প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

[১] নোয়াখালীতে ‘মুজিববর্ষের উপহারের ঘরে ফাটল’

অহিদ মুুকুল : [২] মুজিববর্ষে প্রধানমন্ত্রীর উপহার স্বরুপ ভূমিহীন-গৃহহীনদের জন্য নোয়াখালীর কবিরহাট উপজেলার ধানসিঁড়ি ইউনিয়নের জগদানন্দ গ্রামে নির্মিত ১৭টি ঘরের মধ্যে অধিকাংশ ঘরের মেঝে, দেয়াল ও পিলারে ফাটল ধরেছে। ভেঙ্গে গেছে একাধিক ঘরের দরজা-জানালা। পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা না থাকায় টয়লেটগুলোও ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। এতে দুর্ভোগ দেখা দিয়েছে সেখানকার উপকারভোগী পরিবারগুলোর সদস্যদের।

[৩] প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া উপহারের ঘরগুলো পেয়ে যতটা খুশি হয়েছেন উপকারভোগীরা, এখন নানা সমস্যায় তাদের মুখের হাসি মলিন হয়ে পড়েছে। উপকারভোগীরা বলছেন, প্রধানমন্ত্রী আমাদের জন্য ঘর দিয়েছেন, এটা আমাদের সৌভাগ্য। কিন্তু ছয় মাস না পেরুতেই ঘরগুলোতে দেখা দিয়েছে ফাটল। টয়লেটগুলো ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। দরজা-জানালাগুলো ভেঙ্গে পড়ছে। ঘর নির্মাণের সময় পর্যাপ্ত সিমেন্ট ও রড় ব্যবহার করা হয়নি। এতে পিলার, দেওয়াল ও ফ্লোরে ফাটল দেখা দিয়েছে। বৃষ্টি হলে ঘরের ছাল দিয়ে পানি পড়ে। এসব সমস্যায় ঘরে বসবাস করতে কষ্ট হয়।

[৪] উপজেলা প্রশাসনের তথ্য মতে, মুজিববর্ষে প্রধানমন্ত্রীর উপহার স্বরুপ ভূমিহীন-গৃহহীনদের জন্য কবিরহাটে মোট ৭৪টি ঘর নির্মাণ করা হয়েছে। এরমধ্যে জগদানন্দ গ্রামে তৈরী হয়েছে ১৭টি ঘর। আক্তারের খেফায় ৩৫টি ঘরের নির্মাণ কাজ শেষ পর্যায়ে রয়েছে। অন্যান্য জায়গায় রয়েছে ২২টি ঘর। প্রতিটি ঘর তৈরিতে বরাদ্দ ছিল ১ লাখ ৭১ হাজার টাকা। গত ২৩ জানুয়ারি প্রথম পর্যায়ে নির্মিত ঘরগুলো আনুষ্ঠানিকভাবে উপকার ভোগীদের মাঝে হস্তান্তর করা হয়। সেমি-পাকা দুই কক্ষ বিশিষ্ট এসব ঘরে সংযুক্ত একটি রান্নাঘর ও টয়লেট রয়েছে।

[৫] শনিবার (১৭ জুলাই) সরেজমিন কবিরহাট উপজেলার ধানসিঁড়ি ইউনিয়নের জগদানন্দ গ্রামে গিয়ে জানা গেছে, ভূমিহীন-গৃহহীন পরিবারের জন্য তৎকালীন উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও ভারপ্রাপ্ত উপজেলা নির্বাহী অফিসার মীর রাশেদুজ্জামান এবং উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকতা জিয়াউল হকের তত্বাবধায়নে সেখানে নির্মিত ঘরগুলো চলতি বছরের জানুয়ারী মাসে উপকারভোগীদের বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে। দেখা গেছে, ছয় মাস না পেরুতেই সবগুলো ঘরেই কম-বেশি দেওয়ালের আস্তরণ ঝড়ে পড়ছে, ফ্লোর ও পিলারে দেখা দিয়েছে ফাটল। ঘর তৈরিতে নিন্মমানের সামগ্রীর ব্যবহার ও দুর্নীতির অভিযোগ তুলছেন বাসিন্দারা। এতে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে উপকারভোগীদের বসবাস।

[৬] উপকারভোগী মো. রাশেদ বলেন, আমার কোনো জমি বা ঘর ছিলো না। প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া উপহারের ঘর পেয়ে অনেক খুশি হয়েছি। কিন্তু ঘরে বসবাসের ছয় মাস না যেতেই আমার ঘরের জানালা খুলে পড়ে যাচ্ছে। দেওয়াল ও ফ্লোরেও ফাটল ধরেছে। ঘর নির্মাণের সময়ে নিন্মমানের সামগ্রীর ব্যবহার ও পর্যাপ্ত সিমেন্ট দেওয়া হয়নি। ঘরের এসব সমস্যায় প্রতিনিয়তই এখানে ঝুঁকির মধ্যে থাকতে হচ্ছে।

[৭] উপকারভোগী ইউসুফ নবীর মা বললেন, এখানে থাকতে ইচ্ছা করেনা, বাথরুমের দরজা দিতাম পারিনা, বাথরুমে পানি জমে থাকে, দরজা আলগা হয়ে গেছে। ফ্লোর ফাইট্টা গেছে, ছাল দিয়ে পানি পড়ে। একই কথা বললেন উপকারভোগী আবুল কালামের স্ত্রী রোজিনা আক্তার।

[৮] তিনি বলেন, ঘরের দরজা লাগানো যায়না, দরজার সাইড দিয়ে ভাঙ্গি গেছে, ফ্লোর বে¹া হাডি (ফাটল) গেছে, আঙ্গো বাথরুমের যে কষ্ট! ঝয় (বৃষ্টি) এক চুরা অইলেই বাথরুমের স্লাভের ওপরে হানি (পানি) উডি যায়। র্দুগন্ধে খাওয়া-দাওয়া খাইতে হারি না।

[৯] এসব বিষয়ে প্রশাসনের কাউকে জানিয়েছেন কিনা এমন প্রশ্নে উপকারভোগী সুফিয়া বলেন, আমরা মুরুক্ষ (অশিক্ষিত) মানুষ, কার কাছে যামু, কারে কমু। এক সাপ্তা আগে স্যারেরা আইসা কইছে, যা করি দিবার দি গেছি, পরবর্তীতে যা হারি আরো করি দিমু। আমনেরা (আপনারা) কেউ আইলে কিছু বলিয়েন-টলিয়েন না, যা অইবার অই গেছে।

[১০] একইভাবে ঘরের কাজে নিন্মমানের সামগ্রীর ব্যবহার ও দুর্নীতির অভিযোগ তুলে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন উপকারভোগী মো. মোস্তফা, তাজনাহার, আমেনা বেগম ও উপকারভোগী পরিবারের সদস্য কহিনুর আক্তার। তারা জানান, প্রধানমন্ত্রী আমাদের ভালোভাবে বাঁচার জন্য ঘর নির্মাণ করতে টাকা বরাদ্দ দিলেও ঘরের কাজ ভালো হয়নি। ঘরের দরজা-জানালা ঝড়ে পড়ছে। দেওয়াল ও ফ্লোরে ফাটল ধরেছে। এতে আমরা ঝুঁকির মধ্যে বসবাস করছি।

[১১] ঘরগুলো নির্মাণের তত্বাবধায়নে থাকা উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা জিয়াউল হকের কাছে এসব বিষয়ে জানতে তার মুঠোফোনে রোববার দুপুর ও সোমবার দুপুরে বেশ কয়েকবার কল করলে তিনি ফোন রিসিভ না করায় তার বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।

[১২] উপজেলা নির্বাহী অফিসার হাসিনা আক্তার জানান, ঘরগুলো বাস্তবায়নের সময় তিনি এ উপজেলায় ছিলেন না। তিনি বলেন, আমরা নিজেদের বাড়িতে বসবাসের জন্য কোন ঘর নির্মাণ করলেও সেখানে টুকিটাকি কিছু সমস্য হয়। মুজিববর্ষের উপহারের এ ঘরগুলোর মধ্যে দু-একটিতে যে সমস্যা হয়েছে তা গতকাল রোববার (১৮ জুলাই) লোক পাঠিয়ে মেরামত করে দেওয়া হয়েছে। টয়লেটের পানি নিষ্কাশনের জন্য ঘরের পাশে ড্রেন নির্মাণ করে দেওয়া হবে।

[১৩] সোমবার দুপুরে উপকারভোগী আনোয়ার হোসেন মুঠোফোনে জানান, উপজেলা থেকে লোক এসে দেওয়াল ও পিলারের ফাটা কিছু অংশে আস্তরণ লাগিয়ে দিয়েছে। কিন্তু ভেঙ্গে পড়া দরজা-জানালা মেরামত করেনি। বাথরুমের সমস্যাও সমাধান হয়নি।

সর্বাধিক পঠিত