প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

শরিফুল হাসান: সরকারি কর্মকর্তাকে নারী হিসেবে না দেখে মানুষ হিসেবে দেখা উচিত

শরিফুল হাসান: বীর মুক্তিযোদ্ধাদের মৃত্যুর পর গার্ড অব অনার দেওয়ার ক্ষেত্রে নারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের (ইউএনও) বিকল্প চেয়েছে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটি। আমি মনে করি এটা নারী কর্মকর্তাদের অপমান। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সঙ্গেও এটি যায় না। কারণ বরং ধর্ম-বর্ণ-লিঙ্গসহ সব ধরেনর বৈষম্যের বিরুদ্ধে সমতা প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন নিয়ে আমাদের মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল। শুনলাম সংসদীয় কমিটি নাকি বলেছে, জানাজার সঙ্গে ধর্মীয় অনুভূতির একটা বিষয় আছে। নারীদের জানাজায় অংশ নেওয়া নিষেধ, এ রকম একটি বিষয় আছে। সে জায়গা থেকে চিন্তা করে এ সুপারিশ করা হয়েছে। শুনে খুবই অবাক হলাম। জানাজা আর গার্ড অব অনার তো এক না। আর এখানে নারী-পুরুষ যিনিই দিচ্ছেন তিনি তো আসলে রাষ্ট্রের প্রতিনিধিত্ব করছেন। তাহলে সমস্যা কোথায়?

এই যে নারীদের প্রতি অসম্মান এটি কিন্তু পদে পদে। এই দেশে একজন পুরুষ কমকর্তাকে সবাই স্যার স্যার করে। অথচ একজন নারীকে স্যার বলতে আপত্তি অনেকের। এমনকি সরকারি চাকরিতে থাকা অনেক কর্মচারী একজন পুরুষকে যেভাবে স্যার বলতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন, একজন নারী কর্মকর্তাকে নয়। কোনো বেসরকারি অফিস বা ব্যাংকেও নারীরা উঁচু পদে গেলে নানা কথা শুনতে হয়। অথচ নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও নারীরা কিন্তু যোগ্যতার সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছেন।

শুনলে আনন্দিত হওয়ার কথা, যে বর্তমানে প্রশাসনে নারীরা সংখ্যায় আগের চেয়ে অনেক বেড়েছে। মাঠ পর্যায়ের এসিল্যান্ড থেকে শুরু করে ইউএনও, ডিসি-সব জায়গায়ই নারীরা রয়েছেন। মন্ত্রণালয়ে সচিব, অতিরিক্ত সচিব, যুগ্ম সচিব থেকে শুরু করে সব পদেই নারীরা সুনামের সঙ্গে কাজ করছেন। সবমিলিয়ে সরকারি চাকরিতে মোট নারীর সংখ্যা প্রায় চার লাখ। কিন্তু এতোকিছুর পরেও নারীদের অনেক সময়ই আমরা সম্মান করতে চাই না। এখন জাতীয় সংসদের এমপি মহোদয়রাও যদি সেটা করেন বিষয়টা খুব দুঃখের। আরেকটা বিষয়। আমি মনে করি অনেক সময় নারীদের মানুষ হিসেবে সমান যোগ্য না ভেবে শুধু নারী হিসেবে দেখার কারণেও অনেক সমস্যা ঘটে। প্রশাসনে থাকা আমার এক বান্ধবীর একটা গল্প মনে পড়লো। আমাকে আফসোস করে তিনি বলেছিলেন, ডিসির চেয়ে ডিসির স্ত্রী মানে ডিসির ভাবীকে প্রটোকল দিতে দিতে সে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল।
আমি খুব অবাক হয়ে ঘটনা জানতে চেয়েছিলাম। এরপর এমন কিছু বিষয় শুনলাম যেগুলো আমাকে বিস্মিত করেছিল। উদাহরণ দিয়ে সে বলেছিল দেশের প্রত্যেকটা বিভাগ, জেলা বা উপজেলায় লেডিস ক্লাব আছে। পদাধিকার বলে বিভাগে বিভাগীয় কমিশনার, জেলায় ডিসি, উপজেলায় ইউএনওর স্ত্রী এই কমিটির সভাপতি। কোথাও কোথাও এনডিসির স্ত্রী বা নারী কর্মকর্তারা সাধারণ সম্পাদক হন। ওই বান্ধবী বলেছিল, জেলা বা উপজেলায় নানা দপ্তরের কর্মকর্তাদের স্ত্রীরা থাকলেও মূলত প্রশাসন, পুলিশ ও বিচার বিভাগের কর্মকর্তাদের স্ত্রীরা এসব লেডসি ক্লাবে প্রাধান্য পান। এইসব লেডিস ক্লাবে নারী কর্মকর্তাদের নিয়মিত হাজিরা দিতে হয়। ডিসি ভাবীর স্ত্রী সঙ্গে মিলিয়ে শাড়ি পরতে হয়। কোন কারণে ডিসি ভাবীর প্রটোকলে সমস্যা হলে নাকি ওই নারী কর্মকর্তার কপালে নানা বকা জোটে। আমার সেই বান্ধবী বলেছিল, এখন তো ব্রিটিশ আমল নয় যে সাহেবদের বউদের তোয়াজ করতে হবে। বরং একজন নারী তাঁর যোগ্যতা দিয়ে সরকারি চাকুরি পায়। তাহলে কেন তাকে পুরুষ কর্মকর্তার স্ত্রীকে এতো তোয়াজ করে চলতে হবে?

