প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

মশক নিয়ন্ত্রণ: বছরে বিপুল অর্থ খরচ করেও অনিয়ন্ত্রিত মশা

//গত অর্থবছরে দুই সিটির ব্যয় ৯৫ কোটি ২৫ লাখ টাকা * চলতি অর্থবছরে বরাদ্দ ১১০ কোটি টাকা//

নিউজ ডেস্ক: বিগত অর্থবছরে রাজধানীর মশা নিয়ন্ত্রণে ব্যয় করা হয়েছে ৯৫ কোটি ২৫ লাখ টাকা। এরপরও মশার উপদ্রবে অতিষ্ঠ ছিল নগরবাসী। কিউলেক্স মশার মৌসুমে ভয়াবহ উপদ্রবে নাকাল হয়েছে মানুষ। এখন ডেঙ্গির মৌসুমে ভয়ঙ্কর রূপ নিয়েছে এডিস মশাও।

করোনা মহামারির মধ্যে ডেঙ্গি আক্রান্ত বৃদ্ধিতে আতঙ্কিত হয়ে পড়ছে মানুষ। বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করেছেন, আগামী আগস্ট ও সেপ্টেম্বরে ডেঙ্গি আক্রান্তের সংখ্যা কয়েকগুণ বেড়ে যাওয়ার।

এ অবস্থায় ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন নতুন অর্থবছরে রাজধানীর মশক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমের জন্য ১১০ কোটি টাকার বাজেট বরাদ্দ করেছে। পর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দ থাকলেও মশক নিয়ন্ত্রণে আশানুরূপ কার্যক্রম লক্ষ করা যাচ্ছে না বলে অভিমত নগরবাসীর।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ২৫ জুলাই পর্যন্ত সারা দেশে ডেঙ্গি আক্রান্ত হয়েছেন ১ হাজার ৬৭৯ জন। এর মধ্যে শুধু জুলাই মাসের ২৫ দিনেই আক্রান্ত হয়েছেন ১ হাজার ৩০৭ জন। বর্তমানে হাসপাতালে ভর্তি রয়েছে ৪৬০ জন। এর মধ্যে ঢাকায় ৪৫৪ জন এবং ঢাকার বাইরে ৬ জন।

শেষ দুদিন ১০০ জনের বেশি করে মানুষ ডেঙ্গিতে আক্রান্ত হয়েছেন। রোববার মোট আক্রান্ত ১০৫ জন। এর মধ্যে ১০২ জন ঢাকায় এবং অন্য ৩ জন ঢাকার বাইরে। এখন পর্যন্ত কেউ মারা যায়নি। ৩টি সন্দেহজনক মৃত্যুর ঘটনা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে পাঠানো হলেও চূড়ান্ত পরীক্ষায় সেটা ডেঙ্গিজনিত মৃত্যু বলে প্রমাণিত হয়নি। যুগান্তর

এ প্রসঙ্গে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও কীটতত্ত্ববিদ ড. কবিরুল বাশার জানান, গত জুন মাসে সার্ভে করে আমরা এবার ডেঙ্গিবাহিত এডিস মশার প্রজনন বেশি বলে শঙ্কা প্রকাশ করেছিলাম। এখন সেটাই সত্যি হলো। ঢাকার দুই সিটির সঙ্গে নগরবাসী ডেঙ্গি নিয়ন্ত্রণে মাঠে না নামলে আগস্ট ও সেপ্টেম্বরে আরও খারাপ পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে।

ড. বাশার আরও বলেন, ডেঙ্গির এখন এমন সময় যে, কাউকে দোষারোপ করে সময় নষ্ট করা উচিত হবে না। এখন প্রয়োজন দুই সিটির একসঙ্গে এডিস মশা নিয়ন্ত্রণে মাঠে নামা। কাউন্সিলরদের নেতৃত্বে প্রতিটি ওয়ার্ডকে ১০টি ব্লকে ভাগ করে পরিচ্ছন্নতা ও মশক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম পরিচালনা করা।

এ বিষয়ে কীটতত্ত্ববিদ ড. মঞ্জুর আহমেদ চৌধুরী জানান, বর্তমানে কোন কোন এলাকায় ডেঙ্গি আক্রান্ত হচ্ছে, সেসব এলাকা চিহ্নিত করে বিশেষ পরিচ্ছন্নতা ও মশক নিধন কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে। ঢাকার দুই সিটির এ ধরনের কার্যক্রম এখনো আমার দৃষ্টিগোচর হয়নি। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কাছ থেকে আক্রান্ত এলাকার নাম নিয়ে এলাকাভিত্তিক কার্যক্রম জোরদার করতে হবে।

ড. মঞ্জুর আরও জানান, দুই সিটি করপোরেশন বর্তমানে যেসব ওষুধ ব্যবহার করছে, সেগুলো কার্যকর না হওয়ার কথা নয়। সময় ও পরিবেশ বুঝে ওষুধ প্রয়োগ করতে হবে। এডিস মশার বেশি প্রজনন এলাকার মানুষকে সচেতন করতে হবে। তারা নিজেরাও যেন ব্যক্তিগত উদ্যোগে অ্যারোসল কিনে এবং বাসার আশপাশের এলাকা পরিষ্কার ও পরিচ্ছন্ন রাখার মাধ্যমে এডিস মশা নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখতে পারে।

এক প্রশ্নের জবাবে এই কীটতত্ত্ববিদ জানান, কৃষির ওষুধ আমদানিতে ১০ ভাগ কর হলেও মশার ওষুধের আমদানি কর ৮৯ ভাগ। ১০০ টাকার ওষুধ আনতে খরচ পড়ে ১৮৯ টাকা। এটা মূলত কয়েল কোম্পানিগুলোর কারসাজি। দেশে প্রায় ৪০০টি কয়েল কোম্পানি রয়েছে। এদের একটি সমিতিও রয়েছে। দেশে কয়েলের প্রায় ১ হাজার কোটি টাকার বাজার। এসব কোম্পানি মশক নিধন হোক সেটা চায় না। এজন্য তারা সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থার ওপর প্রভাব বিস্তার করে মশার ওষুধ আমদানিতে অস্বাভাবিক করারোপ করে রেখেছে। এটা সংশোধন হওয়া দরকার। কয়েল কোম্পানি চক্রের অপতৎপরতা ভেঙে দিতে হবে।

ড. মঞ্জুর বলেন, কৃষিতে ব্যবহৃত কীটনাশকের মতো জনস্বাস্থ্যের কাজে ব্যবহৃত কীটনাশকের আমদানি কর সমান হলে ব্যক্তি ও সোসাইটি পর্যায়েও মানুষ কীটনাশক কিনে ব্যবহার করত।

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) স্বাস্থ্য বিভাগ সূত্রে জানা যায়, ২০২০-২১ অর্থবছরে মশক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমে ডিএনসিসির বাজেট ছিল ৭০ কোটি টাকা। খরচ হয়েছে ৫০ কোটি ৫০ লাখ টাকা। এর মধ্যে মশার ওষুধ কেনায় ৩০ কোটি, আবর্জনা ও আগাছা পরিষ্কারে ১ কোটি ৫০ লাখ, ফগার ও স্প্রে মেশিন পরিবহণ খাতে ৩ কোটি, বিশেষ কর্মসূচিতে ২ কোটি, আউট সোর্সিংয়ের মাধ্যমে মশা নিয়ন্ত্রণে ১২ কোটি টাকা এবং চিরুনি অভিযানে ব্যয় করেছে ২ কোটি টাকা। অন্যদিকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) স্বাস্থ্য বিভাগ সূত্রে জানা যায়, গত অর্থবছরে মশা নিয়ন্ত্রণ খাতে বরাদ্দ ছিল ৩৫ কোটি টাকা। তবে ৪৩ কোটি ৭৫ লাখ টাকা খরচ করে। এর মধ্যে মশার ওষুধ ক্রয়ে খরচ করেছে ৩৯ কোটি ৫০ লাখ টাকা, জলাশয় পরিষ্কার ও ব্যবস্থাপনায় খরচ ৫০ লাখ টাকা, ফগার ও স্প্রে মেশিন পরিবহণে খরচ ৩ কোটি ৭৫ লাখ টাকা।

এডিস মশা নিয়ন্ত্রণে বিশেষ উদ্যোগ

ডিএনসিসি ২৭ জুলাই থেকে ৭ আগস্ট পর্যন্ত চিরুনি অভিযান পরিচালনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এ কার্যক্রম বাস্তবায়নে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ১০ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট নিযুক্ত করেছে ডিএনসিসিতে। নিজস্ব নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও বিশেষ সময়ের জন্য নিয়োজিত ম্যাজিস্ট্রেটরা ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করবেন। আর ডিএসসিসি এডিস মশা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম জোরদার করেছে। বিশেষ কার্যক্রমে সহায়তা দিতে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ডিএসসিসিতেও ১০ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট নিযুক্ত করেছে।

দুই মেয়রের ভাবনা

রাজধানীর বিদ্যমান এডিস মশার ভয়াবহ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের পরিকল্পনা সম্পর্কে জানতে চাওয়া হয় ঢাকার দুই সিটি মেয়রের কাছে। ডিএনসিসি মেয়র মো. আতিকুল ইসলাম জানান, বিদ্যমান করোনা পরিস্থিতির মধ্যে ডেঙ্গি ও চিকুনগুনিয়ায় যাতে কারও মৃত্যু না হয়, সেজন্য ডেঙ্গি ও চিকুনগুনিয়া প্রতিরোধে সবাইকে সচেষ্ট থাকতে হবে। সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এ ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলা করা সম্ভব। এজন্য তিনি নগরবাসীকে ডেঙ্গি ও চিকুনগুনিয়া প্রতিরোধে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান। তিনি আরও জানান, নগরবাসীকে নিজেদের ঘরবাড়ি ও আশপাশের পরিবেশ পরিষ্কার ও পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে। ফুলের টব, ছাদ বা অন্য কিছুতে যাতে তিন দিনের বেশি সময় পানি জমে না থাকে সেদিকে বিশেষ দৃষ্টি রাখতে হবে। এ ছাড়া ডিএনসিসি থেকে প্রচারিত নম্বরগুলোতে যোগাযোগ করে ডেঙ্গি বিষয়ক তথ্য সেবা গ্রহণ করার অনুরোধ করেন তিনি।

ডিএসসিসি মেয়র ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস জানান, এডিস মশা নিয়ন্ত্রণে আমরা বিশেষ গুরুত্বারোপ করেছি। আমাদের ভ্রাম্যমাণ আদালতগুলোর পাশাপাশি আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তাদেরও ৯ জুলাই থেকে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনায় যুক্ত করা হয়েছে। ঈদের পরে আজ (রোববার) থেকে আবারও ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা শুরু হয়েছে।

তিনি আরও জানান, ডিএসসিসির অঞ্চল-২ এ ডেঙ্গি রোগী শনাক্তের হার বেশি হওয়ায় সেখানে চিরুনি অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। যে বাড়িগুলোতে ডেঙ্গি রোগী শনাক্ত হচ্ছে সেসব বাড়ির আঙিনা থেকে শুরু করে আশপাশের ৪০০ গজ এলাকার মধ্যে নিবিড়ভাবে অ্যাডাল্টিসাইডিং (উড়ন্ত মশক নিধন ওষুধ) ও লার্ভিসাইডিং (মশার লার্ভা ধ্বংস) করা হচ্ছে।

ডেঙ্গি নিয়ন্ত্রণে ঢাকাবাসীর সহযোগিতা চেয়ে ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস বলেন, নগরবাসীর সচেতনতা ডেঙ্গি নিয়ন্ত্রণের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার। দয়া করে আপনার বাসার কোনো পাত্রে কিংবা আশপাশে দুই বাড়ির মধ্যবর্তী স্থানে, পরিত্যক্ত চাকা, প্লাস্টিকের বোতল, হিমায়ক যন্ত্রের পেছনের অংশ ও তলানিতে পানি জমে আছে কিনা খেয়াল রাখুন। এ ছাড়া শীতাতপ নিয়ন্ত্রক যন্ত্র (এসি) এবং যেসব জায়গায় স্থাপন করা হয়েছে ঠিক তার নিচে কিংবা বাড়ির আঙিনা-ব্যালকনি-ছাদে কোনো ফুলের টবে যেন পানি জমা না থাকে সে বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। এছাড়াও স্বল্প খরচে আপনার বাড়ির আঙ্গিনা ডেঙ্গি মুক্ত করতে অনলাইনে আবেদন করতে পারেন কিংবা আমাদের নিয়ন্ত্রণ কক্ষকেও অবগত করতে পারেন। রাজধানীবাসীর সহযোগিতা পেলে আমরা অচিরেই ডেঙ্গি নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হব।

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত