প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

আর রাজী: কোভিডের কালে সংবিধান পাঠ

আর রাজী: ‘কন্সটিটিউশন’- এর বাঙলা পরিভাষা “শাসনগ্রন্থ” বা “শাসনশাস্ত্র” হতেও পারতো। তা হয়নি। সেসব না হয়ে ‘সংবিধান’ শব্দটা কবে-কখন-কেন বাংলাভাষায় ‘কন্সটিটিউশান’-এর বাংলা হিসেবে গৃহীত হয়েছে, জানেন?
প্রতিষ্ঠান পরিচালনার আইন বোঝাতে ‘শাসনতন্ত্র’ শব্দটা প্রথম ব্যবহারের যে উদাহরণ বাংলা একাডেমির বিবর্তনমূলক অভিধানে দেয়া হয়েছে সেটি রবীন্দ্রনাথ করেছিলেন; ১৯০৮ সালে। এর পরে অনেক অনেক বার রবীন্দ্রনাথের লেখায় কন্সটিটিউশনের বাংলা হিসেবে ‘শাসনতন্ত্র’ শব্দটা এসেছে। যেমন কালান্তরের ‘ছোটো ও বড়ো’ নিবন্ধ আছে- “যেহেতু সেখানে সমস্ত দেশের লোকে মিলিয়া একটি শাসনতন্ত্র পাইয়াছে।”

খেয়াল করুন- ১৯৭২-এর আগে দীর্ঘ দিন এদেশে মানুষ ‘কন্সটিটিউশান’ বলতে বুঝেছে ‘শাসনতন্ত্র’। ‘ভারত শাসন আইন’ বদলের/সংশোধনের জন্য যে আন্দোলন করেছে তার নাম হয়েছে ‘শাসনতান্ত্রিক আন্দোলন’। পাকিস্তান আমলেও আন্দোলন হয়েছে, ইসলামী/ বা সেকুলার শাসনতন্ত্রের জন্য।

একটা উদাহরণ: ‘এমেরীর এ-প্রস্তাবে ভারতীয় শাসনতান্ত্রিক অচলাবস্থা দূর হওয়ার তেমন কোন আশা আছে বলিয়া মনে হয় না।’ আজাদ, ১৯৪১।

১৯৭০ এর যে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় তার উদ্দেশ্য ছিল পাকিস্তানের ‘শাসনতন্ত্র’ প্রণয়ন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ যে ঐতিহাসিক ভাষণ দেন সেখানে তিনি বেশ কয়েক বার ‘শাসনতন্ত্র’ শব্দটা উচ্চারণ করেছেন, যেমন- “আমাদের ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলি বসবে, আমরা সেখানে শাসনতন্ত্র তৈরি করবো এবং এদেশকে আমরা গড়ে তুলবো।”, “ইয়াহিয়া খান সাহেব সরকার নিলেন, তিনি বললেন দেশে শাসনতন্ত্র দেবেন-গণতন্ত্র দেবেন, আমরা মেনে নিলাম।” বা “আপনারা আসুন, বসুন, আমরা আলাপ করে শাসনতন্ত্র তৈরি করবো।”
কিন্তু বাংলাদেশ হওয়ার পর ‘শাসনতন্ত্র’ শব্দটা হারিয়ে গেল। বাংলাদেশের মানুষ পেল ‘সংবিধান’। ‘সংবিধান’ শব্দটা কি ‘শাসনতন্ত্রে’র চেয়ে বেশি বোধগম্য এদেশের মানুষের কাছে?

শাসনতন্ত্র হচ্ছে, শ্বাস on বা চালু রাখার তন্ত্র/সিস্টেম। একটা সামাজের মানুষ কীভাবে শ্বাস নেবে সেই ‘তন্ত্র’ তৈরি করা থাকে যেখানে সেটি ‘শাসনতন্ত্র’; আর সংবিধান হচ্ছে বিধিবিধানের সংগ্রহ। তাহলে কেন আমরা শাসনতন্ত্রের বদলে কন্সটিটিউশানের বাংলা ‘সংবিধান’ করলাম?

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কন্সটিটিউশান-এর বাংলা পরিভাষা প্রস্তাব করেছিলেন- ‘গঠনপত্রিকা’, যদি এটি নেওয়া হতো তাহলে ধরে নেওয়া যেত যে, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রতি বাংলাদেশের স্থপতিদের যে ‘আবেগময় সম্মানবোধ’ ছিল তারই ফলে কন্সটিটিউশনের বাংলা ‘গঠনপত্রিকা’ হয়েছে!

কিন্তু ‘সংবিধান’ শব্দটা গ্রহণের হেতু কি?
পশ্চিমবঙ্গ সরকারনিযুক্ত ‘পরিভাষা-সংসদ’ (১৯৪৮) ‘কন্সটিটিউশন’-এর বাংলা করেছে ‘সংবিধান’। “তারা নিশ্চয়ই বুঝেশুনেই করেছে”- এই রকম একটি পরাশ্রয়ী ভাবনা থেকেই কি কন্সটিটিউশনের বাংলা হিসেবে ‘সংবিধান’ শব্দটা গৃহীত হয়েছে? আরও অসংখ্য পরিভাষার ক্ষেত্রে কলিকাতার প্রতি সেই আস্থা বা আনুগত্য রক্ষিত হয়নি। তাহলে এক্ষেত্রে কোন যুক্তিতে তা রক্ষিত হলো?

মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান তাঁর গঙ্গাঋদ্ধি থেকে বাংলাদেশ গ্রন্থে “গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান” শীর্ষক নিবন্ধে দ্ব্যর্থহীনভাবে জানাচ্ছেন- “১৯৭২ সালের পর সংবিধান কথাটা চালু হয়েছে। আগে সংবিধানকে শাসনতন্ত্র বলা হতো। ”
বাংলা একাডেমির বিবর্তন মূলক বাংলা অভিধান ‘সংবিধান’ এই সংস্কৃত বিশেষ্য শব্দটি ‘রাষ্ট্রের শাসনতন্ত্র’ হিসেবে প্রথম ব্যবহৃত হওয়ার যে উদাহরণ দিয়েছে সেটি হচ্ছে- “গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান। সংবিধান, ১৯৭২।” বাংলা একাডেমির এই অভিধানের ভূমিকায় শব্দের নতুন ব্যবহার সম্পর্কে লেখা হয়েছে:

“শব্দের প্রথম ব্যবহারের সময় এবং তার উদাহরণ ভাষার ইতিহাসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তা দিয়ে ভাষার বিবর্তনের ইতিহাস, এমন কি, সামাজিক-সাংস্কৃতিক ইতিহাসও মূর্ত হয়ে ওঠে। ভাষার বিবর্তন রীতিমতো চোখে দেখতে পাওয়া যায়।”

‘সংবিধান’ শব্দটি প্রথম ব্যবহৃত হলো ১৯৭২ সালে, তাও আবার একটি সদ্য স্বাধীন দেশের শাসনতন্ত্রের নাম-পরিচায় হিসেবে। এ থেকেও সে সময়ের “সামাজিক-সাংস্কৃতিক ইতিহাস মূর্ত হয়ে ওঠে” না কি?

সর্বাধিক পঠিত