প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

দীপক চৌধুরী: দুর্নীতি করলে আগে গ্রেপ্তার হতেন না, আওয়াজ হতো না, এখন শাস্তি হয়

দীপক চৌধুরী: দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে আওয়ামী লীগের সাংসদ সামশুল হক চৌধুরী, ইঞ্জিনিয়ার মোয়াজ্জেম হোসেন রতন ও নুরুন্নবী চৌধুরী শাওনসহ ২২ জনের বিদেশ যাত্রায় নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। সম্প্রতি এ বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে পুলিশের বিশেষ শাখার (এসবি) বিশেষ পুলিশ সুপার (ইমিগ্রেশন) বরাবর চিঠি পাঠিয়েছেন দুদকের এ সংক্রান্ত অনুসন্ধান দলের প্রধান সৈয়দ ইকবাল হোসেন। দুদকের এমন কঠোরতা অবশ্যই সময়োপযোগী। দুদকের অনুসন্ধানে বিষয়টির প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া গেছে। এদেশের মানুষের নানানরকম চাওয়া-পাওয়া রয়েছে। কিন্তু কিছুসংখ্যক ব্যক্তির কারণে ভাবমূর্তি নষ্ট হোক তা জনগণ চায় না।

আমরা জানি, রাজনীতির কঠিন ময়দানে জাতির জনকের এই কন্যা বাংলাদেশের সবচেয়ে বেশি সময়ের প্রধানমন্ত্রী। তাঁর কারণেই আজ টেকসই উন্নয়নের মহাসড়কে দেশ। মোট চারবারের প্রধানমন্ত্রী তিনি। টানা তিনবারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত সাড়ে বারো বছর ধরে দুঃসাহসী নেতৃত্ব দিয়ে দেশের জনগণকে যেমন আত্মবিশ্বাসী করে তুলেছেন ঠিক তেমনি স্বয়ংসম্পূর্ণ বাংলাদেশ গড়ে তুলতে এক বিস্ময়কর সাফল্য অর্জন করতে সমর্থ হয়েছেন। সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারে গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গীকার ছিলো , ‘দুর্নীতির প্রতি জিরো টলারেন্স নীতি।’ সুতরাং মানুষের এখন প্রথম কথাই হচ্ছে, দুর্নীতিবাজদের বর্জন করতে হবে। এটুকু অনুমান করা যায়, দেশের শত্রুদের কারণে আশানুরুপভাবে আমরা এগোতে পারছি না।

অভিযোগ আনা ব্যক্তিদের বিষয়ে দুদকের চিঠিতে বলা হয়, সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে দেশে মানি লন্ডারিংসহ বিদেশে অর্থপাচারের অভিযোগ আছে। তারা যাতে দেশ ছেড়ে যেতে না পারেন সে বিষয়ে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানানো হচ্ছে। চট্টগ্রামের সাংসদ শামসুল হক চৌধুরী জাতীয় সংসদের হুইপ ও সাবেক যুবলীগ নেতা নুরুন্নবী চৌধুরী শাওন ভোলা ৩ আসনের সংসদ সদস্য। তাদের সঙ্গে গণপূর্ত অধিদপ্তরের সাবেক প্রধান প্রকৌশলী মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম, সাবেক অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মো. আব্দুল হাই এবং এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রশান্ত কুমার হালদারেরও বিদেশ যাত্রায় নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে।

এছাড়াও গ্রেপ্তার ঠিকাদার এস এম গোলাম কিবরিয়া শামীম ওরফে জি কে শামীম, মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের বহিষ্কৃত নেতা খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া, ঢাকা মহানগর যুবলীগ দক্ষিণের বহিষ্কৃত সভাপতি ইসমাইল চৌধুরী সম্রাট, মোহামেডান ক্লাবের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক মো. লোকমান হোসেন ভূঁইয়া, তার সহযোগী এনামুল হক আরমান, কলাবাগান ক্রীড়াচক্রের সভাপতি মোহাম্মদ শফিকুল আলম (ফিরোজ), অনলাইন ক্যাসিনোর নায়ক সেলিম প্রধান এবং ওয়ার্ড কাউন্সিলর হাবিবুর রহমানের (মিজান), গেন্ডারিয়া থানা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি এনামুল হক এনু ও তার ভাই গেন্ডারিয়া থানা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক রুপন ভূঁইয়া, কেন্দ্রীয় যুবলীগের বহিষ্কৃত দপ্তর সম্পাদক কাজী কাজী আনিছুর রহমান ও তার স্ত্রী সুমি রহমান, ওয়ার্ড কাউন্সিলর এ কে এম মমিনুল হক সাঈদ ও লোকমান হোসেন ভূঁইয়ার স্ত্রী নাবিলা লোকমান, এনামুল হক এনুর সহযোগী ওয়ান্ডারার্স ক্লাবের কর্মচারী আবুল কালাম আজাদ, রাজধানীর কাকরাইলের জাকির এন্টারপ্রাইজের মালিক মো. জাকির হোসেন ওরফে বাইট্যা জাকির ও সেগুনবাগিচার শফিক এন্টারপ্রাইজের মালিক মো. শফিকুল ইসলামের বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়।

আমরা বিভিন্ন গণমাধ্যমের খবরে দেখেছি, বাংলাদেশিদের অর্থ রাখা কমেছে, টাকা পাচার কিন্তু কমেনি। প্রতিবছরের মার্চে নিউইয়র্কভিত্তিক প্রতিষ্ঠান গ্লোবাল ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেগ্রিটি (জিএফআই) অর্থ পাচার নিয়ে একটি বৈশ্বিক প্রতিবেদন প্রকাশ করে। আমাদের কয়েকজন সংসদ সদস্য টাকা পাচার নিয়ে সংসদে আলোচনাও করেছেন। এ বিষয়ে কড়া ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে। আমরা জানি, একজন সংসদ সদস্য তাঁর স্ত্রীর নামে কানাডায় বিশাল বাড়ি কিনেছেন বলে গণমাধ্যমে প্রকাশ করা হয়েছে। কিন্তু মানুষ প্রত্যাশিত রেজাল্ট দেখছে না এসবের। বাজেট অধিবেশনে কয়েকজন সাংসদের এসব আলোচনার জবাবও দিতে হয়েছে আমাদের অর্থমন্ত্রীকে। বিশেষ করে অর্থমন্ত্রী নিজেই যখন টাকা পাচারকারীদের নাম জানতে চান, তখন পাচারকারীদের বিরুদ্ধে আমাদের অঙ্গীকার নিয়েই আসলে প্রশ্ন উঠে যায়। অর্থ পাচার ও অর্থ আত্মসাৎকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর নিতে হবে।

উচ্চপর্যায়ের জনপ্রতিনিধি ও স্থানীয় পর্যায়ের জনপ্রতিনিধিদের ওপর দায়িত্ব অনেক বেশি। কিন্তু আমরা যখন দেখি, উচ্চপর্যায়ের ও স্থানীয় পর্যায়ের একশ্রেণির প্রতিনিধি এমনসব অপকর্মে জড়িয়ে যান তখন ধিক্কার আসে নিজের ওপরই। নির্বাচিত হওয়ার পর ইউনিয়নের বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা, প্রতিবন্ধী ভাতা, ভিজিডি ও ভিজিএফের তালিকা তৈরিতে অনিয়ম-দুর্নীতি ও স্বেচ্ছাচারিতা করে আসছেন একশ্রেণির ইউপি চেয়ারম্যান ও সদস্য। এ ছাড়াও ইউনিয়নে উন্নয়নমূলক কাজের নামে ভুয়া প্রকল্প দেখিয়ে গম, চাল ও টাকা আত্মসাৎ করা হচ্ছে। শুধু তাই নয়, চেয়ারম্যান ও মেম্বাররা অতিদরিদ্রদের কর্মসূচির আওতায় কর্মসংস্থানের শ্রমিকদের নামের তালিকায় নিজস্ব লোকজনের নাম অন্তর্ভুক্ত করেও বিপুল পরিমাণ টাকা আত্মসাৎ করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। অনিয়ম-দুর্নীতির প্রতিকার ও বিচারের দাবিতে দুর্নীতি দমন কমিশন, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন দপ্তরে ইউনিয়নবাসীর পক্ষ থেকে লিখিত অভিযোগ করা হয়েছে, কিন্তু বিষয়গুলো জরুরিভাবে দেখা হয় না। করোনাকালে সরকারের দেওয়া অনুদান পর্যন্ত একশ্রেণির জনপ্রতিনিধি আত্মসাৎ করায় জেলে ঢুকেছেন।

মেগা প্রকল্পগুলোর দুর্নীতির তুলনায় এসব দুর্নীতি খুব ছোট হলেও দুর্নীতিকে দুর্নীতিই বলতে হবে। এর কোনো ছোট-বড় হয় না। তবে স্বীকার করতেই হবে, আগে দুর্নীতি ধরা হতো না, প্রকাশ করা হতো না এখন সরকারের অতি ঘনিষ্ট ব্যক্তিও ধরা পড়েন, গ্রেপ্তার হন, জেলে যান, শাস্তি হয়।

লেখক : উপসম্পাদক, আমাদের অর্থনীতি, সিনিয়র সাংবাদিক ও কথাসাহিত্যিক

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত