প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

ইতিকাফ কী এবং কেন

মুহাম্মদ মিজানুর রহমান: আল্লাহর নৈকট্য লাভের সাধনায় বান্দা আল্লাহর ধ্যানে মগ্ন হয়। সে সাধনা তাঁকে আপন করে পাবার আশায়। পরম একাগ্রতার সাথে। সে দুনিয়ার সবকিছু থেকে নিজেকে পৃথক করে নেয়। একমাত্র আল্লাহর ইবাদতে নিজেকে সোঁপে দেয়। একজন মানুষ যখন বিশেষ কোনো নিয়তে আল্লাহর আনুগত্য করার মানসিকতা নিয়ে মসজিদ অবস্থান করে তার এই অবস্থানকে ইতিকাফ বলে। প্রিয়নবি সা: প্রতি বছর রমজানে মাসে ইতিকাফ করতেন। ব্যস্ততা বা অন্য কোনো কারণে তিনি কখনো ইতিকাফ ছেড়ে দেননি। মদিনায় অবস্থাকালেও কখনো এর ব্যতিক্রম হয়নি। হজরত ইবনে উমার রা: থেকে এক হাদিসে বর্ণিত হয়েছে,‘রাসূল সা: রমজানের শেষ দশকে ইতিকাফ করতেন।’ (মুসলিম, হাদিস : ১১৭১)।

নাজাতের শেষ দশকে ইতিকাফের গুরুত্ব অনেক। ইতিকাফ যে শুধু নবীজি সা: একা করেছেন তা নয়, সাহাবায়ে আজমাইন রা: করতেন। নবি পত্নী হজরত আয়েশা রা: বলেন, ‘মৃত্যুর বছর পর্যন্ত রাসূল সা: রমজানের শেষ দশকে ইতিকাফ করেছেন। তাঁর স্ত্রীগণও ইতিকাফ করেছেন।’ (বুখারি, হাদিস : ১৮৬৮)। আমাদেরও ইতিকাফ করতে হবে। এটি করা সুন্নত। নবি করিম সা: প্রতি রমজানে দশদিন ইতিকাফ করতেন। তবে মৃত্যুর বছরটি ছিল ব্যতিক্রম একটি বছর। ঐ বছরও তিনি বিশ দিন ইতিকাফে কাটিয়েছেন।

ইতিকাফ বান্দার মুক্তির জন্য অনন্য একটি মাধ্যম। এর মাধ্যমে বান্দা পার্থিব লোভ-লালসা থেকে নিজেকে মুক্ত করতে সম্ভব হয়। আর আল্লাহ নিকটকর্তী বান্দাদের মর্যাদায় সে শামিল হয়ে যায়। ফলে নাজাতের যে প্রকৃত বাসনা তার স্বাদ সে লাভ করতে পারে। রমজানের এই শেষ দশক হলো জাহান্নাম থেকে মুক্তির দশক। যখনি এই দশক আসত রাসূল সা: ইবাদতে খুব বেশি মনোযোগী হতেন। রাত জেগে থাকতেন। শুধু তিনি একা নন, তাঁর পরিবার-পরিজন ও বিবিদেরকে ইবাদতের জন্য জাগিয়ে দিতেন। আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কোরআনুল কারিমে এই দশককে লক্ষ করে বলেন,‘হে মানব সকল! তোমরা আল্ল¬াহর দিকে ধাবিত হও।’ (সূরা যারিয়াত, আয়াত : ৫০)।
ইতিকাফ করা হয় এ কারণে- যেন বান্দা যাবতীয় খারাপি বেঁচে থাকতে পারে। কোনো ধরণের পাপ কাজে লিপ্ত না হয়। আর পাপের প্রতি ব্যক্তির যে আকর্ষণ তা যেন বিলীন হয়ে যায়। এসব কিছু থেকে ব্যক্তি নিজেকে সরিয়ে রাখতে পারে। আল্লাহর প্রিয় বান্দা হিসেবে এমন ব্যক্তির সম্মান ও মর্যাদা আরো বেড়ে যায়। সে একজন জান্নাতি মানুষ হিসেবে পরিগণিত হয়। এটি একটি সুন্নতে মুআক্কাদা কিফায়া আমল। তবুও এর গুরুত্ব সীমাহীন। সবাই এ আমল করতে না পারলেও পাড়া-মহল্লা বা গ্রামের মধ্য থেকে অন্তত প্রত্যেক জামে মসজিদে নাজাতের শেষ দশকে কমপক্ষে ইতকাফ সম্পর্কে জ্ঞাত একজন ব্যক্তিকে দশদিন মসজিদে অবস্থান করানো উচিত। যাতে সে সবার তরফ থেকে এই ইবাদতের হক আদায় করে। যেহেতু এটা কেফায়া পর্যায়ের আমল তাই সবার পক্ষ থেকে অন্তত একজন আদায় করলে কেউ গুনাহগার হবে না। তবে যাদের ইতিকাফ করার মতো সুযোগ রয়েছে তাদের এই আমলটি অবশ্যই করা উচিত। কারণ এতে ফায়দা অনেক।

ইতিকাফের সময়ে বান্দা আল্লাহর ধ্যানে মগ্ন থাকে। তাই এই সময়ে সে ফরজের পাশাপাশি অনেক ধরণের নফল ইবাদত করতে পারে। কোরআন তিলাওয়াত, নফল নামাজ, দীনি আলোচনা, ইসলামির জ্ঞানের চর্চা, বিভিন্ন ধরণের জিকির ও তসবিহ-তাহলিল করার মাধ্যমে বান্দা অশেষ সওয়াবের অধিকারী হতে পারে। এ সময়ে মূলত একজন ইতিকাফকারী এ ধরণের কাজই করে থাকে। আর সারাদিন সিয়াম সাধনা শেষে গভীর রজনিতে চোখের পানি ছেড়ে আল্লাহর কাছে গুনাহ মাফের জন্য ফরিয়াদ জানায়। তাহাজ্জুদের নামাজে সময় কাটিয়ে দেয়। লাইলাতুল কদরের সেই মহিমান্বিত রাতে সে ইবাদতে কাটিয়ে দেয়। যে রাত হাজার মাসের চেয়েও শ্রেষ্ঠ। বান্দার গুনাহ মুক্তির জন্য এ একটি রাতই যথেষ্ট হতে পারে। যদি তার ইবাদতগুলো আল্লাহর ভালো লাগার মতো ইবাদত হতে পারে। যে ইবাদত ভক্তি, আনুগত্য ও অনুশোচনার সংমিশ্রণে বান্দার একান্ত ফরিয়াদ।

একজন ইতিকাফকারীকে অনেক ব্যাপারে সংযত থাকতে হয়। যে এমন কথা ও কাজ করবে না যাতে গুনাহ হতে পারে। প্রয়োজনীয় কথা সে বলুক, কিন্তু যা অপ্রয়োজনীয় তা বলবে না। এসব বলে কেন সে তাঁর ইবাদতের ভাব-গাম্ভীর্য নষ্ট করবে। ইসলাম অপ্রয়োজনীয় বিষয়কে নিষেধ করেছে, কিন্তু প্রয়োজনের ক্ষেত্রে কোনো বাঁধা প্রদান করেনি। অনেকে মনে করে থাকেন, ইতিকাফ অবস্থায় সুগন্ধি ব্যবহার, চোখে সুরমা লাগানো, তেল ব্যবহার ও চুল-দাড়ি আচঁরানো যাবে না। আসলে এটি একটি ভুল ধারণা। এ সবই করতে পারবে। এমনকি প্রাকৃতিক কোনো প্রয়োজন, অজু-গোসল ও খাবার আনার জন্যও মসজিদের বাইরে যেতে পারবেন। তবে তাকে খেয়াল রাখতে সে একজন ইতিকাফকারী। দ্রুত ও স্বল্প সময়ের মধ্যে সমস্ত অপ্রয়োজনীয় বিষয় এড়িয়ে দ্রুত মসজিদে ফিরে আসতে হবে।

 

 

 

 

সর্বাধিক পঠিত