিবস। বিশ্বব্যাপী মানুষের নিরাপদ ও বাসযোগ্য আবাসন নিশ্চিত করতে সর্বস্তরে সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে ১৯৮৬ সাল থেকে UN Habitat এর উদ্যোগে বিশ্বব্যাপী প্রতিবছর অক্টোবর মাসের প্রথম সোমবার বিশ্ব বসতি দিবস পালন করা হয়। এ বছর দিবসটির প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে Accelerating Urban Action for a Carbon Free World. বাংলা অর্থ করা হয়েছে কার্বন মুক্ত বিশ্ব গড়তে নগরায়ন কার্যক্রম ত্বরান্বিত করি। বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ একটি দেশ।

১ লক্ষ ৪৪ হাজার বর্গ কিলোমিটার ক্ষুদ্র আয়তনের এই দেশে প্রায় ১৮ কোটি লোকের বাস। এই বিশাল জনগোষ্ঠীর খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থানের মত মৌলিক চাহিদাসমূহ পূরণ করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। উপরন্তু ক্রমবর্ধিষ্ণু অর্থনীতি, দ্রুত নগরায়ণ ও শিল্পায়নের ফলে পরিবেশ দূষণ এবং ব্যবহারযোগ্য জমির পরিমাণ দ্রুত কমে আসা এ চ্যালেঞ্জকে বাড়িয়ে দিয়েছে বহুগুণে। তথাপি সরকার এবং দেশের আপামর জনসাধারণ এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় সর্বদা সচেষ্ট ও তৎপর রয়েছে। দেশের সকল নাগরিকের জন্য টেকসই ও মানসম্মত আবাসন নিশ্চিত এবং পরিকল্পিত নগরায়ণ ও উন্নয়নে নিরলস কাজ করে যাচ্ছে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়।

সুশাসন নিশ্চিত করতে সরকারি কর্মচারীদের উন্নত কর্মপরিবেশ ও নিরাপদ আবাসন নিশ্চিত করা অপরিহার্য। জাতিসংঘ প্রণীত টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (Sustainable Development Goal) [SDG] এর টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা ১১ অনুয়ায়ী ২০৩০ সালের মধ্যে অন্তর্ভুক্তিমূলক, নিরাপদ, অভিঘাতসহনশীল এবং টেকসই নগর ও জনবসতি গড়ে তোলার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। উক্ত লক্ষ্যমাত্রাকে সামনে রেখে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় সরকারি, বেসরকারি, ছিন্নমূল সকল নাগরিকের জন্য আবাসনের সু-ব্যবস্থা করার নিমিত্ত অধীনস্থ সংস্থাগুলোর মাধ্যমে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প ও কার্যক্রম গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করছে।

সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী বিশেষ করে রাজধানী ঢাকায় কর্মরতদের আবাসন সংকট দীর্ঘদিনের। বিষয়টির গুরুত্ব অনুধাবন করে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা ইতিপূর্বে সরকারি আবাসন ৮% হতে ৪০% এ উন্নীত করার জন্য অনুশাসন দেন। উক্ত অনুশাসনের প্রেক্ষিতে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় ও এর অধীন বিভিন্ন দপ্তর/সংস্থা বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে বহুতল ভবন নির্মাণের উদ্যোগ গ্রহণ করে যাতে একই সাথে বিপুলসংখ্যক মানুষের আবাসনের ব্যবস্থার পাশাপাশি ভূমির সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করা যায়।

প্রকল্পগুলির মধ্যে আজিমপুর, মতিঝিল ও মালিবাগ সরকারি কলোনিতে বহুতল ভবন নির্মাণ, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে কর্মরত কর্মকর্তা/কর্মচারীদের জন্য তেজগাঁওয়ে আবাসিক ভবন নির্মাণ এবং গণপূর্ত অধিদপ্তরের কর্মকর্তা কর্মচারীদের জন্য মিরপুরে আবাসিক ভবন নির্মাণ প্রকল্প অন্যতম। এছড়া এ সময় জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ কর্তৃক নির্মিত বস্তিবাসীদের জন্য ভাড়াভিত্তিক ৩০০টি ফ্ল্যাটের বরাদ্দ প্রাপকদের নিকট বরাদ্দপত্র হস্তান্তর করা হয়।

জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ নিজস্ব অর্থায়নে ১৪৮ কোটি ৭৭ লাখ ৮৫ হাজার টাকা ব্যয়ে ঢাকার মিরপুর ১১ নম্বর সেকশনে ১৪ তলা বিশিষ্ট পাঁচটি ভবনে মোট ৫৩৩টি ফ্ল্যাট নির্মাণের লক্ষ্যে ২০১৮ সালের ১৬ জানুয়ারি একটি প্রকল্প হাতে নেয়। ২ একর জমির উপর নির্মিত এসব অত্যাধুনিক ভবনে মাসিক, সাপ্তাহিক এমনকি দৈনিক ভিত্তিতে ভাড়া পরিশোধের মাধ্যমে বস্তিবাসীরা বসবাসের সুযোগ পাবে।

ইতোমধ্যে ৩০০টি ফ্ল্যাট বসবাসের উপযোগী করে গড়ে তোলা হয়েছে এবং সম্প্রতি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ভার্চুয়াল উপস্থিতিতে বরাদ্দ প্রাপকদের নিকট এসব ফ্ল্যাটের বরাদ্দপত্র হস্তান্তর করা হয়। জুন ২০২১ সালে গণপূর্ত অধিদপ্তর কর্তৃক নির্মিত ঢাকার মিরপুর, আজিমপুর, মতিঝিল ও মালিবাগে সরকারি কর্মকর্তা/কর্মচারীদের বসবাসের জন্য নির্মিত ২৪৭৪টি অত্যাধুনিক সুযোগ-সুবিধা সংবলিত ফ্ল্যাট উদ্বোধন করা হয় যার মধ্যে ২৮৮টি ফ্ল্যাট গণপূর্ত অধিদপ্তরের কর্মকর্তা /কর্মচারীদের এবং ৫৮টি ফ্ল্যাট মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে কর্মরত কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের বসবাসের জন্য নির্ধারিত রয়েছে।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে ও দিকনির্দেশনায় নির্মিত এসব ভবনে ব্যবহার করা হয়েছে অত্যাধুনিক নির্মাণসামগ্রী। জানালায় তাপ প্রতিরোধী থাই গ্লাস, উন্নত ফিটিংস ও টাইলসকৃত ফ্লোরসহ আধুনিক নির্মাণ প্রযুক্তির যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করা হয়েছে এসব ভবনে। রয়েছে নিজস্ব অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা, জরুরি ফায়ার এক্সিট ও সুপরিসর বারান্দা ও কমন স্পেস। প্রকল্পসমুহে নিজস্ব বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য স্থাপন করা হয়েছে সুয়ারেজ ট্রিটমেন্ট প্লান্ট বা এসটিপি। রয়েছে রেইন ওয়াটার হারভেস্টিং সিস্টেম ও প্রয়োজনীয় সংখ্যক কার পার্কিং এর ব্যবস্থা। পরিবেশ সুরক্ষা ও মনোরম পরিবেশ নিশ্চিত করতে এসব প্রকল্প এলাকায় বৃক্ষরোপণ ও জলাধার নির্মাণ করা হয়েছে। গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের অধীন গণপূর্ত অধিদপ্তর বর্তমানে ৩৫ টি মন্ত্রণালয়ের মোট ৩০৩টি প্রকল্পের কাজ বাস্তবায়ন করছে।

এছাড়াও চলমান করোনা সংকট মোকাবেলায় করোনা আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসায় আইসিইউ এর ভৌত অবকাঠোমো নির্মাণ, ডাক্তার-নার্সদের অস্থায়ী আবাসন ব্যবস্থা, হাসপাতালসমূহে PCR Laboratory এর অবকাঠামো নির্মাণ, আইসোলেশন ইউনিট, কোয়ারেন্টাইন সেন্টার, করোনা ইউনিট স্থাপন, স্থাপনাসমূহের নিরবচ্ছিন্ন পানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করণসহ জীবাণুনাশক ছিটানো ইত্যাদি নানাবিধ কাজ গণপূর্ত অধিদপ্তর স্বল্পসময়ে বাস্তবায়ন করেছে। রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ কর্তৃক বাস্তবায়নাধীন পূর্বাচল নতুন শহর (ইউসুফগঞ্জ) প্রকল্প এলাকায় ইতোমধ্যে বিভিন্ন আকারের ২৪৮৫৯টি আবাসিক প্লট বরাদ্দ প্রদান করা হয়েছে।

পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্প এলাকায় (১৫নং সেক্টরে) ইউনেস্কো কর্তৃক স্বীকৃত, বাংলাদেশের স্বাধীনতার ভিত্তি, বঙ্গবন্ধুর ০৭ মার্চের ভাষণে তার উত্থিত তর্জণীর প্রায় ১৫০ ফুট উচ্চতা বিশিষ্ট প্রতিকৃতি স্থাপনের মাধ্যমে উক্ত এলাকাটি ঐতিহাসিক দর্শণীয় স্থান হিসেবে সর্বসাধারণের নিকট তুলে ধরার নিমিত্ত “বঙ্গবন্ধু স্কয়ার নির্মাণ” শীর্ষক প্রকল্পটি বাস্তবায়নের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পটি Asian Townscape Award, ২০১৯ এ ভূষিত হয়েছে। পূর্বাচল নতুন শহর (ইউসুফগঞ্জ) প্রকল্প এলাকায় পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশীপের মাধ্যমে পানি সরবরাহের জন্য সম্প্রতি একটি বেসরকারি সংস্থার সাথে রাজউক চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। প্রকল্প এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহের কাজ সম্পন্ন হয়েছে এবং পানি সরবরাহের কাজ খুব শীঘ্রই শুরু হবে। ফলে দেশের প্রথম স্যাটেলাইট সিটি পূর্বাচল নতুন শহর মানুষের বসবাসের জন্য পূর্ণরুপে প্রস্তুত হবে।
জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ কর্তৃক ৩৪টি আবাসন প্রকল্প চলমান রয়েছে। যার মধ্যে ৩২টি নিজস্ব

অর্থায়নে এবং ২টি জিওবিপ্রকল্প সাহায্যে। ঢাকা মহানগরীর বস্তিতে বসবাসকারী ভাসমান ও ছিন্নমূল মানুষের জন্য নিজস্ব অর্থায়নে “মিরপুরস্থ সেকশন-১১ এ বস্তিবাসীদের জন্য ভাড়াভিত্তিক ৫৩৩ (পাঁচশত তেত্রিশ)টি আবাসিক ফ্ল্যাট নির্মাণ” শীর্ষক প্রকল্প এবং বিশ্ব ব্যাংক ও জিওবি অর্থায়নে “স্বল্প আয়ের মানুষের উন্নত জীবন ব্যবস্থা” শীর্ষক প্রকল্প উল্লেখযোগ্য। গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের পরিচালন ও উন্নয়ন খাতে এবছর যথাক্রমে ১ হাজার ৮০৩ এবং ৪ হাজার ৫৪৩ কোটি টাকা বরাদ্দ প্রদান করা হয়েছে। গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় কর্তৃক বাস্তবায়নাধীন মোট ১০৫টি প্রকল্প বর্তমানে চলমান রয়েছে, যার মধ্যে জিওবি/বৈদেশিক অর্থায়নে ৫৯টি এবং সংস্থার নিজস্ব অর্থায়নে ৪৬টি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। আধুনিক ও টেকসই ভবন নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণে গণপূর্ত অধিদপ্তর অবিরত কাজ করে যাচ্ছে । বাংলাদেশ সচিবালয়সহ সকল সরকারি সংস্থার অফিস, কোয়ার্টার, বাসভবন, প্রত্যেক জেলায় সার্কিট হাউসসহ কোর অফিসসমূহ নির্মাণ করছে গণপূর্ত অধিদপ্তর।

অন্যদিকে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের সকল জেলা ও উপজেলা শহরের পরিকল্পিত নগরায়ণ ও উন্নয়নের জন্য প্রতিটি শহরের মাষ্টার প্ল্যান প্রণয়নের জন্য কাজ করছে নগর উন্নয়ন অধিদপ্তর। এছাড়া রাজধানীর নাম কর্তৃপক্ষ চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ এবং কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষসহ গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের অধীন বিভিন্ন দপ্তর সংস্থা দেশের পরিকল্পিত উন্নয়নসহ নাগরিকদের জন্য আবাসন নিশ্চিতে কাজ করে যাচ্ছে। ইতোমধ্যে ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড ২০২০ অনুমোদন হয়েছে। রাজধানী ঢাকার জন্য ডিটেইল এরিয়া প্লান বা ড্যাপ চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে।

ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার চাপ সামলাতে রাজধানী ঢাকার বিকল্প হিসেবে দেশের প্রথম স্যাটেলাইট টাউন পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ। এসব পরিকল্পনা ও প্রকল্প বাস্তবায়ন সম্ভব হলে দেশের ভূমির সুষ্ঠু ব্যবহার নিশ্চিতের পাশাপাশি প্রত্যেক নাগরিকের জন্য টেকসই নিরাপদ ও বাসযোগ্য আবাসন নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। একই সাথে পরিকল্পিত নগরায়ণ এর ফলে পরিবেশ দূষণ এবং পরিবেশে কার্বন নিঃসরণ বহুলাংশে হ্রাস পাবে। ফলে প্রাকৃতিক দুর্যোগের পরিমাণ ও তীব্রতা যে হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে তা অনেকাংশে সমাধান করা সম্ভব হবে তাতে কোন সন্দেহ নেই।

সর্বাধিক পঠিত