আমি আসলে সমস্যাটা কতোটা প্রকট সেটা বুঝতে পারিনি। সমস্যাটা হয়তো ব্যক্তিগত ছিল। আমার সেই মন্তব্যের জোরে আমার সেই বান্ধবী বলেছিল, প্রত্যেকটা জেলায় যে মহিলা ক্রীড়া সংস্থা আছে সেখানে সভাপতি হিসেবে আছে ডিসির স্ত্রী। তিনি চেকও নাকি সাইন করেন। কোন আইনে তিনি সেটা করেন? আর ডিসি ভাবীর পছন্দে পোশাক পরতে হবে, ডিসি ভাবী খাবার মেনু ঠিক করবেন এগুলো কেন? আর ডিসি পত্নীর কথা একজন প্রজাতেন্ত্রর কর্মকর্তাকে কেন শুনতে হবে? ডিসি হয়তো জেলার প্রধান কিন্তু স্ত্রীরা তো নয়? আর ডিসির স্ত্রীরা অন্য ক্যাডার বা অন্য কর্মকর্তাদের তুমি করে বলবেন কেন?

আমি তখন তাকে প্রশ্ন করেছিলা, সমস্যার সমাধান তাহলে কী? সে বলেছিল, ডিসি বা এসপির স্ত্রীর বদলে একজন নারী সরকারি কর্মকর্তা কেন লেডিস ক্লাবের সভাপতি হবেন না? আমার সেই বন্ধুটিকে মানুষ হিসেবে সবসময় একটা আত্মসম্মানবোধ নিয়ে বাঁচতে দেখেছি। সমস্যাটা হয়তো সে কারণেই। আমাকে সে পাল্টা প্রশ্ন করেছিল, আচ্ছা ডিসির স্ত্রী যদি লেডিস ক্লাবের সভাপতি হন তাহলে কোন জেলায় নারী ডিসি হলে তার স্বামীকে তাহলে কেন ক্লাবের সভাপতি করা হবে না? এখন যদি নারী ডিসির স্বামী হিসেবে তাকে কোন পদ দেয়া হয় তিনি কী নেবেন? আর পুরুষ কর্মকর্তারা কী সেখানে গিয়ে হাজিরা দেবেন? একজন পুরুষ সেই পদ নেবেন না। পুরুষ কর্মকর্তারাও যবেন না। বরং সেটা পুরুষত্ত্বে আঘাত করা হবে। তাহলে নারীদের বেলায় এই নিয়ম কেন? আমি তাকে কী উত্তর দেব ভেবে পাইনি। তবে তাঁর কথাগুলো আমার মাথায় ছিল। বিষয়টা বোঝার জন্য আমি বছরখানেক আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছোট বোনকে একটা প্রশ্ন করেছিলাম। তাকে হঠাৎ করে দেখি তিনি একটা শাড়ির ছবি দিয়ে বলেন, ডিসি ভাবী দিয়েছেন। আমি তাকে প্রশ্ন করি, তুমি তো বিসিএস ক্যাডার হিসেবে প্রশাসনে যোগ দিয়েছে। এই যে ডিসি ভাবী ডিসি ভাবী করছো, শাড়ি পেয়ে খুশি হচ্ছো এটা কি তোমার ব্যক্তিত্বে লাগছে না? আমার সেই ছোট বোন সেই প্রশ্নের কোন উত্তর দেয়নি। আমি তাতে বুঝতে পারিনি আসলে সে রাগ করেছিল নাকি ডিসি ভাবীর শাড়িতে খুশি হয়েছিল। শুধু প্রশাসন নয়, পুলিশেও নাকি অবস্থা একই। পদাধিকার বলে জেলায় এসপির স্ত্রী সভাপতি!

যাই হোক নানা বিষয়ে লেখার বিপদ হলো, এক বিষয় থেকে আরেক বিষয়ে চলে যাই। আমার কাছে মনে হয়, একজন সরকারি কর্মকর্তাকে নারী হিসেবে না দেখে আমাদের মানুষ হিসেবে দেখা উচিত। তাহলে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মান জানানোর জন্য নারী ইউএনওর বিকল্প খুঁজতে হবে না, আবার ডিসি ভাবীর কারণেও আত্মমর্যাদা সম্পন্ন কোন নারীকে সংকটে পড়তে হবে না! আসুন আমরা প্রত্যেকটা মানুষকে সম্মান করি, প্রাপ্য মর্যাদা দেই। ভালো থাকুক প্রতিটা মানুষ। ভালো থাকুক প্রিয় বাংলাদেশ। ফেসবুক থেকে

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত