শিরোনাম

প্রকাশিত : ০৫ আগস্ট, ২০২১, ০৯:০০ সকাল
আপডেট : ০৫ আগস্ট, ২০২১, ০৯:০০ সকাল

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

মশা নিধনে চসিকের ক্র্যাশ প্রোগ্রাম শুরু, “হারবাল নমুনাটি শতভাগ কার্যকর: গবেষণা

রাজু চৌধুরী: [২] চট্টগ্রাম নগরীতে বাড়তে শুরু করেছে ডেঙ্গুর প্রকোপ। আর ডেঙ্গু, চিকনগুনিয়া মোকাবেলায় এবার নিধন কার্যক্রম শুরু করেছে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন (চসিক)।

[৩] বুধবার (৪ আগস্ট) থেকে শুরু হয়ে ত্রিশ দিন সারা নগরজুড়ে এ বিশেষ ‘ক্রাশ প্রোগ্রাম’ চলবে। চট্টগ্রাম নগরীর বিপ্লব উদ্যান এলাকায় এই মশক নিধন কার্যক্রম উদ্বোধন করেন চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়র রেজাউল করিম চৌধুরী।

[৪] চসিক সূত্রে জানা যায়, মোট তিন ধাপে চালানো হবে এ কার্যক্রম। প্রতিদিন ৪টি করে মোট ৪১টি ওয়ার্ডে ১০ দিন মশার ওষুধ ছিটানোর পর পুনরায় কার্যক্রম চালানো হবে। নগরীর প্রতিটি ওয়ার্ডে একমাসে তিনবার ওষুধ ছিটানোর পাশাপাশি চলবে নিয়মিত কার্যক্রমও।

[৫] চসিকের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিষয়ক স্থায়ী কমিটির সভাপতি ও ৭ নম্বর পশ্চিম ষোলশহর ওয়ার্ড কাউন্সিলর মোবারক আলী বলেন, প্রতিটি ওয়ার্ডে ২৫ জন স্প্রে-ম্যান ওষুধ ছিটাবেন। ধাপে ধাপে এ ক্রাশ প্রোগ্রামকে ভাগ করা হয়েছে। একটি ওয়ার্ডে আমরা তিনবার করে ওষুধ ছিটাবো যেন কোন লার্ভা জন্মাতে না পারে। ৩০ দিনকে তিন ভাগ করে ১০ দিনে একবার করে প্রতি ওয়ার্ডে এ কার্যক্রম চলবে। সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য ১ হাজার ৫০০ স্বেচ্ছাসেবক কাজ করবে নিয়মিতভাবে।

[৬] সিটি মেয়র রেজাউল করিম বলেন, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা বলেছেন, মশক নিধনে কোন ওষুধ কার্যকরী, কোনো ওষুধ কার্যকরী নয় তার গবেষণা করে দেখিয়েছেন। লার্বিসাইড ও অ্যাডাল্টিসাইড কীভাবে ব্যবহার করতে হবে তা পরামর্শ দিয়েছেন।
পরীক্ষার জন্য সিটি কর্পোরেশন ৪টি এডাল্টিসাইড ও একটি লার্ভিসাইডের নমুনা দেয় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের টেকনিকেল কমিটিকে। যার মধ্যে একটি এডাল্টিসাইড-লাইট ডিজেল অয়েল (এলডিও) যা কালো তেল নামে পরিচিত এবং লার্ভিসাইডটি বর্তমানে সিটি কর্পোরেশন মশা নিধনে ব্যবহার করে। অন্য তিনটি এডাল্টিসাইড পরীক্ষামূলক নমুনা হিসেবে টেকনিক্যাল কমিটিকে দেয় সিসিসি। যার মধ্যে একটি ভেষজ কীটনাশক, যেটি এডাল্টিসাইড ও লার্ভিসাইড উভয় হিসেবে ব্যবহার করা যায়। বাকি ‍দুটি রাসায়নিক কীটনাশক।

[৭] টেকনিক্যাল কমিটি নগরীর ৯৯টি স্থান পরিদর্শন করে ৫১টি এবং ক্যাম্পাস ও আশেপাশের ছয়টি স্থান থেকে মশার লার্ভা সংগ্রহ করে।
এডিস ও এনোফিলিস এই দুই প্রজাতির মশার লার্ভা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষাগারে লালন করে পূর্ণবয়স্ক করা হয়। এরপর সরবরাহ করা কীটনাশনের নমুনা এসব লার্ভা ও মশার উপর প্রয়োগ করে কার্যকারিতা যাচাই করা হয়।

[৮] চসিক বর্তমানে যে লার্ভিসাইডটি ব্যবহার করে (স্প্রে), সেটি পরীক্ষা করে (একই মাত্রায়) দেখা গেছে, দুই ঘণ্টা পর লার্ভা মৃত্যুর হার মাত্র ১৬ শতাংশ। তবে মিশ্রণে ১০ ‍গুণ বেশি মাত্রায় প্রয়োগ করে ৮৪ শতাংশ পর্যন্ত লার্ভা মৃত্যুর হার পাওয়া যায়। নতুন ভেষজ নমুনাটি পরীক্ষামূলক ব্যবহার করে দুই ঘণ্টায় শতভাগ লার্ভা মৃত্যুর প্রমাণ পাওয়া গেছে।

[৯] চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োকেমিস্ট্রি অ্যান্ড মলিকুলার বায়োলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও টেকনিক্যাল কমিটির আহ্বায়ক ড. রবিউল হাসান ভুঁইয়া বলেন, “হারবাল নমুনাটি শতভাগ কার্যকর। এটি বিভিন্ন উদ্ভিদের নির্যাস দিয়ে তৈরি। রাসায়নিক কীটনাশকগুলোর কার্যকারিতা তুলনামূলক কম বলে জানিয়ে বলেন, রাসায়নিকের মাত্রা বাড়িয়ে কার্যকারিতা বাড়লেও তাতে অন্য ছোট কীটপতঙ্গ-প্রাণির জীবননাশ এবং পরিবেশ ও মানুষের ক্ষতি হওয়ার খুব বেশি সম্ভাবনা থাকে।”

[১০] একইভাবে এডাল্টিসাইডের ক্ষেত্রে (স্প্রে) বর্তমানে ব্যবহৃত ওষুধের কার্যকারিতা পরীক্ষা করে (২ ঘণ্টা সময় সীমায়) প্রাপ্তবয়স্ক মশা মৃত্যুর হার ৩৪ শতাংশ পাওয়া গেছে। মাত্রা ১০ গুণ বাড়ালে তা সর্বোচ্চ ৭৬ শতাংশ পর্যন্ত হয়। অন্যদিকে, সরবরাহ করা ভেষজ নমুনাটিতে শতভাগ সাফল্য মিলেছে। অন্য দুটি এডাল্টিসাইডের কার্যকারিতা ৮ শতাংশ। মাত্রা বাড়িয়েও মশার মৃত্যুহারে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়নি গবেষণায়।

[১১] লার্ভা নিধনে শুধু কেরোসিন স্প্রে করলে তা ৮৪ শতাংশ কার্যকরী বলে গবেষণায় জানা গেছে। তবে এর কার্যকারিতা শুরু হয় ছিটানোর দুই ঘণ্টা পর থেকে। আর ফগার মেশিনের মাধ্যমে ভেষজ ও রাসায়নিক দুই ধরণের এডাল্টিসাইড ছিটিয়েই কার্যকারিতা মিলেছে সর্বোচ্চ ১৯ শতাংশ। এমনকি মাত্রা বাড়িয়েও খুব বেশি সুফল মেলেনি। তাই প্রতিবেদনে ফগার মেশিনের চেয়ে স্প্রে পদ্ধতিতে ওষুধ ছিটানো বেশি কার্যকর হবে বলে উল্লেখ করা হয়।

[১২] গবেষণালব্ধ প্রতিবেদনকে ‘অত্যন্ত ফলপ্রসূ’ উল্লেখ করে মেয়র রেজাউল বলেন, “এ ধরণের বিশেষজ্ঞ প্রতিবেদন চসিক এই প্রথম বারের মতো পেয়েছে। “লার্ভা খায় এমন মাছের চাষ, অণুজীব ব্যবহার ও উদ্ভিদের নির্যাস দিয়ে লার্ভা ধ্বংসের সুপারিশ করা হয়েছে প্রতিবেদনে।

[১৩] ড. ওমর ফারুক বলেন, “লেবু, পুদিনা, তুলসি, নিম ও তেজপাতার ঘ্রাণ মশা সহ্য করতে পারে না। তাই আইল্যান্ডসহ বিভিন্ন স্থানে এসব গাছ লাগাতে বলেছি। উদ্ভিদের নির্যাস থেকে কীটনাশক তৈরিতে গবেষণা সহায়তা পেলে কাজ করা সম্ভব বলে মেয়রকে জানিয়েছি।”

[১৪] টেকনিক্যাল কমিটির সদস্য বিশ্ববিদ্যালয়ের মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ড. এইচ এম আবদুল্লাহ আল মাসুদ বলেন, “দীর্ঘদিন রাসায়নিক কীটনাশক ব্যবহারে মশা রেজিস্ট্যান্ট কিনা তা যাচাইয়ে মশার জিনগত পরীক্ষার সুপারিশ করেছি।

[১৫] টেকনিক্যাল কমিটিতে আরও ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক ড. তাপসী ঘোষ রায়, ভূগোল ও পরিবেশ বিদ্যা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. শহীদুল ইসলাম ও প্রাণিবিদ্যা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মোহাম্মদ আবদুল ওয়াহেদ চৌধুরী। তাদের সহযোগিতা করেন মওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োকেমেস্ট্রি এন্ড মলিকুলার বায়োলজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ড. আশেকুল ইসলাম।

[১৬] চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) মেয়র মো. রেজাউল করিম চৌধুরীর অনুরোধে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় এই গবেষণা করে। মঙ্গলবার (৩ আগস্ট) চবি উপাচার্য ড. শিরীন আখতারের উপস্থিতিতে মেয়রের কাছে গবেষণা কমিটির প্রতিবেদন হস্তান্তর করা হয়েছে। সম্পাদনা: হ্যাপি

  • সর্বশেষ