প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

প্রবাসী নারী কর্মীদের সুরক্ষা অনিশ্চিত

নিউজ ডেস্ক: ‘এম এইচ ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল’ নামের একটি রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে গত জুলাইয়ে জর্দান পাড়ি জমান ৩৪ বছর বয়সী আকলিমা খাতুন (আসল নাম নয়)। কিন্তু চার মাসের মাথায় মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে দেশে ফেরেন তিনি। বিমানবন্দরে নামার পর তাঁর নিয়ন্ত্রণহীন চলাফেরা দেখে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর সদস্যরা তাঁকে বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাকের কাছে হস্তান্তর করেন।

‘আরেকটু ভালোভাবে বাঁচতে’ সব ছেড়ে ভিনদেশে গিয়ে সব হারিয়ে যাঁরা ফেরেন, তাঁদের তালিকাটা অনেক দীর্ঘ। এসব নারী দেশে ফিরেও নির্যাতন থেকে রেহাই পান না। অনেকে অন্তঃসত্ত্বা হয়ে কিংবা সন্তান নিয়ে দেশে ফেরায় পরিবার ও সমাজ তাঁদের মেনে নিতে চায় না। এই আশঙ্কায় অনেক নারী দেশে ফিরে সন্তানকে কোনো আশ্রয়কেন্দ্রে রেখে বাড়ি ফেরেন।
বেসরকারি সংস্থা ‘ব্র্যাক’ ও ‘বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজ’ (বিলস)-এর তথ্যানুযায়ী, গত পাঁচ বছরে পাঁচ শতাধিক নারী শ্রমিকের মরদেহ দেশে এসেছে। এর মধ্যে দুই শতাধিক মরদেহ এসেছে সৌদি আরব থেকে।

ব্র্যাকের তথ্য মতে, ১৯৯১ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত ১০ লাখ নারী বিদেশে পাড়ি জমিয়েছেন। নির্যাতনে মানসিক ভারসাম্য হারানো ও পঙ্গু হওয়া নারীর সংখ্যা হাজারের বেশি। করোনা মহামারির কারণে সীমিত বিমান চলাচল করলেও ৭৭ জন নারী কর্মীর মরদেহ দেশে ফিরেছে। আগের বছর এসেছে ১৩৯ জনের মরদেহ।

৪৮৭ জন নারীর মৃত্যুর কারণ অনুসন্ধান করেছে ব্র্যাক। তাতে দেখা গেছে, আত্মহত্যায় মৃত্যু হয়েছে ৮৬ জনের। স্ট্রোকে মারা গেছেন ১৬৭ জন। এ ছাড়া দুর্ঘটনায় ৭১ জন এবং খুন হয়েছেন দুজন। অন্যান্য কারণে মারা গেছেন ৪৬ জন। স্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছে ১১৫ জনের।

৪৮৭ মরদেহের মধ্যে সৌদি আরব থেকে ১৯৮, জর্দান থেকে ৮৮, লেবানন থেকে ৭১, ওমান থেকে ৫৩, সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে ৩৯ জনের মরদেহ এসেছে।

ব্র্যাকের অভিবাসন কর্মসূচির প্রধান শরিফুল হাসান জানান, সম্প্রতি সৌদি আরব থেকে পাঁচজন নারী অন্তঃসত্ত্বা হয়ে দেশে ফিরেছেন। আর ওমান থেকে সন্তান নিয়ে ফিরেছেন দুইজন নারী শ্রমিক। তাঁদের প্রায় সবাই দেশে ফিরে পরিবার ও সমাজে হেয়প্রতিপন্ন হন।

চার মাসের এক মেয়ে সন্তান নিয়ে গত ২৪ ফেব্রুয়ারি ওমান থেকে দেশে ফিরতে বাধ্য হন কমলা (আসল নাম নয়)। তিনি আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জানান, তাঁর সন্তানের বাবা ওমানের নাগরিক। যৌন নির্যাতনের এক পর্যায়ে অন্তঃস্বত্বা হয়ে পড়লে তাঁকে ওমান পুলিশে তুলে দেওয়া হয়। এরপর ‘ওমান ডিপোর্টেশন ক্যাম্পে’ তিনি সন্তান প্রসব করেন। সেখান থেকেই তাঁকে দেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে। কমলা বর্তমানে মানসিকভাবে অসুস্থ। ২০১৮ সালে ‘এম এইচ ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল’-এর মাধ্যমে ওমান গিয়েছিলেন তিনি। কমলার বাড়ি লক্ষ্মীপুর।

গত সপ্তাহে ছয় মাসের এক সন্তান নিয়ে সৌদি আরব থেকে দেশে ফেরেন ৩২ বছরের এক নারী। সন্তানের বাবা সৌদি আরবের এক নাগরিক। দেশে ফেরার পর ওই নারী সন্তানকে একটি আশ্রয়কেন্দ্রে রেখে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় গ্রামের বাড়ি ফিরে যান। তাঁর আশঙ্কা, সন্তানকে বাড়ির লোকজন কিংবা সমাজ মেনে নেবে না।

বিশ্লেষকরা বলছেন, নারী কর্মী না পাঠালে পুরুষ কর্মী নেওয়া হবে না—নিয়োগদাতা দেশের এমন অলিখিত শর্তের কারণে রিক্রুটিং এজেন্সি নারী কর্মী পাঠাতে বাধ্য হয়। নারী অভিবাসনকে গতিশীল করতে সরকারের পক্ষ থেকে নেওয়া হয়েছে নানা উদ্যোগ। তৈরি হয়েছে নানা নীতিমালা। কিন্তু নীতিমালা তৈরি পর্যন্তই থেমে আছে দায়িত্ব। বাস্তবে নীতিমালার প্রয়োগ নেই। আর সব দায় রিক্রুটিং এজেন্সির ওপর চাপানোর চেষ্টা করে সরকার।

বিদেশে নারী কর্মীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ২০১৯ সালে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় ১২টি নির্দেশনা দেয়। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, এই নির্দেশনা মানা হলে নারী কর্মীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব ছিল। কিন্তু প্রয়োগ নেই। নির্দেশনায় বিদেশে পাঠানোর আগে প্রশিক্ষণ ও স্বাস্থ্য পরীক্ষার ওপর জোর দেওয়ার কথা বলা হলেও বাস্তবে তা দেখা যায় না। ৩০ দিনের জায়গায় দেওয়া হয় ১৫ দিনের প্রশিক্ষণ। নারী কর্মীদের মোবাইল ফোনের ব্যবস্থা করার কথা বলা হলেও তাঁরা সেই সুবিধা পাচ্ছেন না।

বিএনএসকের নির্বাহী পরিচালক সুমাইয়া ইসলাম বলেন, ‘অন্তঃসত্ত্বা হয়ে যাঁরা ফিরছেন, তাঁদের প্রতি রাষ্ট্র উদাসীন। বেসরকারি সংস্থাগুলো তাঁদের পাশে থাকার চেষ্টা করছে। আমার অনুমান, বিদেশ থেকে যাঁরা ফেরেন, তাঁদের ৮০ শতাংশই সংসার টেকাতে পারেন না।’

বাংলাদেশ অভিবাসী মহিলা শ্রমিক অ্যাসোসিয়েশনের (বমসা) নির্বাহী পরিচালক ফরিদা ইয়াসমিন বলেন, ‘প্রশিক্ষণের ঘাটতি একটা বড় সমস্যা। প্রবাসের পরিবেশ, সংস্কৃতি, আইন, শিষ্টাচার—এগুলো নিয়ে তেমন কিছু শেখানো হয় না। এমন অনেক কিছুই আছে যেটা বাংলাদেশে বৈধ, অন্য দেশে অবৈধ। এখানে একটি সমন্বিত গবেষণা প্রয়োজন। ভুক্তভোগীদের সঙ্গে কথা বলেই জানতে হবে কী কী সমস্যার মুখে তাঁরা পড়েছেন।’

প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করা শর্তে বলেন, ‘অনেক সময় সৌদিতে আমরা নির্যাতনের অভিযোগ পাই। কিন্তু রিক্রুটিং এজেন্সির প্রতিনিধি তো দূরের কথা, দূতাবাসের কর্মকর্তারাও ঘটনাস্থলে যাওয়ার অনুমতি পান না। যৌন নির্যাতনের অভিযোগ পেলে সেখানে হাসপাতালে গিয়ে রিপোর্ট সংগ্রহ করতে হয়। অন্তঃসত্ত্বা যাঁরা হন, তাঁদের ওখানে সেফ হোমে থেকে আইনি লড়াই করতে হয়। সেটা অনেক সময় এক বছরও লেগে যায়। এত দীর্ঘ সময় তাঁরা থাকতে চান না। এমন অনেক পরিস্থিতি আছে যেগুলোর কারণে সরকার চাইলেও তাঁদের সাহায্য মেলে না।’

সূত্র: কালের কণ্ঠ

 

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত