প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

চট্টগ্রামে ধর্ষণের শিকার হওয়া ৬৪ শতাংশই শিশু-কিশোরী

ডেস্ক রিপোর্ট: কন্যাশিশুটির বয়স পাঁচ বছর। বাবা রিকশাচালক। মা মানুষের বাসায় কাজ করেন। ঘরে একাই থাকে শিশুটি। প্রতিবেশী এক নারী শিশুটিকে দেখাশোনা করেন। সারা দিন বাসায় একা থাকা শিশুটির মন চায় খেলতে। বাসার পাশের মাঠে খেলতে গিয়ে শিকার হয় ধর্ষণের। স্থানীয় লোকজন ধর্ষণের অভিযোগে নির্মল চন্দ্র নামের স্থানীয় এক ব্যক্তিকে ধরে পুলিশে দেন। কিন্তু ‘দায়সারা’ তদন্ত শেষে আসামিকে অব্যাহতি দিয়ে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেয় পুলিশ।

গত বছরের ৪ মে বিকেলে চট্টগ্রাম নগরের আকবর শাহ থানার বেলতলী ঘোনা এলাকায় এই ঘটনা ঘটেছিল। দুই দিন পর ৭ মে শিশুটি চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে জবানবন্দি দেয়। সেখানে পুরো ঘটনার বর্ণনা দেয় সে। এ ছাড়া শিশুটির বাবা বাদী হয়ে আকবর শাহ থানায় নির্মলকে আসামি করে মামলা করেন। শারীরিক পরীক্ষা শেষে চিকিৎসকেরা প্রতিবেদন দিয়েছেন, শিশুটি ধর্ষিত হয়েছে। শিশুটির ডিএনএ নমুনাও সংগ্রহ করে পুলিশ। কিন্তু ঘটনাস্থল থেকে গ্রেপ্তার হওয়া ওই ব্যক্তির সঙ্গে নমুনা মিলিয়ে দেখেননি তদন্ত কর্মকর্তা।

বিজ্ঞাপন

আসামিকে মামলা থেকে অব্যাহতি দিয়ে চূড়ান্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘শিশুটি ধর্ষিত হয়েছে সত্য, তবে নির্মল চন্দ্র জড়িত থাকার তথ্য পাওয়া যায়নি। গত ২২ জুলাই নগরের বায়েজিদ বোস্তামীতে পুলিশের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হন বেলাল হোসেন নামের এক অটোরিকশাচালক। তিনি ক্রমিক ধর্ষক হিসেবে পরিচিত। শিশুটিকে ধর্ষণে বেলালই জড়িত। তিনি মারা যাওয়ায় মামলায় আসামি করা যাচ্ছে না।’

প্রতিবেদনটির বিরুদ্ধে শিশুটির বাবা নারাজি আবেদন করলে আদালত গত নভেম্বর মাসে নগর গোয়েন্দা পুলিশকে (ডিবি) মামলাটি অধিকতর তদন্তের নির্দেশ দেন। মামলার বাদী শিশুটির বাবা বলেন, ‘মামলার পর পুলিশ কোনো যোগাযোগ করেনি, উল্টো ধমক দিত। না জানিয়ে প্রতিবেদন দিয়ে দেয়। গরিব বলে বিচার কি পাব না?’

ধর্ষণের এ ঘটনাসহ গত বছরের জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত গত ১১ মাসে চট্টগ্রাম নগরের ১৬ থানায় ধর্ষণ ও দলবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনায় মামলা হয়েছে ২২৭টি। অথচ চার বছর আগে ২০১৫ সালে ১৬ থানায় মামলা হয়েছিল মাত্র ৭৮টি। চলতি বছরের ১১ মাসে ২২৭ মামলার মধ্যে শিশু-কিশোরী ধর্ষণের মামলা অর্ধেকের বেশি।

ধর্ষণের সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদণ্ডের বিধান রেখে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন সংশোধন করেছে সরকার। গত ১৩ অক্টোবর থেকে আইনটি কার্যকর হয়েছে। তবে ধর্ষণের ঘটনা কমেনি। পুলিশ সূত্র জানায়, সেপ্টেম্বর মাসে নগরের ১৬ থানায় ২৪টি আর অক্টোবর মাসে হয় ধর্ষণের ৩৮টি মামলা।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ভুক্তভোগীদের প্রায় ৬৪ শতাংশই শিশু-কিশোরী, যাদের বয়স ৪ থেকে ১৮ বছর। ২২৭টি মামলার মধ্যে ১৭৩টি মামলার নথি পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, প্রেম, বিয়ে ও ফাঁদে ফেলে কিশোরী ও তরুণীদের প্রতারণার মাধ্যমে ধর্ষণ করা হচ্ছে। ধর্ষণের মামলার ৮৬ শতাংশই এই অভিযোগে করা। আসামি ও ভুক্তভোগীদের বেশির ভাগই ছিন্নমূল, নিম্নবিত্ত পরিবারের। পরস্পর আত্মীয় কিংবা প্রতিবেশী।

প্রেম ও বিয়ের ফাঁদে ফেলে ধর্ষণের অভিযোগে করা বেশির ভাগ মামলাই চট্টগ্রামের সাতটি নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন বলে জানান সরকারি কৌঁসুলিরা। অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্যের সঙ্গে একমত পোষণ করেন ট্রাইব্যুনালের চার কৌঁসুলি। তাঁরা জানান, মধ্যবিত্ত পরিবারের ঘটনা কম। তবে উচ্চবিত্ত পরিবারের কোনো ঘটনা বিচারাধীন নেই। ঘটনা ঘটে না তা কিন্তু নয়। সামাজিক মর্যাদার ভয়ে তাঁরা নিজেরা মিটিয়ে ফেলেন।

আপসের ফলে ধর্ষকের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হওয়ায় ধর্ষণে অন্যরা উৎসাহিত হয় বলে মন্তব্য করেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক এস এম মনিরুল হাসান। তিনি বলেন, অনেক ক্ষেত্রে আসামির শাস্তির চেয়ে মামলার পরও মেয়ের বিয়ে, ভবিষ্যৎ নিয়ে বেশি চিন্তিত থাকে গরিব মানুষেরা। ফলে ধর্ষকদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হয় না। সমাজে তার প্রভাব পড়ে। বাড়তে থাকে ধর্ষণের ঘটনা।

বিজ্ঞাপন

ফাঁদে ফেলে ধর্ষণ
১৪ বছরের কিশোরীটির মা নেই। বাবা অসুস্থ। চিকিৎসার খরচ জোগাতে কিশোরী ভিক্ষা করে। এটি করতে গিয়ে নাজিম উদ্দিন নামের এক মাইক্রোবাসচালকের সঙ্গে পরিচয় হয়। দুজনের প্রেম হয়। গত ১৯ ফেব্রুয়ারি নগরের লালখান বাজার থেকে ওই কিশোরীকে মাইক্রোবাসে বেড়াতে নিয়ে যাওয়া হয় সার্সন রোড এলাকায়। সেখানে গাড়িটির ভেতর তাকে ধর্ষণ করা হয়। এই ঘটনায় কিশোরী বাদী হয়ে কোতোয়ালি থানায় মামলা করে। একই ধরনের মামলা হয়েছে নগরের চান্দগাঁও থানায়। সপ্তম শ্রেণির এক ছাত্রীকে প্রেমের সম্পর্কের জেরে গত ১৯ অক্টোবর হোটেলে নিয়ে ধর্ষণ করা হয়। এই ঘটনায় ছাত্রীটির বাবা বাদী হয়ে মো. ফাহিম উদ্দিন নামের এক যুবককে আসামি করে চান্দগাঁও থানায় মামলা করেন। এ ছাড়া নগরের সদরঘাট এলাকায় ১৬ সেপ্টেম্বর দশম শ্রেণির এক ছাত্রীকে ফুসলিয়ে ধর্ষণ করা হয়।

থানায় ধর্ষণের ঘটনায় হওয়া বেশির ভাগ মামলা বিয়ের আশ্বাসে কিংবা প্রেমের ফাঁদে ফেলে হয় বলে জানান নগর পুলিশ কমিশনার সালেহ মোহাম্মদ তানভীর। তিনি বলেন, মামলা নেওয়া হচ্ছে। আসামিও গ্রেপ্তার হচ্ছে। সঠিক তদন্ত করে প্রতিবেদন দিচ্ছে পুলিশ।

বেড়ানোর কথা বলে বন্ধুদের সঙ্গে দল বেঁধে প্রেমিকাকে ধর্ষণের ঘটনাও রয়েছে। ১৮ বছর বয়সী এক পোশাকশ্রমিক নগরের বন্দর আউটার রিং রোড এলাকায় তাঁর প্রেমিক শহিদুল ইসলামের সঙ্গে বেড়াতে যান। গত ১ নভেম্বর সড়কের পাশে একটি টংঘরে নিয়ে শহীদ ও তাঁর বন্ধুরা ওই তরুণীকে দল বেঁধে ধর্ষণ করেন। এই ঘটনায় করা মামলায় পুলিশ মো. হোসাইন, মো. শাহিন ও মো. জোবায়ের নামের তিনজনকে গ্রেপ্তার করে।

চট্টগ্রামের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-৩–এর সরকারি কৌঁসুলি মো. নজরুল ইসলাম বলেন, ভুক্তভোগীকে জিম্মি করতে ধর্ষণের ঘটনা মুঠোফোনে ভিডিও করে রাখা হচ্ছে। জানাজানি হওয়ার ভয়ে বারবার ধর্ষণের শিকার হলেও ভুক্তভোগীরা মুখ খোলেন না।

ক্রমিক ধর্ষণ, ‘বন্দুকযুদ্ধে’ আসামির মৃত্যু
টাকা কিংবা চকলেটের লোভ দেখিয়ে কৌশলে তুলে নেওয়া হয় অটোরিকশায়। এরপর ভয়ভীতি দেখিয়ে নেওয়া হয় নির্জন স্থানে। ধর্ষণ শেষে পুনরায় আশপাশের এলাকায় নামিয়ে দেওয়া হয়। এভাবে তুলে নিয়ে নগরের বায়েজিদ বোস্তামী, আকবরশাহ ও খুলশী এলাকায় ৭ মাসে (জানুয়ারি-জুলাই) অন্তত ১০ শিশুকে একই কায়দায় ধর্ষণ করা হয়েছে। সর্বশেষ ৫ জুলাই বায়েজিদে এক শিশুকে তুলে নিয়ে ধর্ষণ করা হয়। ভুক্তভোগী শিশুদের বয়স ১০ বছরের নিচে। এরপর পুলিশের হাতে ধরা পড়ে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হন ‘ক্রমিক ধর্ষক’ সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালক মো. বেলাল।

বায়েজিদ বোস্তামী থানার ওসি প্রিটন সরকার বলেন, গত জুলাই মাসে ‘ক্রমিক ধর্ষক’ বেলাল পুলিশের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে মারা যান। তাঁর বিরুদ্ধে ১৪টি মামলা রয়েছে। এগুলোর মধ্যে ১০টি শিশু ধর্ষণের। বেলালের লক্ষ্য ছিল দরিদ্র পরিবারের শিশুরা।

ঘটনার শিকার দুই শিশুর অভিভাবক জানিয়েছেন, সিএনজিচালিত অটোরিকশা দেখলে এখনো ভয় পায় শিশুরা। নানাভাবে ভয় কাটানোর চেষ্টা চলছে। তবে বেলাল নিহত হওয়ায় এখন তাঁরা কিছুটা স্বস্তিতে আছেন।

করোনার ছুটিতে মামলা কম
করোনা সংক্রমণ মোকাবিলায় গত ২৬ মার্চ থেকে ৩০ মে পর্যন্ত দেশের সাধারণ ছুটি ছিল। ওই সময়ে (এপ্রিল ও মে মাসে) নগরের ১৬ থানায় ধর্ষণের মামলা হয়েছে ১৯টি। তবে ছুটি শেষে মামলার সংখ্যা বেড়ে যায়। জুন ও জুলাইয়ে মামলা হয় ৩০টি। গত অক্টোবর মাসে হয় ৩৮ মামলা।

আট বছর ধরে দায়িত্ব পালন করা চট্টগ্রাম নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-২ এর সরকারি কৌঁসুলি এম এ নাছের বলেন, করোনার সময় মামলা কম হলেও এখন আবার বাড়ছে। রাষ্ট্রপক্ষ সব সময়ই আসামিকে সাজা দিতে তৎপর।

রাস্তা থেকে তুলে নিয়ে ধর্ষণ
এক আত্মীয়ের বাসায় দাওয়াত খেয়ে হেঁটে আধা কিলোমিটার দূরে বাসায় ফিরছিলেন এক দম্পতি। কথা বলতে বলতে দুজন কিছুদূর যাওয়ার পর তাঁদের পথ আটকান মো. শফি নামের স্থানীয় এক ‘বখাটে’। তিনি পুলিশের ‘সোর্স’ হিসেবে পরিচিত। ওই দম্পতি স্বামী-স্ত্রী নন দাবি করে তাঁদের পুলিশে দেওয়ার হুমকি দেন শফি। সালিসের নাম করে ওই দম্পতিকে সড়ক থেকে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় তুলে পার্শ্ববর্তী একটি কলোনিতে নিয়ে যাওয়া হয়। আর সেখানে একটি কক্ষে স্বামীকে হাত-পা বেঁধে রাখা হয়। আর আরেকটি কক্ষে স্ত্রীকে দল বেঁধে চার ঘণ্টাব্যাপী করা হয় ধর্ষণ।

বিষয়টি কিছুটা আঁচ করতে পেরে আশপাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়া এক ব্যক্তি জরুরি সেবা ৯৯৯-এ কল দেন। পরে পুলিশ ওই নারীকে উদ্ধার করে।

গত ২৯ আগস্ট রাতে চট্টগ্রাম নগরের বায়েজিদ বোস্তামী থানার অক্সিজেন মোড়ে ঘটনাটি ঘটেছিল। বায়েজিদের এ ঘটনাসহ ১১ মাসে রাস্তা থেকে তুলে নিয়ে ধর্ষণের ঘটনা ঘটে ১২টি। বায়েজিদের ঘটনায় ওই নারীর স্বামী বাদী হয়ে থানায় মামলা করেন। চার মাস পার হলেও মূল আসামি শফিকে ধরতে পারেনি পুলিশ। মামলার বাদী ওই নারীর স্বামী বলেন, ‘স্ত্রী, সন্তানদের নিয়ে আতঙ্কে থাকি। কখন আবার কী হয়ে যায়। মূল আসামি ধরা না পড়ায় প্রতিনিয়ত ভয়ে থাকি।’

সূত্র : প্রথম আলো

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত