প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

মাসুদ রানা: রাউফুন বসুনিয়ার স্মৃতি, ‘কে হায় হৃদয় খুঁড়ে বেদনা জাগাতে ভালোবাসে!’

মাসুদ রানা: আজ চৌদ্দই ফেব্রুয়ারি। গতকাল গেলো ১৩ই ফেব্রুয়ারী। ১৯৮৫ সালের ১৩ই ফেব্রুয়ারিতে শহীদ হয়েছিলো আমার প্রিয়বন্ধুদের অন্যতম রাউফুন বসুনিয়া। আমি ইচ্ছে করেই গতকালের তারিখটি স্মরণে আনতে চাইনি হৃদয় রক্তাক্ত হয় বলে। কিন্তু আজ ইনবক্সে একজন এসে লিখলোঃ
“স্যার, কেমন আছেন আপনি?
15:04
You sent Today at 15:04
ভালো।ধন্যবাদ। আপনি ভালো?
মোঃ সুমন sent Today at 15:07
জ্বী স্যার। ভালো আছি। আপনার বন্ধু বসুনিয়া সম্পর্কে জানতে চাই স্যার।
You sent Today at 15:41
কী জানতে চান, বলুন।
মোঃ সুমন sent Today at 15:43
সবিস্তারে একটা পোস্ট করার অনুরোধ করছি স্যার।”
আমি মোঃ সুমনের উত্তরে লিখেছিলাম, ‘করবো।’ কিন্তু আমার মনের গহীন পঠিত হচ্ছিলো জীবনানন্দ দাশের ‘হায় চিল’।
হায় চিল, সোনালি ডানার চিল, এই ভিজে মেঘের দুপুরে
তুমি আর কেঁদোনাকো উড়ে-উড়ে ধানসিড়ি নদীটির পাশে!
তোমার কান্নার সুরে বেতের ফলের মতো তার ম্লান চোখ মনে আসে;
পৃথিবীর রাঙা রাজকন্যাদের মতো সে যে চ’লে গেছে রূপ নিয়ে দূরে;
আবার তাহারে কেন ডেকে আনো? কে হায় হৃদয় খুঁড়ে
বেদনা জাগাতে ভালোবাসে!
সত্যিই নতুন করে আর হৃদয় খুঁড়ে বেদনা জাগাতে মন চাচ্ছিলো না। কিন্তু প্রতিশ্রুতি দিয়েছি বলে কিছু পৌস্ট না করেও পারছি না। তাই, তিন বছর আগে ২০১৮ সালে লিখাটি পৌস্ট করছি নীচে।
১৪/০২/২০২১
লণ্ডন, ইংল্যাণ্ড

তেত্রিশ বছর কেটে গেলোঃ তোকে ভুলিনি বসু!
বসু, তোকে মনে পড়ে। তোর পুরো নাম রাউফুন বসুনিয়া। কিন্তু আমরা তোকে বসু বলেই ডাকতাম। তোরও কোনো আপত্তি ছিলো না।
তুই তোর দল জাতীয় ছাত্র লীগের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাধারণ সম্পাদক ছিলি, আর আমি ছিলাম ছাত্র ফ্রণ্টের সম-পদে। ১৯৮৫ সালের ১৩ই ফেব্রুয়ারি রাতে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ ঢাবি শাখার কর্মসূচির অংশ হিসেবে মিছিল করতে গিয়ে মহসীন হলের সামনের রাস্তায় তুই গুলিবিদ্ধ হলি।
গুলিবিদ্ধ তোকে কে বা কারা মহসীন হলে নিয়ে এসেছিলো তা আমি জানি না। আমি আগের রাতে তোদের মিছিলে আসার অপেক্ষায় সূর্যসেন হলের সামনে দাঁড়িয়ে বৃষ্টিতে ভেজাতে জ্বরাক্রান্ত হয়ে পরদিন সকাল থেকে বিছানায় শুয়েছিলাম।
আমাদের সিটির আহমেদ আলী আমাকে দেখতে এসে জানালো ‘একজনের গুলি লেগেছে।’ আহমেদ তোর অসাধারণ নামটা বলতে পারলো না ভালো করে। কিন্তু আমার সন্দেহ হলো এটি তুই।
তোর নাম আন্দাজ করতেই যেনো বিদ্যুত খেলো গেলো আমার শরীরে। জ্বর উবে গেলো মুহূর্তেই। দ্রুত জীন্স পরে নীচে নেমে দেখলাম আমার সন্দেহই ঠিক।
তুই পড়ে আছিস রক্তভেজা হয়ে। আমি তোর বুকে কান পেতে শুনলাম তখনও মৃদু স্পন্দন – তোর প্রাণের স্পন্দন।
অনির্দিষ্টভাবে সকলের উদ্দেশে বললাম, প্লীজ তোমরা একটা এ্যাম্বুলেন্স ডাকো, ওকে বাঁচাতে হবে। কেউ একজন উত্তর দিলো, এ্যাম্বুলেন্স হলের গেইটেই আছে।
কী! তাহলে ওকে এ্যাম্বুলেন্সে করে মেডিকেলে না নিয়ে গিয়ে এখানে ফেলে রাখা হয়েছে কেনো? কেনো? কারও জবাব নেই। কে দেবে জবাব?
তোর দলের ছেলেরা উধাও। তোকে মেডিকেলে নিয়ে যাওয়ার জন্যে আমি ছাড়া আর কেউ ছিলো না – কেউ না। সবাই বলছিলো, ইউনিল্যাব স্কুলের কাছে এরশাদ সমর্থকেরা সশস্ত্র অবস্থান নিয়েছে।
আমি যখন নিশ্চিত আক্রান্ত হবো জেনেও, কেবল তোকে বাঁচানোর শেষ চেষ্টা হিসেবে এ্যাম্বুলেন্সে তুলে নিজেও উঠতে গেলাম, তোর ও আমার পর্যায়েরই এক নেতা আমাকে যেতে বারণ করলো (যে পরে সিনেমার নায়ক হয়েছিলো)। আমি তাকে ‘কাপুরুষ’ বলে ভর্ৎসনা করে, তোকে নিয়ে যখন রওয়ানা হলাম, আমাদের দলের মোস্তফা ফারুক এলো আমার সাথে। ধন্যবাদ তাকে।
ঠিকই এরশাদ সমর্থকেরা গান-পয়েণ্টে আটকালো এ্যাম্বুলেন্স। আমি তখন ভয়শূন্য। দেখলাম এসএম হলের আজিজ ও মজিদকে। বললাম, তোরা আর কতো খারাপ হবি? গুলি করবি? কর!
ওরা বললো – আমার স্পষ্ট মনে আছে – “আল্লার হুকুম রানা ভাই আমরা বসুভাইকে গুলি করি নাই। গুলি মহসীন হলের মাঠ থেকে করেছে…।”
আমি বললাম, আমাকে মেডিকেলে যেতে দে, পড়ে দেখা যাবে আসলে কে করেছে গুলি। ওরা দ্রুতই ছেড়ে দিলো। মনে হলো ওরাও বিষণ্ণ। ওরা তোকে চিনতো। কে না চিনতো তোকে? কার না খারাপ লেগেছে তোর গুলিবিদ্ধ হওয়ার কথা শুনে।
কিন্তু কে গুলি করেছে তোকে? এরশাদের সমর্থকেরা? পুলিস? নাকি মহসীন হলের মাঠ থেকে অন্য কেউ স্যাবোটাজ করার জন্যে গুলি করে সরে পড়েছিলো?
আজিজ-মজিদের কথা সত্য কিনা জানি না। কিন্তু ওদের কথা আমি ভুলিনি। তাই, পরবর্তীতে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের মিছিলের রাতে মিছিলে অনুসরণকারী অন্য কোনো মিছিল এ্যালাউ করিনি।
অল্প সময়ের মধ্যেই তোকে নিয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পৌঁছেছিলাম। হাসপাতালের ডাক্তাররা অনেক চেষ্টা করলেন, কিন্তু বাঁচাতে তোকে পারলো না। সরি বন্ধু, তোকে বাঁচাতে পারলাম না।
তুই চলে গেলি বসু, অনেক স্মৃতি রেখে। তোর ওয়ালেট (মানিব্যগ) এবং একটা চিঠি ডাক্তারেরা আমার হাতে দিলো। আমি সযত্নে রাখলাম আমার কাছে।
ভোরের দিকে তোর দলের শীর্ষ নেতা সাদা পায়াজা-পাঞ্জাবীর ওপর মুজিবকৌট পরে এলেন। যথারীতি তাঁর পেছেনে একদল “কর্মী”। আমাকে কী যেনো জিজ্ঞেস করেছিলেন রাজ্জাক ভাই। কিন্তু আমি আমার রাগটা ঝাড়লাম তাঁর ওপর। হায়, তিনিও আজ বেঁচে নেই!
বিশ্বাস কর বসু, তোর চিঠি আমি পড়িনি। কিন্তু শুনেছিলাম তুই প্রেমের পড়েছিলি। ভেবেছিলাম, ঐ চিঠিটা হতে-পারে তাঁকে লিখা তোর, কিংবা তোকে লিখা ওঁর। সেই চিঠি দেখার জন্যে মিনার মাহমুদ আমার রুমে এসে অনেক অনুরোধ করেছিলো, কিন্তু আমি দিইনি। হায়, আজ মিনার মাহমুদও বেঁচে নেই!
শেষ পর্যন্ত, বেশ কিছুদিন পর তোর বড়োভাই ফর্চুন বসুনিয়া আমার রুমে এলে, তাঁর হাতে তুলে দিয়েছিলাম তোর ওয়ালেট ও চিঠিটা। বলেছিলাম, মার হাতে পৌঁছে দিবেন।
তোর ছোটা ভাইটা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছিলো। ওকে দেখলে আমার মনের ভেতর একটা চাপা বেদনা অনুভব করতাম তোর কথা ভেবে, তোর মায়ের কথা ভেবে।
ওর নামটা ঠিক মনে পড়ছে না – সম্ভবতঃ নাহিন। ও জানতো আমি ওর ভাইয়ের বন্ধু। সম্ভবতঃ এও জানতো যে, আমি ওর ভাইকে বাঁচাতে নিজের জীবনের ওপর ঝুঁকি নিয়ে মেডিকেলে নিয়ে গিয়েছিলাম। তাই, ওর চোখে একটা অম্লান কৃতজ্ঞতার আলো দেখতাম।
আজ আবার সেই ১৩ই ফ্রেব্রুয়ারি। তেত্রিশ বছর আগের কথা, কিন্তু আজও আমার স্মৃতিতে রক্ত-লাল উজ্জ্বলতায় অম্লান হয়ে রয়েছে সেই রাতটি।
১৩ই ফেব্রুয়ারী এলেই তোর কথা মনে পড়ে। তোকে ভুলিনি বন্ধু। ভুলিনি স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে আপসহীন সংগ্রামের প্রতিশ্রুতি!
১৩/০২/২০১৮
লণ্ডন, ইংল্যাণ্ড

সূত্র : ফেসবুক থেকে

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত