প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

ড. মঞ্জুরে খোদা: স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী, উন্নয়নের গৎবাধা গল্পের পরিবর্তন দরকার

ড. মঞ্জুরে খোদা: স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীতে আমরা পা রাখলাম! বাঙালির স্বাধীনতা ছিল একটি জাতীয় আকাক্সক্ষার সংগ্রাম। স্বাধীনতার ঘোষণায় ছিল, ‘পারস্পরিক আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে বাংলাদেশের জনগণের জন্য সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করার উদ্দেশ্যে বাংলাদেশকে একটি সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্র ঘোষণা করছি।’ দেশের প্রথম সংবিধানে সে ঘোষণাতেই রাষ্ট্রীয় চার মূলনীতি গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা, বাঙালি জাতীয়তাবাদ গ্রহণ করা হয়। তাকেই আমরা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা-আকাক্সক্ষা ধরে আলাপ করি। এই নীতিগুলো কাটাছেড়ার পরও যা আছে, তার অনেকটাই কাগজে বাস্তবে নেই। মুক্তিযুদ্ধের অর্থনীতি মানে, আয়ের সমতা, সবার জন্য কাজ, শোষণ, লুটপাট বন্ধ, সামাজিক ন্যায়বিচার, আর্থিক শৃঙ্খলা ইত্যাদি। প্রশ্ন এর কতোটুকু অর্জিত হয়েছে? যা হয়েছে, তা কি যথেষ্ট?

আলাপ অনেক থাকলেও স্বাধীন দেশের আর্থিক খাত নিয়ে কয়েকটা কথা করি। দেশের ৯টি ব্যাংকে (সরকারি-বেসরকারি) ১৯ হাজার ৪ শত ৪৬ কোটি টাকার ঘাটতি দেখা দিয়েছে। যাকে ব্যাংকের ভাষায় বলা হয় তারল্য সংকট। মানে ব্যাংক চালানোর মতো টাকা নেই। অন্যদিকে কেবল সরকারি ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের পরিমাণ হলো ৫৫ হাজার ৯ শত ৩৩ কোটি টাকা। আর সরকারি-বেসরকারি মিলে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৭৪ হাজার ৩ শত কোটি টাকা। অথচ ১৯ হাজার ৪ শত ৪৬ হাজার কোটি টাকার জন্য ৯টি ব্যাংক মরতে বসেছে। কেন এই দূরাবস্থা? বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদন বলছে, এই ব্যাংকের ঋণগুলো সরকারি দলের সহযোগিতায় তাদের পৃষ্টপোষকতায় তাদের দলের সাথে সংশ্লিষ্ট অথবা দলকে ব্যবহার করে কিছু লোকজন এই টাকাগুলো ব্যাংক থেকে উঠিয়ে নিয়েছে। এ টাকাগুলো দুর্নীতি, কমিশন বন্টন ও লুটপাটের ব্যবস্থা করা হয়েছে। ভুয়া তথ্য ও ঋণ জালিয়াতির মাধ্যমে জনগণের এই বিশাল অংক আত্মসাৎ করা হয়েছে।

ব্যাংক পরিচালনার নীতি অনুযায়ী সব ব্যাংককে তাদের সমগ্র পুঁজির সারে ৬ শতাংশ ব্যাংক রাখতে জমা বা জামানত রাখতে হয়। কিন্তু সরকার ৬.৫ থেকে ৫.১ শতাংশ করেছে। কেন এমন করেছে? তাতে ব্যাংকগুলো মূল পুঁজির পরিমাণ কিছুটা বাড়বে এবং তাতে তাদের তারল্য সংকট কিছুটা কমবে। মানে সরকার তাদের ব্যাংকের জালিয়াতি ও লুটপাটের ঘাটতি পোষাতে সহযোগিতা করলো। এই হচ্ছে দেশের আর্থিক খাতের বিশৃংখলার একটি ক্ষুদ্রচিত্র। এর সাথে কালোটাকা, পাচার, প্রকল্প চুরি, ঘুষ-দুর্নীতি-কমিশন, চামচ, বালিশ, পর্দা, চেয়ার, ভ্রমণকাহিনি যুক্ত করলে হবে অন্য বিষয়।

ব্যাংকের তারল্য সংকট তৈরি হলে কি হয়? ব্যাংকের সুদের পরিমাণ বেড়ে যায়। কারণ ব্যাংকগুলো তখন তাদের তারল্য ঘাটতি মেটাতে গ্রাহকদের কাছ থেকে অধিক হারে সুদ নিতে থাকে। যেটা গ্রাহকদের জন্য একটি বাড়তি চাপ। ব্যাংকের সুদের ঋণ বাড়লে শিল্প-কলকারখানা হয় না। কারণ শিল্প উদ্যোক্তরা ব্যাংক থেকে লোন নিয়ে উঁচুহারে সুদ দিয়ে সেই পরিমাণ মুনাফা করতে পারে না। কারণ বেশি দাম নিয়ে গ্রাহকরা পণ্য কিনবে না। আর শিল্পায়ন না হলে কর্মসংস্থান হয় না। কর্মসংস্থান না হলে বেকাররা হতাশা থেকে নানা অপরাধের সাথে যুক্ত হয় এবং সমাজ অস্থিতিশীল হয়।

নীতিহীন ক্ষমতাকেন্দ্রীক শাসকরা অনৈতিক পন্থায় কিছু লোককে লুটপাটের সুযোগ করে দেয়। এই ধারার অর্থনীতি মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সাথে সঙ্গতির্পূণ নয়, জাতীয় স্বার্থবিরোধী। সেই অর্থনীতি পাকিস্তানের শোষণ ও লুটপাটের ধারার অর্থনীতি। এর জন্য এই জাতি এতো আত্মত্যাগ, সংগ্রাম করেনি। তাহলে এদেশে সেই লুটেরা অর্থনীতি চালু থাকে কীভাবে? রাষ্ট্র কি তাহলে সেই রাজনৈতিক দর্শনেই চলছে? এই প্রশ্ন কি অপ্রাঙ্গিক স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে?

জনসংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে, প্রবৃদ্ধিও বেড়েছে, মুদ্রাস্ফীতি-মূল্যস্ফীতি বেড়েছে, অর্থনীতির আকৃতিও আগের চেয়ে বড় হয়েছে। কিন্তু সে তুলনায় সাধারণ মানুষের আয় ও জীবন-মান বাড়েনি। মানুষের আয় যত বেড়েছে দ্রব্যমূল্য ও জীবন-যাপনের ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে তার বহুগুণ। ১৯৭২ সালে একজন প্রথম শ্রেণির কর্মচারীর মাসিক বেতন ছিল ৩৭৫ টাকা, সেখানে আজ সেই বেতন ২২,০০০ টাকা। এক ভরি স্বর্ণের দাম ছিল ৭০ টাকা আর আজ তার দাম ৫০,০০০ টাকা। সোনার দাম বৃদ্ধি পেয়েছে ৭১৪ গুন। ১৯৭৩ সালে ১ জন হাইস্কুল শিক্ষকের বেতন ছিল ১২০ টাকা, ১ জন শ্রমিকের সর্বনিম্ন বেতন ছিল ১৬০ টাকা, তখন ১ মণ চাউলের দাম ছিল ৩০ টাকা, এখন ১ মন চালের দাম ২০০০ টাকা। চালের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে ৬৭ গুণ। ১৯৭২ সালে মানুষের মাথাপিছু আয় ছিল প্রায় সারে ৮ হাজার টাকা ২০২০ সালে বাংলাদেশে মাথাপিছু আয় দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ লাখ ৭৫ হাজার টাকা। তার মানে ৫০ বছরে মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি পেয়েছে প্রায় ২০ গুণ।

মাথাপিছু আয় ২০০০ ডলার হবার অর্থ এই নয় যে প্রত্যেক নাগরিক এর সমপরিমাণ অর্থ উপার্জন করছেন। রাষ্ট্র যদি তার বর্ধিত আয় জনগণের মধ্যে বন্টন না করে, সে আয় মানুষের কোনো উপকারে আসে না। জিডিপি বৃদ্ধি দিয়ে সমাজের উন্নতির ধারণা অনেক আগেই বাতিল হয়ে গেছে। যে কারণে সরকার যে উন্নয়নের গল্প করছেন তা আসলে ভুল ব্যাখ্যার ভিত্তিতে। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর বছরে শাসকের উন্নয়নের সেই গৎবাধা গল্পের পরিবর্তন দরকার।
লেখক : লেখক ও গবেষক

সর্বাধিক পঠিত