প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

সাদিয়া নাসরিন :মাতৃত্ব সবসময়ই যুগপৎ কঠিন ও আনন্দময় ভ্রমণ

সাদিয়া নাসরিন : মাতৃত্ব আমার জন্য সবসময়ই যুগপৎ কঠিন ও আনন্দময় ভ্রমণ। তিন সন্তান। পিঠাপিঠি এক মেয়ে আর ছেলে, তাদের আবেগ আলাদা, বুঝ আলাদা। আবার পাঁচবছরের ছোট্ট আরেকটা ছেলে। সবার ম্যানেজমেন্ট আলাদা। এবং আমিই তাদের মা, আমিই তাদের বাবা। ভীষণ কঠিন এই যুদ্ধ। আবার ততোটাই রোমাঞ্চকর গতিশীল এই যাত্রা। যতো কঠিনই হোক সব যুদ্ধ একসময় শেষের দিকে যায়, সময় শেষ হয়। তারাও এগিয়েছে, আমিও এগিয়েছি। তারাও বড় হয়েছে, আমিও বড় হয়েছি। তারাও শিখেছে, আমিও শিখেছি। বুঝেছি, সন্তান মেরে ধরে মানুষ করা যায় না। তারা সবই বোঝে, বোঝানোর ভাষা ঠিক থাকলে।

সন্তানকে ‘আমি তোমার মা, তোমার সবচে ভালো বন্ধু’ এসব মুখস্থ কথা বলারও দরকার হয় না। শুধু দরকার হয়, সন্তানের সঙ্গে সিনায় সিনায় যোগাযোগ তৈরি করা, তাদের ভাষা বোঝা। দরকার হয় সন্তানকে সম্মান করা, স্পেস দেওয়া। সন্তানকে অনুভব করাতে হয় যে, ‘মা পাশে আছে, যাই ঘটুক না কেন, মা আছে। আমি কোনো ভুল করলেও, সবাই আমাকে প্রশ্নবিদ্ধ করলেও, সবাই ছেড়ে গেলেও মা কখনো আমার হাত ছাড়বে না’। এসব যে একদিনে শিখেছি তা না, বহু ভুল করে, পোড় খেয়ে শিখেছি। এসব শিখন পোড়নের মাঝেই মেয়েটা ইলেভেন গ্রেডে ওঠে গেলো। সে এখন কলেজ স্টুডেন্ট। স্কুলের কঠিন নিয়ম কানুন তার জন্য শিথিল এখন থেকে। বন্ধু নির্বাচনে স্বাধীন। কো-এডুকেশনে পড়েছে বলেই ছেলে মেয়ের বন্ধুত্ব নিয়ে ছ্যুৎমার্গের অপশনই নেই। ‘বন্ধুত্ব¡’ এবং ‘প্রেম’ এই দুইএর ফাইনলাইনটা শিখিয়েছি ছোটবেলা থেকে।

আমি জানি, সে এই লাইন যত্ন করেই মনে রেখেছে। এদিকে বড় ছেলে পনের বছরের। সেও সেকেন্ডারির মাঝামাঝি। এমনিতেই মেয়ের চাইতে ছেলে নিয়ে উৎকণ্ঠা আমার বরাবরই বেশি। কারণ, মেয়ে নিয়ে আমাদের যতো ভয়, উৎকণ্ঠা তার সবটার কারণই ছেলেরা। তাই ছেলের মা- কে পুষতে হয় বেশি উৎকণ্ঠায়। মেয়ের মা হয়ে দু’চোখ খোলা রাখলে তাই ছেলের মা হয়ে খোলা রেখেছি চার চোখ। আমি জানি, ছেলের মা’ বলেই আমাকে নির্মাণ করতে হবে আগামীর জন্য একজন নিরাপদ পুরুষ, সভ্য নাগরিক, দায়িত্ববান পুত্র এবং নিষ্ঠাবান প্রেমিক ও সঙ্গী। আমার দুই ছেলে তাই আমার চোখের উপরে থাকে। তারা আমার সঙ্গেই ঘুমায়, ল্যাপটায়। তাদের কম্পিউটার, মোবাইল, বন্ধু, সঙ্গ সব আমার জানা। না, গুপ্তচরবৃত্তি করে জানতে হয়নি। আমাদের সিস্টেমটাই এরকম। সবাই সবার সবটা জানে।
এখানে, এই বাসায় লুকোচুরি কিছু নেই, ভুলের জন্য কঠিন শাস্তির বিধানও নেই। এখানে কেউ কিছু ভুল করলে সেটা নিয়ে কথা হয়, শুধরে নেওয়া বা দেওয়া হয়।

বাচ্চারা যেমন আমার ভুল ধরে দিতে নির্ভয়, আমিও তাদের শুধরে দিতে নি:সঙ্কোচ। এই একটা যায়গায় আমি নিষ্ঠা ও সততার সঙ্গে কাজ করি। বাচ্চাদের অকারণ প্যাম্পার করা, লুতুপুতু করা এসব কখনও করিনি। বাচ্চা হোঁচট খেয়ে পড়ে গেলে আমি কোনোদিনই ছুটে গিয়ে উঠাইনি। তারা নিজেরা উঠে, কেঁদে, ধুলা ঝেড়ে ঠিক হয়। ছোটবেলা থেকেই যার যার কাজ সে সে করে, যে যার মতো রোজগারও করে।

টাকা যে মূল্যবান, কষ্ট করে পেতে হয় সেই শিক্ষা তারা শিশুকাল থেকেই পেয়েছে। কোনো বাচ্চার জন্য কোনোদিন আলাদা রান্না করিনি। যা রান্না করি সবাই তাই খায়। বাচ্চার স্কুলে গিয়েছি তেরো বছরে মনে হয় পাঁচবার। আমীম যামীম কে কোনো গ্রেডে পড়ে সেটা তাদের কাছ থেকে জিজ্ঞেস করতে হয় প্রায়ই। যামীম খুবই বিরক্ত এটা নিয়ে। বাচ্চা পালার ক্ষেত্রে আমি দাদার তরিকা পুরোপুরি মেনে চলি।দাদা বলতো আম্মাক, ‘ওবা, ফুয়াইনদরে এতো ধ নগইজ্জ। ফুয়াইন ফালেদে ফুঁয়াইত্যা উড়ি, স্কুলত বই থাকিয়েরে নয় (বাচ্চাদের এতো প্যাম্পার কইরোনা। বাচ্চা পালতে হয় মাঝরাতে উঠে, স্কুলে বসে থেকে না)। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজে দাদার যে মোনাজাত এখনও আমার কানে বাজে তা হলো,‘ইয়াআল্লাহ আঁর আহলিয়াতরে তোঁয়ারে হাওলা গইল্যাম, তুই গছি ল ‘ইয়া আল্লাহ আমি আমার বংশধরদের তোমার উপর হাওলা করলাম, তুমি রক্ষা করো’। দাদার এই প্রার্থনা আমি সবসময় মনে রাখি। সন্তান যিনি দিয়েছেন, তাদের যোগ্যতা, সম্মান, সুস্থতা, সুরক্ষার মালিকও তিনিই। সেই মহাপ্রভুর কাছে তাদের সমর্পন করে আমি রাজ্যের কাজে ব্যস্ত হয়ে থাকি। আমার অবশ্য এ ভিন্ন আর উপায়ও নেই।

বাচ্চাদের পেছনে আঁঠার মতো লেগে থাকার সময় যে আমার নেই! শুধু আমার সকল কাজের মাঝে, বিশ্রামে, রাতের নির্জনে আমার সন্তানদের জন্য প্রার্থনা জারি রাখি দাদার মতো করে, আব্বার মতো করে। গভীর নির্জনে মহাপ্রভুর কাছে নিজেকে সমর্পন করে বলি, ‘প্রভু, আমার সন্তান তো আমার নয়। আমার মাধ্যমে তারা এসেছে। আমি তোমার সৃষ্টির নিমিত্ত মাত্র। আমার কী সাধ্য তোমার সৃষ্টির দায়িত্ব নেওয়ার। আমি অক্ষম, তুমি আমাকে সাহায্য করো। ইহলোক-পরলোকের সর্বোচ্চ কল্যাণ তুমি তাদের দান করো। তোমার সৃষ্টির সুরক্ষা তুমি দাও প্রভু’। ফেসবুক থেকে

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত