প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

খাজা রহমান: সৃজনশীল শিক্ষার কয়েকটি উদাহরণ!

খাজা রহমান: পঞ্চম শ্রেণীর বাচ্চাদের ‘শিল্প-সংস্কৃতি’ বিষয়ের টিচার একটা অ্যানিমেশন ফিল্মের লিঙ্ক দিয়ে বাড়ি থেকে দেখে আসতে বলেছে, যেহেতু মহামারিতে সিনেমাহল বন্ধ বলে যাওয়া সম্ভব না! ১২ বছর বয়সী দুই বন্ধুর একজনের পোষা কুকুর আরেকজনের কাছে রেখে দুই জার্মান পার্টে আলাদা হয়ে যাওয়া এবং বার্লিন-ওয়াল পতনের মাধ্যমে আবার তাদের মিল হবার ঐতিহাসিক পটভূমিতে তৈরি ছবিটি অনেকগুলো আন্তর্জাতিক পুরস্কারপ্রাপ্ত।

পরেরদিন ক্লাসে গিয়ে সারপ্রাইজ! ফিল্মের ডিরেক্টর স্বয়ং অনলাইনে যোগ দিয়েছে বাচ্চাদের সাথে! এরপর ছোট ছোট ক্লিপ দেখিয়ে পরিচালক সেই ছবিটি তৈরির ইতিহাস বলেছে, অ্যানিমেশন ফিল্ম কিভাবে তৈরি করা হয় দেখিয়েছে এবং বাচ্চাদের প্রশ্নের উত্তর দিয়েছে। সবশেষে টিচার ছোট্ট একটা টেস্ট নিয়ে ক্লাস শেষ করেছে। এরপর থেকে আমার ছেলে বায়না ধরেছে সেও অ্যানিমেশন ফিল্ম বানাবে!

জার্মান গ্রামার (অনেকটা বাংলা ২য় পত্রের মতো) ক্লাস টিচার একটা কাগজ দিয়েছে যাতে একটা গল্প লেখা, “একটা মেয়ে সন্ধ্যায় বাইরে থেকে এসে দরজার তালা খুলে বাড়িতে ঢুকলো, লাইট জ্বালালো, জানালার পর্দা নামালো, বাড়িতে সে একাই থাকে। হঠাৎ সে বুঝতে পারলো তার ঠিক পিছনেই কেউ একজন, পায়ের শব্দও স্পষ্ট, কিন্তু ভয়ে মেয়েটি পিছনে তাকাতে পারছে না! মেয়েটি রান্নাঘরে গেল, ইলেকট্রিক চুলা অন করলো, তার ঘাড়ের কাছে এসে পড়েছে কেউ, নিঃশ্বাস পড়ছে!! সাহস করে পিছনে তাকাতেই……(এরপর আর নেই)…

……গল্পের পরের অংশটি লিখতে হবে বাচ্চাদেরকে। যার যা ইচ্ছেমতো লিখে গল্পটি শেষ করে ক্লাসে গিয়ে পড়ে শোনাতে হবে। মজার ব্যাপার, ক্লাসের ২৮ জনই বিভিন্নভাবে গল্পটি শেষ করেছে! কেউ লিখেছে মেয়েটির পিছনে সত্যিকারের ভুত ছিল, মেয়েটি অজ্ঞান হয়ে ঐখানেই পড়ে ছিল, মেয়েটির পোষা কুকুর ছিল পিছনে, অন্য শহরে থাকা মেয়েটির মা আগেই ঘরে এসে লুকিয়ে ছিল, কেউ লিখেছে মেয়েটি পুরোটাই স্বপ্ন দেখছিল!!
টিচার শুধু দেখেছে কার কল্পনাশক্তি, লেখনিশক্তি কতোটুকু, বাক্যগঠন-ব্যাকরণ সঠিক হচ্ছে কি না! এর আগে দিয়েছিল একটা জঙ্গলের ছবি যেখানে প্রাণীরা বসে মিটিং করছে। সেই ছবি দেখে একটি গল্প এবং একটি ছড়া লিখে আনতে হবে।

ইংলিশ ল্যাঙ্গুয়েজ এবং এথিকস ক্লাস:
ম্যাডামের সামনে ১০ টি ইংরেজি বাক্য গঠন করে মুখে বলতে হবে যাতে বাক্যগুলোতে “পোলাইট-নেস বা ভদ্রতা” প্রকাশ পায়। যেমন, কিছু চাইতে গেলে ‘প্লিজ’ বলা, অনিচ্ছাকৃত কারো গায়ে হাত লাগলে ‘এক্সকিউজ মি’ বা স্যরি’ বলা, কাউকে সাহায্য করার আগে তার অনুমতি নেয়া!
এথিকস বা নৈতিক শিক্ষা ও মানবিক আচরণবিধির পাঠ যেমন, কাউকে গাড়ির দরজা খুলে দেয়া, পিছন পিছন কেউ দরজা দিয়ে ঢুকলে তার জন্য দরজা ধরে রাখা বা হাসিমুখে তাকে আগে ঢুকতে দেয়া, বয়ষ্ক কেউ বাসে উঠলে বা রাস্তায় কেউ এক্সিডেন্ট করে পড়ে থাকলে করনীয়, পৃথিবীতে কয়টি ধর্ম, কোন ধর্মের অনুসারীদেরকে কিভাবে সম্বোধন-সন্মান করতে হবে, তাদের কালচার-খাদ্যাভ্যাস কি, সবকিছুই ছবি দিয়ে বর্ণনা করা আছে বইয়ে। যেভাবে ওদেরকে শেখায়, রাস্তাঘাটে সেভাবেই প্রয়োগও করতে শেখে।

হোম-অফিসের ফাঁকে আমার ছেলের গৃহশিক্ষকের ভূমিকা পালন করতে হয় বলে খুব কাছে থেকে ওদের পাঠ্যক্রমগুলো দেখছি, শিখছি আর মুগ্ধ হচ্ছি।

স্কুলজীবনে আমরা স্বপ্নেও কোনোদিন ভাবিনি যে স্কুল থেকে সিনেমাহলে মীনা-কার্টুন, মাটির ময়না বা মুক্তির গান ফিল্ম দেখাতে নিয়ে যাবে অথবা দেখে এসে স্বয়ং পরিচালকের কাছ থেকে ছবি বানানোর কাহিনী শুনবো!

“প্রত্যুপকার গল্পের সাদৃশ্য ও স্বাতন্ত্র্য” মুখস্থ লিখে নাম্বার পাওয়ার ফলে আর কোনো “প্রত্যুপকার” গল্পও রচিত হয়নি, আরেকজন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর বা কবি নজরুলের জন্মও হয়নি বঙ্গদেশে। কল্পনাপ্রবণ মানুষ লিখতে লিখতেই তো একদিন লেখক, কবি, সাহিত্যিক, সাংবাদিক হবে, শুদ্ধভাবে লিখতে শিখবে!!

“ডাক্তার আসিবার পূর্বেই/পরেই রোগীটি মারা গেলো” ট্রান্সলেশন মুখস্থ করে আমরা শুধু ডাক্তার পিটানোই শিখেছি। “গনি মিয়াঁ একজন গরীব চাষির” সেই গনি মিয়ারা হয়তো এখন আর গরীব নেই কিন্তু তাদেরকে শেখানো হয়নি কোনো এথিকস, ভদ্রতা, নম্রতা, শিষ্টাচার, মানবিকতা। কোটি কোটি মানুষের দেশে শুধুই অপরাধ আর অনাচার!!! কেন??

তৃতীয়/চতুর্থ প্রজন্মের যারা শিক্ষক বা রাষ্ট্রের নীতি নির্ধারক হবেন একদিন, শুধুমাত্র তাদের জন্যই লিখলাম। আজকের শিশুটিই ২০ বছর পরের বাংলাদেশ। আপনি যেভাবে দেখতে চান তারাও সেভাবেই তৈরি হবে।

বি.দ্রঃ করোনাকালেও এখানে স্কুল বন্ধ থাকেনি! মাঝে শুধু কয়েকটা সপ্তাহ ব্রেক ছিল, তখন অনলাইনে ক্লাস চলেছে। ক্লাসে উপস্থিত সবার সবসময় মাস্ক পরে থাকা বাধ্যতামূলক, কিছুদিন থেকে শুরু হয়েছে করোনার র্যাপিড টেস্ট! টেবিলে বসে ওরা নিজেরাই টেস্ট-কিট দিয়ে টেস্ট করে টিচারকে টেস্ট-রেজাল্ট দেখিয়ে ক্লাস শুরু করে, সপ্তাহে অন্তত ২ বার!

যাদের হাতে আপনি ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রকে দিয়ে যাবেন, তাদেরকে তো গোমূর্খ করে ফেলে রাখা যাবে না! একদিন ঝড় থেমে যাবে, যুদ্ধ থেমে যাবে, পৃথিবী আবার সুস্থ হয়ে উঠবে, কিন্তু একটা প্রজন্ম অকেজো আর অকর্মণ্য হয়ে পড়লে সেই অসুস্থতা কি কোনো ভ্যাকসিনে দুর হবে?
জার্মান প্রবাসী লেখকের ফেইসবুক পোষ্ট থেকে সংগৃহিত।

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত