প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

অপ্রদর্শিত অর্থ ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের উদ্যোক্তাদের মাঝে ব্যয় করলে বন্ধ হবে পাচার, বাড়বে কর্মক্ষেত্র

  • অপ্রদর্শিত অর্থ সব শিল্পে বিনিয়োগের প্রস্তাব
  • অর্থনৈতিক জোন, ক্ষুদ্র মাঝারিসহ শিল্প খাতে ব্যয় হলে বন্ধ হবে পাচার, বাড়বে কর্মক্ষেত্র

বাংলাদেশ প্রতিদিন: দেশের আবাসন, শেয়ারবাজারসহ সব উৎপাদনশীল শিল্প খাতে অপ্রদর্শিত অর্থ বৈধভাবে অবাধ বিনিয়োগের পক্ষে ব্যবসায়ী ও বিশিষ্টজনেরা। সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, অপ্রদর্শিত অর্থের বিনিয়োগে অর্থনীতিতে চাঙাভাব থাকবে। অর্থ পাচার বন্ধ হবে। দেশের টাকা দেশেই থেকে যাবে। সরকার যে ১০০ অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তুলছে তার মধ্যে ২৮টির কাজ চলছে দ্রুতগতিতে। এ অঞ্চলগুলোয় অপ্রদর্শিত অর্থ বিনিয়োগের সুযোগ রাখা দরকার। এ ছাড়া ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের উদ্যোক্তাদের পাশাপাশি অন্যান্য খাতেও অপ্রদর্শিত অর্থের অবাধ বিনিয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। এ প্রসঙ্গে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা অর্থনীতিবিদ ড. এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম গতকাল বলেন, দেশের অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোয় অপ্রদর্শিত অর্থ বিনিয়োগের ক্ষেত্রে যেসব উদ্যোক্তার দক্ষতা ও যোগ্যতা আছে তাদের সুযোগ- সুবিধা দেওয়া যেতে পারে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর অর্থনীতিবিদ ড. মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন বলেন, করদাতার নৈতিকতা শুধরে কোনো খাতে অপ্রদর্শিত অর্থ বিনিয়োগে প্রতিবন্ধকতা থাকা উচিত নয়। দেশের সব শিল্প, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের পাশাপাশি অন্যান্য খাতেও অপ্রদর্শিত অর্থ বিনিয়োগের সুবিধা ধারাবাহিকভাবে রাখা উচিত।

দেশের এই খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদদের মতো ব্যবসায়ী-শিল্পপতিদের শীর্ষ সংগঠন বাংলাদেশ শিল্প ও বণিক সমিতি ফেডারেশন- এফবিসিসিআই সভাপতি মো. জসিম উদ্দিন বলেন, সব শিল্প খাতে অপ্রদর্শিত অর্থের বিনিয়োগ চাই। তবে ঢালাওভাবে সারা জীবনের জন্য নয়। এ ধরনের অর্থ মূল স্রোতে আনতে একটা নির্দিষ্ট সময় নির্ধারণ করা প্রয়োজন।
শিল্পমালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজ-বিসিআই সভাপতি আনোয়ার উল আলম চৌধুরী পারভেজ বলেন, দেশের অর্থনৈতিক অঞ্চলসহ অন্যান্য শিল্প খাতে অপ্রদর্শিত অর্থ বিনিয়োগের সুবিধা থাকা উচিত। কোনো বাধা থাকা উচিত নয়। পাশাপাশি নতুন ও তরুণ উদ্যোক্তারাও যাতে অপ্রদর্শিত অর্থ বিনিয়োগ করতে পারেন, সে সুযোগও সবাইকে দেওয়া উচিত।

তথ্যমতে, দেশের প্রচলিত আইনে যা-ই থাকুক না কেন, অপ্রদর্শিত অর্থের বিনিয়োগ নিয়ে কেউ কোনো প্রশ্ন উত্থাপন করতে পারবেন না। চলতি ২০২০-২১ অর্থবছরের বাজেটে থাকা এ আইনি নির্দেশনা, আগামী পাঁচ থেকে ১০ বছর পর্যন্ত অব্যাহত রাখার দাবি জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। তাদের যুক্তি, দায়মুক্তির এ সুবিধায় দেশে বিশাল অঙ্কের অর্থ বিনিয়োগ হয়েছে। বেড়েছে রাজস্ব। যা অব্যাহত থাকলে জাতীয় সম্পদ ও প্রবৃদ্ধি বাড়বে। অন্যথায় বিপুল পরিমাণ অর্থ বিদেশে পাচার হয়ে যাবে। পাচার ঠেকাতে আবাসন, শেয়ারবাজারসহ সব শিল্প খাতে অপ্রদর্শিত অর্থ বৈধভাবে অবাধ বিনিয়োগের নিশ্চয়তা চান ব্যবসায়ীরা। চলতি অর্থবছরের বাজেটে থাকা আইনি নির্দেশনা অনুযায়ী করদাতাদের অপ্রদর্শিত অর্থ বিনিয়োগ করতে হবে জমি, ফ্ল্যাট, বিল্ডিং ও অ্যাপার্টমেন্ট, ব্যাংক, সঞ্চয়পত্র, শেয়ারবাজার, বন্ড বা অন্য কোনো সিকিউরিটিজে। এ সুবিধা নিতে ১০ শতাংশ হারে আয়কর দিতে হবে। নেই কোনো জরিমানা। এ সুবিধা আগামীতে অব্যাহত রাখার প্রস্তাব দিয়ে করহার কমিয়ে ৫ শতাংশ নির্ধারণের দাবি তুলেছে দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ-ডিএসইসহ বিভিন্ন ব্যবসা খাতের প্রতিষ্ঠান ও সংগঠন। আবাসন খাতের সংগঠন বাংলাদেশ ল্যান্ড ডেভেলপারস অ্যাসোসিয়েশন-বিএলডিএ বলেছে, আবাসন খাতের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি মোকাবিলায় পাঁচ থেকে ১০ বছরের জন্য প্লট ও ফ্ল্যাটে বিনাপ্রশ্নে অপ্রদর্শিত অর্থ বিনিয়োগের সুবিধা বহাল রাখা প্রয়োজন। কিন্তু আয়কর অধ্যাদেশ, ১৯৮৪-এর ১৯বি ধারায় প্রদত্ত ইনডেমনিটি বা দায়মুক্তির সুযোগ না পেলে পুনরায় বিপুল পরিমাণ অর্থ বিদেশে পাচারের আশঙ্কা দেখা দেবে। বিভিন্ন দেশে ‘সেকেন্ড হোম’ গ্রহণের সুযোগ থাকায় অপ্রদর্শিত অর্থ বিদেশে চলে যাবে। কারণ ওইসব দেশে প্লট ও ফ্ল্যাট কেনার ক্ষেত্রে অর্থের উৎস জানতে চাওয়া হয় না।

বিএলডিএর সঙ্গে একমত পোষণ করে আবাসন খাতের আরেক সংগঠন রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ-রিহ্যাব সভাপতি আলমগীর শামসুল আলামিন কাজল বলেন, সরকার ফ্ল্যাট ও অ্যাপার্টমেন্ট কেনায় অপ্রদর্শিত অর্থ বিনিয়োগের যে সুবিধা অব্যাহত রেখেছে তা এ খাতে ফলপ্রসূ ভূমিকা রাখবে এবং অভ্যন্তরীণ সম্পদ বৃদ্ধিতে সহায়তা করবে। সরকারি হিসাবেই এখন পর্যন্ত অপ্রদর্শিত প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকা অর্থনীতির মূল্য স্রোতধারায় এসেছে। সরকার রাজস্ব পেয়েছে প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা; যা কভিড পরিস্থিতিতে অর্থনীতির প্রাণচাঞ্চল্য ফেরাতে কার্যকর ভূমিকা রেখেছে। আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, এ নীতি অব্যাহত থাকলে আরও বহুগুণ অপ্রদর্শিত অর্থ অর্থনীতির মূলধারায় যোগ হবে; যা রাজস্ব বাড়াতে সহায়ক হবে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড-এনবিআরকে রিহ্যাব বলেছে অপ্রদর্শিত অর্থ দেশে বিনিয়োগের সুযোগ করে দেওয়ায় ভবিষ্যতে ওইসব বিনিয়োগকারী করজালের আওতায় চলে আসবেন। এতে সরকারের রাজস্ব বাড়বে। আয়কর অধ্যাদেশ, ১৯৮৪-এর ধারা ১৯বিবিবিবিবিতে ইনডেমনিটি বা দায়মুক্তি বিদ্যমান থাকার কারণেও দেশের রাজস্ব বৃদ্ধি পাচ্ছে। রাজস্ব বৃদ্ধির এ স্রোত ধরে রাখা অতীব জরুরি। এনবিআরের সদস্য (আয়কর নীতি) আলমগীর হোসেনের মতে, অপ্রদর্শিত আয় মূলধারায় নিয়ে আসার বিশেষ প্রয়োজন রয়েছে। বেশ কয়েকটি উন্নয়নশীল ও উন্নত দেশের উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, বিশেষ কর সুবিধার মাধ্যমে অপ্রদর্শিত অর্থ বিনিয়োগের সুবিধা দিলে তা সামগ্রিক অর্থনীতির উন্নয়নে সাহায্য করবে। এনবিআরের আরেক সদস্য (কর প্রশাসন ও মানবসম্পদ) হাফিজ আহমেদ মুর্শেদের মতে, দেশের ইতিহাসে কোনো একক অর্থবছরে এত বিপুল পরিমাণ অপ্রদর্শিত অর্থ প্রদর্শনের রেকর্ড নেই। আশা করি, অর্থবছর শেষে এ আয় প্রদর্শনের হার আরও অনেক বাড়বে। এদিকে দায়মুক্তি সুবিধা পেয়ে চলতি অর্থবছরের অপ্রদর্শিত আয় প্রদর্শনের রেকর্ড গড়েছেন করদাতারা। এনবিআরের সর্বশেষ হিসাবে দেশের ব্যক্তি-শ্রেণির ৭ হাজার ৪৪৫ করদাতা তাদের বার্ষিক আয়কর বিবরণীতে অপ্রদর্শিত আয়ের ১০ হাজার ২২০ কোটি টাকা প্রদর্শন করেছেন। বিপরীতে এসব করদাতা সরকারি কোষাগারে আয়কর পরিশোধ করেছেন প্রায় ৯৩৯ কোটি ৭৬ লাখ টাকা। এনবিআর চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাস বা ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত সারা দেশে ব্যক্তি-শ্রেণি করদাতার আয়কর বিবরণী বা রিটার্ন দাখিলের তথ্য প্রকাশ করেছে। এতে এনবিআর বলেছে, অর্থনীতিতে গতি সঞ্চার, বিনিয়োগ বৃদ্ধি ও পুঁজিবাজারের উন্নয়নে সরকার অপ্রদর্শিত অর্থ বিনিয়োগের যে বিশেষ সুযোগ দিয়েছে তাতে অভূতপূর্ব সাড়া দিয়েছেন করদাতারা। ফলে আয়কর অধ্যাদেশ, ১৯এর এএএএ ধারা অনুযায়ী ২০৫ জন করদাতা প্রায় ২২ কোটি ৮৪ লাখ টাকা কর পরিশোধ করে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন অনুমোদিত সিকিউরিটিজে বিনিয়োগ করেছেন। এ ছাড়া ১৯এর এএএএএ ধারা অনুযায়ী ৭ হাজার ৪৪৫ জন করদাতা প্রায় ৯৩৯ কোটি ৭৬ লাখ টাকা আয়কর পরিশোধ করে অপ্রদর্শিত আয় প্রদর্শন করেছেন। ফলে দেশের ফরমাল ইকোনমি বা আনুষ্ঠানিক অর্থনীতিতে প্রায় ১০ হাজার ২২০ কোটি টাকা প্রবেশ করেছে; যা বিনিয়োগ বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও কর জিডিপির হার বৃদ্ধিতে বিশেষ ভূমিকা পালন করবে বলে মনে করছে এনবিআর। করদাতাদের জন্য আয়কর অধ্যাদেশের ১৯এএএএ এবং ১৯ এএএএএ-এর মাধ্যমে কর পরিশোধের সুযোগ আগামী ৩০ জুন পর্যন্ত বলবৎ রয়েছে। এ সুবিধা আগামীতে অব্যাহত রেখে সব শিল্প খাতে অপ্রদর্শিত অর্থ অবাধ বিনিয়োগের দাবি জানিয়েছেন দেশের ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদরা। চলতি অর্থবছরের বাজেটে থাকা আইনি নির্দেশনায় আরও বলা হয়, কোনো কোনো ক্ষেত্রে করদাতার রিটার্ন দাখিলে অজ্ঞতার কারণে তাদের কিছু অর্জিত সম্পদ প্রদর্শনে ত্রুটি-বিচ্যুতি থাকতে পারে। এ অবস্থায় করদাতাদের আয়কর রিটার্নের এ ত্রুটি সংশোধনের সুযোগ প্রদান এবং অর্থনীতির স্রোতে অর্থপ্রবাহ বাড়ানোর লক্ষ্যে আয়কর অধ্যাদেশের আয়কর প্রণোদনাসংক্রান্ত দুটি ধারা সংযোজন হয়েছে। প্রসঙ্গত, দেশে এ পর্যন্ত ১৭ বার অপ্রদর্শিত অর্থ মূলধারায় আনার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। এতে প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকা প্রদর্শিত হয়েছে। সবচেয়ে বেশি টাকা সাদা হয়েছে ২০০৭ ও ২০০৮ সালে এক-এগারোর তত্ত্বাবধায়ক সরকার আমলে। ওই সময় ৩২ হাজার ৫৫৮ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান এ সুযোগ নিয়েছিলেন। তখন ৯ হাজার ৬৮৩ কোটি টাকা প্রদর্শিত হয়।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত