প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

লকডাউনের আগে ঢাকা ছেড়েছে ৪০ লাখ মানুষ

নিউজ ডেস্ক: রাজধানীর বাড্ডা এলাকায় পরিবার নিয়ে একটি টিনশেড বাসায় থাকেন আবুল বাশার। পেশায় তিনি ভ্যানচালক। মূলত ভ্যান দিয়ে এলাকার আসবাবের দোকানের মালপত্র গন্তব্যস্থলে পৌঁছে দেন তিনি। ‘লকডাউন’ জারির পর যেহেতু টানা আট দিন দোকান বন্ধ থাকবে, তাই বাশার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন চলে যাবেন তাঁর স্থায়ী ঠিকানা পিরোজপুরে। তিনি বলছিলেন, ‘বাড়ি এখনো ছাড়ি নাই, তয় ঢাকা ছাড়তাছি। দেহি কত দিন এমন চলে, পরে না হয় অবস্থা বুঝে ব্যবস্থা।’

একই এলাকায় ঝুট ব্যবসা করেন রমযান আলী। তাঁর দাবি নিজ এলাকায় গেলে একটা কাজের ব্যবস্থা হবে। তিনি বলছিলেন, ‘আগের লকডাউনে ঢাকা শহরে থ্যাইকা খুব বিপদে পড়ছি, কিন্তু এবারে আর সে ভুল করমু না। যেমনে পারুম যামু।’

এই দুজনের সঙ্গে কথা হয়েছিল ‘লকডাউন’ শুরুর আগের দিন। তাঁরা ঢাকা ছেড়েছেন কি না জানা যায়নি, কিন্তু ‘লকডাউন’ শুরু হওয়ার আগে অন্তত ৪০ লাখ মানুষ ঢাকা ছেড়েছে বলে জানিয়েছে বেসরকারি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ভাড়াটিয়া পরিষদ। কিন্তু পরিবহনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, ঢাকা ছেড়ে যাওয়া মানুষের সংখ্যা ৫০ লাখ হতে পারে। ‘লকডাউনের’ প্রথম দিনেও লোকজন ঢাকা ছেড়েছে বলে তাঁরা জানান।

করোনা সংক্রমণ তীব্র হওয়ায় সরকার শিল্প-কারখানা ও জরুরি সেবা ছাড়া সরকারি-বেসরকারি প্রায় সব অফিস বন্ধ ঘোষণা করে গত বুধবার থেকে কঠোর বিধি-নিষেধ আরোপ করে দেশজুড়ে। এর আগে ১৮ দফা নির্দেশনা জারি করে ৯ দিনের বিধি-নিষেধ আরোপ করা হয়েছিল। তখনো পণ্য পরিবহন ও জরুরি সেবা ছাড়া দূরপাল্লার যানবাহন বন্ধ করে দেওয়া হয়। এর আগে লোকজন ঢাকা ছাড়তে শুরু করে। ফেরিঘাট ও মহাসড়কে যানজট লেগে যায়।

ভাড়াটিয়া পরিষদ বলছে, তারা ১১ থেকে ১৫ এপ্রিল পর্যন্ত তথ্য সংগ্রহ করে দেখেছে, লকডাউন শুরু হওয়ার আগে রাজধানী ছেড়েছে প্রায় ২০ শতাংশ মানুষ। এর মধ্যে ১২ ও ১৩ এপ্রিল সবচেয়ে বেশি মানুষ ঢাকা ত্যাগ করেছে। ২০১১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী রাজধানীতে প্রায় দুই কোটি

লোকের বাস। সেই হিসাবে করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ে লকডাউনে রাজধানী ছেড়েছে প্রায় ৪০ লাখ মানুষ, যাদের বেশির ভাগ নিম্ন ও নিম্নমধ্যবিত্ত।

ভাড়াটিয়া পরিষদ বলছে, তাদের এই জরিপকাজ এখনো চলামান। কিছুদিন পর তারা পূর্ণাঙ্গ জরিপের ফল প্রকাশ করবে।

জানতে চাইলে ভাড়াটিয়া পরিষদের সভাপতি মো. বাহারানে সুলতান বাহার বলেন, ‘আমরা একটি জরিপ করছি করোনার দ্বিতীয় ঢেউ নিয়ে। এতে আমরা পূর্ণাঙ্গভাবে বলতে পারব যে কত লোক এই দ্বিতীয় ঢেউয়ের প্রভাবে রাজধানী ছেড়েছে। তবে আমরা আপাতত এতটুকু বলতে পারি, এই করোনাকালীন লকডাউনের আগে রাজধানী ছেড়েছে প্রায় ৪০ লাখ মানুষ, যার প্রভাব আমরা দেখেছি রাস্তাঘাটে।’

তবে পরিবহন খাতের নেতাদের মতে, এই সংখ্যা ৫০ লাখেরও বেশি। তাঁরা বলছেন, ১২ ও ১৩, এমনকি ১৪ এপ্রিল পর্যন্ত সড়কে ছিল ভয়াবহ ভিড়। মানুষ যেভাবে পেরেছে বাড়ি গেছে। সদরঘাট, গাবতলী বাস টার্মিনাল, এমনকি পাটুরিয়া ঘাটে ছিল চোখে পড়ার মতো ভিড়। গত বছর সরকার যখন প্রথমবার সাধারণ ছুটি ঘোষণা করেছিল, তখনো এত লোক ঢাকা ছাড়েনি বলেও মন্তব্য করেন তাঁরা।

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক ওসমান আলী বলেন, ‘গত তিন দিনে ঢাকা থেকে কম হলেও ৫০ লাখ মানুষ বাড়ি গেছে। তাদের মধ্যে স্বল্প আয়ের মানুষ বেশি ঢাকা ছেড়েছে। যাত্রীদের ভোগান্তি হয়েছে। কিন্তু আমরা সরকারের নির্দেশমতো পরিবহন বন্ধ রেখেছি।’

দ্বিতীয় ‘লকডাউনে’ উল্টো স্থানান্তর হচ্ছে উল্লেখ করে ব্র্যাকের অভিবাসন কর্মসূচির প্রধান শরিফুল হাসান বলেন, ‘এই উল্টো স্থানান্তরের প্রভাব ব্যাপক। আমরা দেখছি, তারাই শহর ছাড়ছে যাদের লকডাউনে কাজ করার মতো কিছু থাকছে না। এতে সমাজে যে প্রভাব পড়ছে তার মধ্যে জীবনমান নেমে যাওয়া, শিক্ষা থেমে যাওয়া, গ্রামে গিয়ে বাল্যবিবাহের শিকার হওয়ার পাশাপাশি দেশে নতুন দারিদ্র্যের সংখ্যা বাড়া।’ তিনি আরো বলেন, ‘আসন্ন বাজেটে সরকারের প্রতি আমার আহ্বান থাকবে, যাতে এই মানুষগুলোর জন্য সামাজিক সুরক্ষা খাতে বিশেষ বরাদ্দের ব্যবস্থা করে তাদের পুনরায় কর্মক্ষম করে তোলা হয়।’ -কালের কণ্ঠ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত