প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

শিবলী হাসান : নিকাহ রেজিস্ট্রারে কেন নারী অযোগ্য হবে?

শিবলী হাসান : রায়ে মেয়েদের সর্ম্পকে যা বলা হয়েছে আধুনিকতা ও নারীর ক্ষমতায়নের সঙ্গে তা যায় না। আরও বেশি হতাশার যখন হাইকোর্টের রায়ে নিকাহ রেজিস্ট্রারের কাজকে ভুলভাবে ব্যাখ্যায়িত করা হয়। কেননা আইনে নিকাহ রেজিস্ট্রারের যোগ্যতা এবং কাজ সুনির্দিষ্ট করে দেওয়া আছে। তিনি বিয়ে রেজিস্ট্রি করবেন, সিগনেচার নেবেন। ডিভোর্সের ক্ষেত্রেও তাই। তাদের কোনো ধর্মীয় কাজ নেই। আর আইনে কিন্তু কাজি শব্দটি নেই। রেজিস্ট্রার বলা আছে।

বাংলাদেশের হাইকোর্ট নারীদের মুসলিম নিকাহ রেজিস্ট্রার হওয়ার অযোগ্য ঘোষণা করেছেন। গত ৭ জানুয়ারি বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ আইন মন্ত্রণালয়ের এক সিদ্ধান্তকে সঠিক বিবেচনা করে একটি রিট নিষ্পত্তি করেছে, যেখানে ‘সামাজিক ও শারীরিক বাস্তবতার কারণে নারীকে কাজী হিসেবে অযোগ্য ঘোষণা করা হয়েছে। রায়ের পর্যবেক্ষণে গিয়ে নারী জাতি নিয়ে যেসব শব্দচয়ন করা হয়েছে এবং যেসব অযোগ্যতার কথা টেনে আনা হয়েছে, তা চরম অপমানজনক। একবিংশ শতাব্দীতে এসেও আদালতের মতো স্থানে এভাবে যে নারীকে অপমান করা যায়, যুক্তির নামে অযৌক্তিক বিশ্লেষণ দিয়ে তাচ্ছিল্য করা যায়; তা ছিল ধারণার বাইরে। ‘ডিসকোয়ালিফিকেশন’ বা ‘অযোগ্যতা’ হিসেবে একজন নারীর ‘পিরিয়ড’ বা ‘মাসিক’ কীভাবে আলোচনায় আসতে পারে বা আদালতে যোগ্যতার মানদণ্ড হতে পারে, তা বড় বিস্ময়ের! তাই হাইকোর্টের এই রায় এবং তার পর্যবেক্ষণে উচ্চারিত শব্দ ও যুক্তি নিয়ে বিশদ আলোচনা হওয়া প্রয়োজন। বাংলাদেশের সংবিধান, নারী-পুরুষের সমানাধিকার ও বাকস্বাধীনতার প্রশ্নে কাউকে না কাউকে কথাগুলো বলতেই হবে। তাই কয়েকটি বিষয় এই রায়ের আলোকে তুলে ধরা প্রয়োজন।

একদম ঘটনার শুরুর দিকে যাওয়া যাক। সময়টা ২০১২ সাল, পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দেখে দিনাজপুরের ফুলবাড়ী পৌরসভায় নিকাহ রেজিস্ট্রার বা কাজি পদের জন্য আবেদন করেন আয়েশা সিদ্দিকা। এলাকার জনপ্রিয় হোমিও চিকিৎসক আয়েশা সিদ্দিকা সব নিয়ম মেনে পরীক্ষায় অংশ নেন এবং ধাপে ধাপে লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষা দিয়ে ২০১৪ সালে নিয়োগ পরীক্ষায় প্রথম স্থান অধিকার করেন। ফলে নিয়োগ কমিটি নির্বাচিত তিনজন সদস্যের একটি প্যানেল প্রস্তাব দিয়ে চূড়ান্ত করে আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠায়। কিন্তু একই বছরের ১৬ জুন আইন মন্ত্রণালয় তিন সদস্যের প্যানেল বাতিল করে দিয়ে এক চিঠি পাঠায়। চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, ‘বাংলাদেশের বাস্তব অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে নারীদের দ্বারা নিকাহ রেজিস্ট্রারের দায়িত্ব পালন করা সম্ভব নয়’! যদিও ‘বাংলাদেশের বাস্তব অবস্থা’ বলতে আইন মন্ত্রণালয় ঠিক কী বোঝাতে চেয়েছেন, তার বিস্তারিত ব্যাখ্যা সেই চিঠিতে উল্লিখিত ছিল না! সেই থেকে লড়াই শুরু আয়েশা সিদ্দিকার। আইন মন্ত্রণালয়ের ওই সিদ্ধান্ত চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট করেন নিকাহ রেজিস্ট্রারের প্যানেলের ১ নম্বর ক্রমিকে থাকা আয়েশা সিদ্দিকা। সেই রিটের শুনানি নিয়ে আইন মন্ত্রণালয়ের চিঠি কেন বাতিল করা হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেন হাইকোর্ট। দীর্ঘ সাত বছর শুনানি শেষে জারি করা রুলটি গত ৭ জানুয়ারি খারিজ করে দেয়া হয়। অর্থাৎ বাংলাদেশের সামাজিক ও বাস্তব অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে নারীরা নিকাহ রেজিস্ট্রার হতে পারবে না মর্মে আইন মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত বহাল থেকে যায়।

সাত বছর আগে আইন মন্ত্রণালয়ের দেয়া চিঠিতে ‘বাংলাদেশের সামাজিক ও বাস্তব অবস্থা’র বিশদ বর্ণনা না থাকলেও মহামান্য হাইকোর্ট এবার এই শব্দের ব্যাখ্যা দিয়েছেন! এমনকি ‘সামাজিক ও শারীরিক বাস্তবতা’ টার্মও এবার ব্যবহার করা হয়েছে। বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী ও বিচারপতি কাজী জিনাত হকের এই রায়ে বলা হয়েছে, ‘নারীরা মাসের একটি নির্দিষ্ট সময় ফিজিক্যাল ডিসকোয়ালিফেশনে থাকেন। সে ক্ষেত্রে মুসলিম বিবাহ হচ্ছে একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান এবং আমাদের দেশে বেশিভাগ বিয়ে মসজিদে পড়ানো হয়ে থাকে। ওই সময়ে নারীরা মসজিদে প্রবেশ করতে পারেন না এবং তারা নামাজও পড়তে পারেন না। সুতরাং বিয়ে যেহেতু একটা ধর্মীয় অনুষ্ঠান, সেহেতু এই বাস্তবতার পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশে নারীদের দিয়ে নিকাহ রেজিস্ট্রারের দায়িত্ব পালন সম্ভব নয়। ফলে নারীরা নিকাহ রেজিস্ট্রার (কাজি) হতে পারবেন না।’

অবাক করা বিষয় হচ্ছে সমাজের যে সচেতন অংশ বা বিবেকবান নাগরিকরা সামাজিক ট্যাবু ভাঙার কথা উল্টো তারাই সেই ট্যাবুর মাঝে পড়ে আছেন। আর তাই ‘পিরিয়ড’ শব্দ মুখে আনা মহামান্য হাইকোর্টের বিচারকের পক্ষে সম্ভব হয়নি। অপরদিকে এই পিরিয়ডকে কীভাবে ‘ফিজিক্যাল ডিসকোয়ালিফিকেশন’ হিসেবে উল্লেখ করা হতে পারে, তা বোধগম্য নয়। জন্ম প্রক্রিয়ার একটা প্রসেস কখনো কোনো নারীর অযোগ্যতা হতে পারে না বরং এই পিরিয়ড নারীর জন্য সম্মানের, এই পিরিয়ড নারীর জন্য গর্বের ও অহংকারের।

অবাক করা বিষয় হচ্ছে হাইকোর্টের রায়ে মেয়েদের সর্ম্পকে যা বলা হয়েছে আধুনিকতা ও নারীর ক্ষমতায়নের সঙ্গে তা যায় না। আরও বেশি হতাশার যখন হাইকোর্টের রায়ে নিকাহ রেজিস্ট্রারের কাজকে ভুলভাবে ব্যাখ্যায়িত করা হয়। কেননা, আইনে নিকাহ রেজিস্ট্রারের যোগ্যতা এবং কাজ সুনির্দিষ্ট করে দেয়া আছে। তিনি বিয়ে রেজিস্ট্রি করবেন, সিগনেচার নেবেন। ডিভোর্সের ক্ষেত্রেও তাই। তাদের কোনো ধর্মীয় কাজ নাই। আর আইনে কিন্তু কাজি শব্দটি নাই। রেজিস্ট্রার বলা আছে। তাই নিকাহ রেজিস্ট্রারের কাজ বিয়ে পড়ানো নয়, বিয়ে রেজিস্ট্রি করা। বিষয়টা এমন না যে শুধু মাওলানারাই বিয়ে পড়াতে পারেন, বিয়ে সম্পর্কে জ্ঞান আছে, এ রকম যেকোনো মুসলমান বিয়ে পড়াতে পারেন। আর নিকাহ রেজিস্ট্রার সেটা আইন অনুযায়ী রেজিস্ট্রেশন করবেন। এ জন্য নিকাহ রেজিস্ট্রারকে বিয়ের অনুষ্ঠানে যাওয়া বাধ্যতামূলক নয়। আর সব সময় যে নিকাহ রেজিস্ট্রার বিয়ে পড়াতে যান, তা-ও নয়। তাহলে মহামান্য হাইকোর্টের রায়ে কীভাবে এমন বিভ্রান্তিমূলক মিথ্যা তথ্য থাকে এবং সেই আলোকে ব্যাখ্যা আসতে পারে, তা আমাদের কাছে পরিষ্কার না! এখানে আরেকটি তথ্য উপস্থাপন করে নারীর ফিজিক্যাল ডিসকোয়ালিফিকেশনের বিষয়টা আদালত এনেছেন আর তা হলো বাংলাদেশের অধিকাংশ বিয়ে নাকি মসজিদে হয়। যেহেতু পিরিয়ডের সময় ইসলাম ধর্মমতে নারীরা মসজিদে যেতে পারবেন না, তাই নারী নিকাহ রেজিস্ট্রার হিসেবে অযোগ্য। আমি এই ব্যাখ্যায় বাকরুদ্ধ হয়ে গেছি। কেননা, বর্তমানে কমিউনিটি সেন্টার বা নিজ বাড়ির অধিকাংশ বিয়েই অনুষ্ঠানস্থলে পড়ানো হয়, মসজিদে না। আর মসজিদে পড়ানো হলেও কোনো সমস্যার কিছু নেই। কারণ, নিকাহ রেজিস্ট্রার তো বিয়ে পড়াবেন না, তাই তার সঙ্গে থাকা অন্য কাউকে নিকাহ রেজিস্ট্রার সেখানে পাঠাবেন। তা ছাড়া, নির্দিষ্ট কোনো ধর্মের ধর্মগ্রন্থ যেহেতু বাংলাদেশের সংবিধান নয়, তাই মহামান্য হাইকোর্টকে অবশ্যই গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের আলোকে ব্যাখ্যা দিতে হবে। যোগ্যতা বা অযোগ্যতার মাপকাঠি কী হবে, তা সংবিধান নির্ধারণ করবে- কোন ধর্ম বা কোন গোত্র নয়। তাহলে কোন যুক্তিতে সংবিধানবহির্ভূত তথ্য-উপাত্তহীন বক্তব্য হাইকোর্টের রায়ে আসে? পুরো লেখাটি পড়ুন সারাক্ষণ ডটকমে।
লেখক : ব্লগার ও নারী অধিকারকর্মী

 

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত