প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

রফি হক: একটি নতুন পেইন্টিংয়ের বীজ!

রফি হক: একটা বয়স ছিলো- সতেরো, আঠারো, ঊনিশ- কী অস্থির ছিলাম! কেবল ঢাকাতে থিতু হতে চেষ্টা করছি। ক্লাসে মন দিতে চেষ্টা করছি। কিন্তু মন বড় চঞ্চল। মন ভালো লাগছে না ক্লাস থেকে বেরিয়ে ইকো আর আমি বেইলি রোডে চলে যাই ‘প্রিন্স’ নামে একটি কনফেকশনারী হয়েছে সেখানে। আমার খুব প্রিয় ছিলো চিকেন প্যাটিস আর কোকাকোলা। কোমর বাঁকানো কাঁচের বোতলের কর্ক খুলে বোতলটি মুখে লাগিয়ে এক নিঃশ্বাসে ঢক্ ঢক্ করে খেয়ে ফেলতাম। পর পর দুটি কোক খেতাম। কী প্রশান্তি! আহ্! বেইলি রোডের দুপুরগুলো নির্জন থাকতো।  তখন ঢাকাতে তেমন আধুনিক কনফেকশনারী ছিলো না। একটি কলাবাগানে ছিল ‘সোরেন্টো’। সোরেন্টোর মালিক ছিলেন এক জার্মান ভদ্রলোক । সেরেন্টোর ফ্রুট টার্ট, প্যাটিস অতুলনীয় ছিলো। আমি কনফেকশনারীতে আজ পর্যন্ত বার্গার খাইনি। খেতে ইচ্ছেও করেনি। কেন জানি রুচি হতো না। প্রেমিক প্রেমিকাদের নিরিবিলি কোনো বসার জায়গা ছিলো না। এদিক সেদিক কোনো কফি হাউজ টাউজও ছিলো না। শাহবাগে সিনোরিটা, মৌলি, কোহিনূর ছিলো। সে তো লোকে ঠাসা থাকতো। শাহাবাগ থেকে ফার্মগেট পেরুলেই শহর পাতলা হতে থাকতো। জাহাঙ্গীর গেট পার হয়ে কাকলী, বনানী, ডিওএচএস, ঢাকা গেট তার পর ঢাকা শেষ!

এই সময়টা আমার চাঁদের হাটের সময়। প্রতিদিন পড়তাম। আর্ট কলেজের লাইব্রেরিতে। আর্ট কলেজের লাইব্রেরিতে তখন হাতে গোনা কয়েকজন ছাত্র পড়ালেখা করতো। তবে আর্ট সংক্রান্ত বইপত্র ছাড়াও লাইব্রেরিতে ছিলো প্রচুর কবিতা, গল্প, ছড়ার বই। একমাত্র আমিই বোধহয় সেই বইগুলোর পাঠক ছিলাম। রোজ অন্তত একটা ভালো লাইন পড়তে না পারলে মন খারাপ হতো। বৃথা মনে হতো দিনটা। কবিতার লাইনগুলো গুন্গুন্ করতো রক্তের মধ্যে সারাক্ষণ। মিশে থাকতো আমার অনুভবে। কোনো প্রেমে পড়িনি তখনে। কিন্তু প্রেমের ভালো লাগাটা ছুঁয়ে যেতো। মনে মনে অনুভব করতাম, আনন্দ হতো, কষ্টও হতো। একজন আর্মি অফিসারের কন্যা দুপুর গড়িয়ে গেলে আমাকে নিয়ম করে টেলিফোন করতো, অফিসে। সে কখনও ‘ভালোবাসি’ এই কথাটি বলেনি। ওই বিশেষ শব্দটি আমি খুব শুনতে চেয়েছিলাম তার কাছ থেকে, আর ভাবতাম একবার অন্তত বলুক। তবু তার সঙ্গে কথা বলতে বলতে তাকে না ছুঁয়েও, দূরে থেকেও তার কতো কাছে যাওয়া যায় তার একটি চিত্রকল্প তৈরি করতাম মনে মনে। এই সূক্ষ্ম কল্পনার খেলাটি খেলতে খেলতে তাকে বোঝাতাম জীবনানন্দের কবিতা। কবিতা কি নিজেও বুঝতাম? কবিতা বোঝানোটা একটা ছল ছিলো মাত্র। কথার পর কথা সাজিয়ে যেতো মেয়েটি।

মুগ্ধ হয়ে শুনতাম ওর কণ্ঠ। অভিমান হলে নীরবতা বয়ে যেতো পেচানো তারের ভেতরে দিয়ে। তখনকার টিএন্ডটি ফোনগুলো খুব নিরীহ ছিলো। সেই অল্প বয়সে অভিমানের নীরবতা ছিলো বর্ষার দোপাটির মতো নরম অথচ সতেজ। সেই মধুর কষ্ট আমি বয়ে নিয়ে আসতাম হোস্টেলের নিঃসঙ্গ শয্যায়, ঘুম ভেঙে যাওয়া শেষ রাত্রে, বালিশে মুখ গুঁজে ভাববার জন্যে, কষ্ট নিয়ে খেলা করবার জন্য, ছবি আঁকবার জন্য। এ যেন ক্যানভাসে ছবি চাপানোর আগে ঘোর আচ্ছন্ন কোনো মুহূর্ত! কিন্তু সেই অর্থহীন ভাবনার ভেতর দিয়েই কখনো কখনো বেরিয়ে আসতো মূল ভাবনার স্ফূরণ। একটি নতুন পেইন্টিংয়ের বীজ! ফেসবুক থেকে

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত