প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

যায়নুদ্দিন সানী: কেমন হবে তালেবান টু পয়েন্ট ও

যায়নুদ্দিন সানী: আফগানিস্তানের অবস্থা দেখে যা মনে হচ্ছে, অচিরেই সেখানে প্রতিষ্ঠা হতে যাচ্ছে, তালেবান শাসন। আশরাফ ঘানি সরকার মুখে যদিও বলছে, আগামী একশ বছরেও পারবে না, কিন্তু বাস্তব অবস্থা বোধহয় ততোটা আশাপ্রদ না। মার্কিন সেনা সরে যাওয়ার সাথে সাথে দুর্দান্ত গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে তালেবান। একের পর এক প্রদেশের দখল নিচ্ছে। আশেপাশের দেশের সাথে লাগোয়া শহরগুলোর দিকে এগোচ্ছে আগে। বেশ অনেকগুলো চেকপোস্ট দখল করে নিয়েছে। নিয়ন্ত্রণ করছে বেশ অনেক দেশের সাথে চলা বাণিজ্য পথ।

কিন্তু যে প্রশ্নটা সবার মনে জাগছে, সেটা হচ্ছে, তালেবান টু পয়েন্ট ও কেমন হবে। প্রথমবার যেমন কড়া ইসলামি শাসন চালু করেছিলো, বামিয়াং এ বৌদ্ধ মূর্তি ধ্বংস করেছিল, তেমনই কট্টর এক সরকার তৈরি করবে? না লিবারাল হবে? এই প্রশ্নের উত্তর সম্ভবতঃ আমাদের কারোরই জানা নেই। তবে এবার পরিস্থিতি ভিন্ন। এবার আর যাই ঘটুক, কোন বিদেশী রাষ্ট্র চোখ রাঙানোর সাহস দেখাবে না। অন্ততঃ সেখানে সেনা পাঠাবার ভুল করবে না। তালেবান কথা না শুনলে বড়জোর ড্রোন অ্যাটাক করতে পারে, তবে এর বেশি কিছু করার চেষ্টা মনে হয় কেউ করবে না।

এবার দেখা যাক উল্টোদিক থেকে। তালেবান কি বিশ্ব সম্প্রদায়ের কথা শুনবে? মিলিয়ন ডলার কোয়েসচেন। বামিয়ানে যেভাবে বিশ্ব মত উপেক্ষা করেছিল, তেমন ঘটনা কি আবার ঘটবে? ধারণা করা হচ্ছে, বেশ কিছু ক্ষেত্রে শুনবে না। কঠোর শরীয়া আইন চালু করবে। পুরুষদের দাঁড়ি রাখা বাধ্যতামূলক করা, নারীদের জন্য বোরখা এবং একাকী বের হওয়ার ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা, নারীদের স্কুল বন্ধ জাতীয় সিদ্ধান্তগুলোতে পরিবর্তন করবে না বয়া করতে পারবে না। তালেবানদের ঊর্ধ্বতন মহল চাইলেও, তাঁদের ক্যাডাররা মনে হয় এমন সিদ্ধান্ত মেনে নেবে না। ফলে এই মুহূর্তে দারুণ রক্ষণশীল এক সরকার হতে যাচ্ছে তালেবান।

দ্বিতীয় যে ব্যাপারটা নিয়ে সবাই উদ্বিগ্ন, সেটা হচ্ছে, প্রতিবেশী দেশগুলোতে এর প্রতিক্রিয়া কি হবে? তাজিকিস্তানে রয়েছে রাশিয়ান এয়ার বেস। তাজিকিস্তানের সাথে কোন রকম সংঘর্ষে জড়ালে রাশিয়ার জন্য সেটা চিন্তার বিষয় হয়ে দাঁড়াবে। বিশেষ করে সরকারী সেনা পরাজিত হয়ে যেভাবে তাজিকিস্তানে পালাচ্ছে, সেখান থেকে যদি হামলা হয়, তখন পরিস্থিতি কি হবে? এ ব্যাপারে আশ্বাস দিতেই বোধহয় রাশিয়া যায় তালেবান কর্তৃপক্ষ। বোঝায়, ওখানে হামলা করার ইচ্ছে নেই।

ভয়ে আছে ভারতও। তালেবান কর্তৃপক্ষ যেখানেই যাচ্ছে, জয়সঙ্কর সেখানেই গিয়ে হাজির হচ্ছেন। উনাদের ভয়, পাক অধিকৃত কাশ্মীরের সাথে লাগোয়া প্রদেশ বাদাখশান। ওখানে তালেবানদের কব্জা হয়ে গেছে। সেখান থেকে যদি কাশ্মীরে আসতে শুরু করে তালেবান যোদ্ধারা, তখন কি হবে? যদিও অনেকেই বলছেন, সে সম্ভাবনা কম, কিন্তু ভয়টা থেকেই যাচ্ছে। সম্প্রতি মোদী শাহ যেভাবে কাশ্মীরের সব নেতাদের সাথে আলাপে বসে জানিয়েছেন কাশ্মীরকে পূর্ণ রাজ্যের দরজা ফেরত দেয়া হবে, তাতে অনেকের মনেই সন্দেহ জাগছে, এটা আসলে তালেবান ইফেক্ট।
তৃতীয় যে ব্যাপারটা তালেবান শাসনের চেহারা নির্ধারণ করবে, তা হচ্ছে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় তালেবানদের সাথে কি সম্পর্ক রাখছে, সেটা। তাঁরা যদি আবার অবরোধ আরোপ করে, তালেবান বাধ্য হবে পপি চাষ করে নিজেদের অর্থনীতি সচল রাখতে। শুরু হবে স্মাগ্লিং। আর যদি তা না করে, হয়তো দেখা যাবে পরিস্থিতি অনেক সহজ হয়ে উঠছে।

আফগানিস্তানে রয়েছে লিথিয়াম সহ বেশ কিছু দুষ্প্রাপ্য আর্থ মেটালের বিশাল ভাণ্ডার। আর সেটা উত্তোলনের জন্য দরকার বিদেশী পুঁজি। তাই তালেবানও চাইবে দেশে শান্তি আসুক। যতোটা সম্ভব নমনীয় হয়ে আন্তর্জাতিক মহলের সাথে আলোচনায় বসতে। আমেরিকা যেহেতু তালেবানদের সাথে আলোচনা করেছে, তাই আচমকা ‘জঙ্গী সংগঠন’ ছুতো দিয়ে এবার তাঁরা এতো সহজে অবরোধ আরোপ করতে পারবে না, বা করবে না। ধারণা করা হচ্ছে ভারত সহ অন্যান্য দেশ ব্যাক চ্যানেল ডিপ্লোম্যাসি ইতিমধ্যে শুরু করে দিয়েছে তালেবানদের সাথে।

সো? এবার কি আমরা অনেক মডারেট তালেবান দেখতে পাবো? সব কিছুই নির্ভর করছে বহির্বিশ্ব তালেবানদের সাথে কেমন ব্যবহার করে, তার ওপর। বামিয়ানের ঘটনার সামনের দিকটা কমবেশি আমরা সবাই জানি। তালেবানরা বলেছিল, ইসলাম ধর্মে মূর্তি পূজা নেই, তাই এই মূর্তি আমরা উড়িয়ে দেব। পেছনের ঘটনা কিন্তু খানিকটা অন্যরকম। ঘটনাটা যখন ঘটে, ঠিক সেই সময় তালেবানদের ওপর চলছিল অবরোধ। তখন জাপানী এক ডেলিগেশান যায় মোল্লা ওমরের সাথে দেখা করতে। বলে এক বিশাল অংকের অর্থ বরাদ্দ করেছে তাঁদের সরকার, বিভিন্ন দেশের প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন সংরক্ষণের জন্য। আমরা চাই আফগানিস্তানের বৌদ্ধ মূর্তিগুলো সংস্কার করতে। রেগে যান মোল্লা ওমর, বলেন তোমাদের অবরোধের জন্য আমার দেশের বাচ্চারা দুধ পাচ্ছে না, আর তোমরা টাকা খরচ করছো মূর্তি সংস্কারের জন্য?

এরপরের কাহিনী সবার জানা। ঘটনাটার সত্যতা জানি না। বক্তব্যটা এসেছে এক তালেবান প্রবক্তার মুখ থেকে। যাই হোক, কাহিনীটা বলার উদ্দেশ্য হচ্ছে, তালেবান কেমন আচরণ করবে তা যেমন নির্ভর করছে তালেবান নেতৃত্বের ওপর, তেমনি অনেকটাই নির্ভর করছে বিশ্ব সম্প্রদায় তালেবানদের সাথে কতোটা সম্পর্ক স্থাপনে আগ্রহ দেখাবে তার ওপর। আবার নিষেধাজ্ঞা আরোপ করবে, না আলোচনায় বসবে, সেটাই নির্ধারণ করে দেব তালেবান টু পয়েন্ট ও কেমন হবে।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত