প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

দশ হাজার ব্যক্তি অপ্রদর্শিত অর্থ বৈধ করার সুযোগ নিয়েছেন

বণিক বার্তা: চলতি ২০২০-২১ অর্থবছরের বাজেটে অপ্রদর্শিত অর্থ বৈধর পরিধি আগের তুলনায় অনেক বিস্তৃত করা হয়েছে। এপ্রিল পর্যন্ত এর সুযোগ নিয়েছেন ১০ হাজারের বেশি করদাতা। জমি, ভবন ও অ্যাপার্টমেন্টের পাশাপাশি নগদ অর্থ, ব্যাংকে সঞ্চিত অর্থ, সঞ্চয়পত্র, বন্ড ও পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের মাধ্যমে অপ্রদর্শিত অর্থ বৈধ করেছেন তারা। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) পরিসংখ্যান বলছে, অন্যান্য খাতের তুলনায় নগদ অর্থ বৈধ করার প্রবণতাই বেশি।

জানা গেছে, ১০ শতাংশ কর দিয়ে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের বিপরীতে অর্থ বৈধ করেছেন দুই শতাধিক করদাতা। এ খাতে ২৬০ কোটি টাকা বৈধ করার বিপরীতে এনবিআর ২৬ কোটি টাকা কর পেয়েছে। জমি কেনার মাধ্যমে দেড় হাজারের বেশি করদাতা অপ্রদর্শিত অর্থ বৈধ করেছেন। এ খাতে তারা কর দিয়েছেন ১২৪ কোটি টাকা। অ্যাপার্টমেন্ট কিনে অর্থ বৈধ করেছেন ২ হাজার ৬০০ করদাতা। এ বাবদ তারা সরকারকে ১২২ কোটি টাকা কর দিয়েছেন। নগদ অর্থ, ব্যাংক আমানত ও অন্যান্য আর্থিক স্কিমে বিনিয়োগের মাধ্যমে অপ্রদর্শিত অর্থ বৈধ করেছেন ছয় হাজারেরও বেশি করদাতা। এ বাবদ সরকার ১ হাজার ১০০ কোটি টাকার বেশি কর পেয়েছে। সে হিসাবে এ খাতে বৈধ হয়েছে ১১ হাজার কোটি টাকারও বেশি। এটি এনবিআরের বিভিন্ন কর অঞ্চল থেকে পাওয়া খসড়া হিসাব। চূড়ান্ত হিসাবে করদাতার সংখ্যা আরো বাড়তে পারে বলে জানিয়েছেন সংস্থাটির কর্মকর্তারা।

এ বিষয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক অর্থ উপদেষ্টা ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, ব্যাংকে আমানত কিংবা সঞ্চয় স্কিমে নগদ অর্থ বিনিয়োগের মাধ্যমে অপ্রদর্শিত অর্থ বৈধ করার বিষয়টি তুলনামূলক সহজ হওয়ার কারণেই কিন্তু করদাতারা এর সুযোগ নিয়েছেন সবচেয়ে বেশি। তবে আমি অপ্রদর্শিত অর্থ বৈধ করার অবারিত সুযোগ রাখার পক্ষপাতী নই। কারণ সাধারণ করদাতাদের জন্য করহার ২৫ শতাংশ। অন্যদিকে যারা কর ফাঁকি দিচ্ছেন, তাদের জন্য ১০ শতাংশ কর দিয়ে বৈধ করার সুযোগ দেয়া হচ্ছে। এটি এক ধরনের বৈষম্য। তাছাড়া সহজে অপ্রদর্শিত অর্থ বৈধ করার সুযোগ দেয়া হলে এতে অনিয়ম-দুর্নীতির মাধ্যমে অর্থ উপার্জনের বিষয়টি প্রকারান্তরে উৎসাহিত করা হয়।

জমি কেনার মাধ্যমে অপ্রদর্শিত অর্থ বৈধ করার বিষয়ে চলতি অর্থবছরের বাজেটে বলা হয়, এলাকাভেদে প্রতি বর্গমিটারের জন্য নির্ধারিত কর পরিশোধ সাপেক্ষে অপ্রদর্শিত অর্থ বৈধ করা যাবে। এক্ষেত্রে রাজধানীর গুলশান, বনানী, বারিধারা, মতিঝিল ও দিলকুশা বাণিজ্যিক এলাকায় প্রতি বর্গমিটার জমির জন্য ২০ হাজার টাকা কর দিতে হবে। ধানমন্ডি আবাসিক এলাকা, ডিওএইচএস, মহাখালী, লালমাটিয়া হাউজিং সোসাইটি, উত্তরা মডেল টাউন, বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা, ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট, সিদ্ধেশ্বরী, কারওয়ান বাজার, বিজয়নগর, ওয়ারী, সেগুনবাগিচা, নিকুঞ্জ, চট্টগ্রামের পাঁচলাইশ, খুলশী, আগ্রাবাদ ও নাসিরাবাদ এলাকার জন্য করের পরিমাণ ১৫ হাজার ৫০০ টাকা। অন্য সিটি করপোরেশন এলাকার জমির ক্ষেত্রে প্রতি বর্গমিটার ৫ হাজার টাকা, জেলা শহরের পৌরসভা এলাকায় ১ হাজার ৫০০ ও অন্য এলাকার জন্য ৫০০ টাকা হারে বাড়তি কর দিতে হবে।

অপ্রদর্শিত অর্থ বৈধ করতে অ্যাপার্টমেন্ট কেনার ক্ষেত্রেও এলাকাভেদে করের পরিমাণ ভিন্ন। এক্ষেত্রে গুলশান মডেল টাউন, বনানী, বারিধারা, মতিঝিল ও দিলকুশা বাণিজ্যিক এলাকায় ২০০ বর্গমিটারের কম আয়তনের ফ্ল্যাটের ক্ষেত্রে প্রতি বর্গমিটারের জন্য ৪ হাজার টাকা। ফ্ল্যাটের আয়তন এর বেশি হলে প্রতি বর্গমিটারের জন্য ৬ হাজার টাকা। ধানমন্ডি আবাসিক এলাকা, ডিওএইচএস, মহাখালী, লালমাটিয়া হাউজিং সোসাইটি, উত্তরা মডেল টাউন, বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা, ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট, সিদ্ধেশ্বরী, কারওয়ান বাজার, বনশ্রী, বিজয়নগর, ওয়ারী, সেগুনবাগিচা, নিকুঞ্জ, চট্টগ্রামের পাঁচলাইশ, খুলশী, আগ্রাবাদ ও নাসিরাবাদ এলাকায় ২০০ বর্গমিটারের কম আয়তনের ফ্ল্যাটের ক্ষেত্রে প্রতি বর্গমিটারের জন্য ৩ হাজার টাকা এবং এর চেয়ে বেশি আয়তনের ফ্ল্যাটের জন্য সাড়ে ৩ হাজার টাকা। আর ঢাকা সিটি করপোরেশনের অন্য সব এলাকা ও অন্যান্য সিটি করপোরেশনে ১২০ বর্গমিটার ফ্ল্যাটের ক্ষেত্রে প্রতি বর্গমিটারের জন্য ৭০০ টাকা, ১২০ থেকে ২০০ বর্গমিটারের ফ্ল্যাটের ক্ষেত্রে ৮৫০ টাকা ও ২০০ বর্গমিটারের চেয়ে বেশি আয়তনের ফ্ল্যাটের জন্য ১ হাজার ৩০০ টাকা কর দিতে হবে। এছাড়া জেলা শহরের পৌরসভা এলাকায় একই আয়তনবিশিষ্ট ফ্ল্যাটের জন্য প্রতি বর্গমিটারে যথাক্রমে ৩০০, ৪৫০ ও ৬০০ টাকা এবং দেশের অন্য সব এলাকার ক্ষেত্রে একই আয়তনের ফ্ল্যাটের জন্য ২০০, ৩০০ ও ৫০০ টাকা কর ধার্য রয়েছে।

পুঁজিবাজারে সিকিউরিটিজে বিনিয়োগের মাধ্যমে অপ্রদর্শিত অর্থ বৈধ করার সুযোগের বিষয়ে বাজেটে বলা হয়েছে, ১০ শতাংশ কর পরিশোধ করে পুঁজিবাজারে তিন বছরের জন্য এ অর্থ বিনিয়োগ করা হলে আয়কর কর্তৃপক্ষসহ সরকারের অন্য কোনো কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে কোনো প্রশ্ন করতে পারবে না। গত বছরের ১ জুলাই থেকে চলতি বছরের ৩০ জুন পর্যন্ত ব্যক্তিশ্রেণীর করদাতারা পুঁজিবাজারে অপ্রদর্শিত অর্থ বিনিয়োগের সুযোগ পাবেন। এক্ষেত্রে স্টক, শেয়ার, মিউচুয়াল ফান্ডের ইউনিট, বন্ড, ডিবেঞ্চার, সরকারি বন্ড ও সিকিউরিটিজ এবং বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) অনুমোদিত অন্য যেকোনো সিকিউরিটিজে বিনিয়োগ করা যাবে। অবশ্য বাজারসংশ্লিষ্টদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে অপ্রদর্শিত অর্থ পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের সময়সীমা তিন থেকে কমিয়ে এক বছর করা হয়।

পুঁজিবাজারে অপ্রদর্শিত অর্থ বিনিয়োগের সুযোগ দেয়ার জন্য গত বছরের বাজেট প্রস্তাবে বিষয়টি উত্থাপন করেছিল মার্চেন্ট ব্যাংকগুলোর সংগঠন বাংলাদেশ মার্চেন্ট ব্যাংকার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিএমবিএ)। আগামী অর্থবছরের বাজেটেও অপ্রদর্শিত অর্থ পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের মাধ্যমে বৈধ করার সুযোগ অব্যাহত রাখার দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি। চলতি অর্থবছরে

পুঁজিবাজারে খুব বেশি পরিমাণ অর্থ না আসার বিষয়ে জানতে চাইলে বিএমবিএর প্রেসিডেন্ট মো. ছায়েদুর রহমান বলেন, জমি কিংবা অ্যাপার্টমেন্টের জন্য বিভিন্ন ধরনের কাগজপত্র জমা দিতে হয়। পুঁজিবাজারের ক্ষেত্রেও কাগজপত্রের পাশাপাশি এক বছরের জন্য বিনিয়োগ রাখতে হবে। অন্যদিকে নগদ অর্থ কিংবা ব্যাংক আমানতের ক্ষেত্রে কাগজপত্রের আনুষ্ঠানিকতা নেই বললেই চলে। ফলে যাদের কাছে অপ্রদর্শিত অর্থ রয়েছে তাদের জন্য এটিই সহজ এবং তারা এর সুযোগই বেশি নিয়েছেন। এজন্যই আমরা শুধু পুঁজিবাজারে অপ্রদর্শিত অর্থ বিনিয়োগের সুযোগ রাখার দাবি জানিয়েছিলাম।

বাজেটে নগদ অর্থ, ব্যাংক আমানত, আর্থিক স্কিম ও ইনস্ট্রুমেন্ট, সব ধরনের আমানত ও সঞ্চয়ী আমানত এবং সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগের মাধ্যমে অপ্রদর্শিত অর্থ বৈধ করার সুযোগ রাখা হয়েছে। এক্ষেত্রে বিনিয়োগকৃত অর্থের ওপর ১০ শতাংশ হারে কর প্রদান সাপেক্ষে অপ্রদর্শিত অর্থ বৈধ করার সুযোগ দেয়া হয়েছে বাজেটে। এক্ষেত্রেও আয়কর কর্তৃপক্ষসহ সরকারের অন্য কোনো কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে কোনো প্রশ্ন করতে পারবে না।

পরিসংখ্যান প্রমাণ করছে, ব্যবসায়ীদের কাছে অপ্রদর্শিত অর্থ নেই। কারণ ব্যবসায়ীরা অনুৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ করার আগ্রহ রাখেন না এমন দাবি জানিয়ে ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এফবিসিসিআই) সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট মোস্তফা আজাদ চৌধুরী বাবু বলেন, সরকারের উচিত শুধু শিল্প বা উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে অপ্রদর্শিত অর্থ বৈধ করার সুযোগ রাখা। এতে অনেক ধরনের শিল্প প্রতিষ্ঠা পেয়ে সৃষ্টি হবে কর্মসংস্থান। পাশাপাশি গড়ে উঠবে অবকাঠামো, জনপদ।

এসব খাতের বাইরে বর্তমানে অর্থনৈতিক অঞ্চল ও হাই-টেক পার্কে শিল্প স্থাপনে বিনিয়োগ করা অর্থের ওপর ১০ শতাংশ হারে কর দিলেই বিনিয়োগ করা অর্থের উৎস নিয়ে আয়কর প্রশাসন প্রশ্ন করবে না, এমন বিধান রয়েছে। ২০২৪ সাল পর্যন্ত এ সুযোগ বহাল রেখেছে সরকার। সম্প্রতি অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল জানিয়েছেন, যতদিন অপ্রদর্শিত অর্থ থাকবে ততদিন পর্যন্ত সেটি বৈধ করার সুযোগ দেয়া হবে। আসন্ন বাজেটেও এ সুবিধা থাকবে বলে জানান তিনি। অবশ্য ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) পক্ষ থেকে ২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেটে কালো টাকা বৈধ করার দুর্নীতি সহায়ক, বৈষম্যমূলক ও অসাংবিধানিক সুযোগ না রাখার আহ্বান জানানো হয়েছে।

বছরের পর বছর ধরে অপ্রদর্শিত অর্থ বৈধ করার সুযোগ দেয়ার বিষয়টি নৈতিকভাবে সমর্থনযোগ্য নয় বলে মনে করেন এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আবদুল মজিদ। তিনি বলেন, একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দিয়ে বলতে হবে, এ সময়ের মধ্যে অপ্রদর্শিত অর্থ বৈধ করা না হলে ব্যবস্থা নেয়া হবে। অপ্রদর্শিত অর্থ বৈধ করার বিষয়ে নমনীয় নয় বরং কঠোর অবস্থান নিতে হবে। তাহলে যাদের কাছে অপ্রদর্শিত অর্থ রয়েছে তারা এটি বৈধ করতে বাধ্য হবেন। তাছাড়া উৎপাদনশীল খাত যেখানে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে, স্বাস্থ্য খাত কিংবা জলবায়ু পরিবর্তনজনিত প্রভাব মোকাবেলা সংক্রান্ত প্রকল্পে অপ্রদর্শিত অর্থ বিনিয়োগের সুযোগ দেয়া হলেও সেটি অধিকতর কার্যকর হবে। সাধারণ করদাতারা যে হারে কর দেন, তার চেয়ে কম হারে অপ্রদর্শিত অর্থ বৈধ করার সুযোগ দেয়া একেবারেই অনৈতিক। এতে সৎ করদাতারাও কর দিতে নিরুৎসাহিত হবেন।

সর্বাধিক পঠিত