প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

জঙ্গীরা ফের তৎপর, মাঠে অর্ধশত জঙ্গী সংগঠন

অনলাইন ডেস্ক: করোনা পরিস্থিতির মধ্যেও ফের ব্যাপক তৎপর জঙ্গীরা। এবার সিরাজগঞ্জ ও রাজশাহীতে জঙ্গী আস্তানা আবিষ্কার করেছে র‌্যাব। আস্তানা থেকে প্রশিক্ষিত সাত জঙ্গী গ্রেফতার হয়েছে। আস্তানায় মিলেছে অত্যাধুনিক বিদেশী পিস্তল, চাপাতি, গানপাউডার, ডেটোনেটরসহ শক্তিশালী বোমা তৈরির সব আধুনিক সরঞ্জাম। পাওয়া গেছে বোমা তৈরির কলাকৌশল সমৃদ্ধ নথিপত্র। মিলেছে জঙ্গী প্রশিক্ষণের নির্দেশিকা ও জিহাদী বই। খোদ ঢাকাতেও একটি বাড়িতে ৩১টি বোমা পাওয়া গেছে। এ ঘটনায় দুই জনকে গ্রেফতার করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। এমন ঘটনায় রীতিমতো হৈচৈ চলছে। নতুন করে জঙ্গীরা মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে বলে তথ্য পেয়েছে গোয়েন্দারা। দেশে ইসলামী শাসন ব্যবস্থা কায়েম করতে জঙ্গীরা নানামুখী তৎপরতা চালাচ্ছে। আস্তানা গড়ে তোলার পাশাপাশি জঙ্গীরা অনলাইনেও তৎপরতা চালাচ্ছে।

এদিকে মিরপুরের শাহ আলী মাদ্রাসা নতুন করে দখলে নেয়ার চেষ্টা করছে জামায়াত-শিবির জঙ্গীরা। এই প্রতিষ্ঠানের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ কে এম সাইফুল্লাহ ইতোমধ্যে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডকে চিঠি লিখে বিষয়টি অবহিত করেছেন।

সিরাজগঞ্জ থেকে আমাদের স্টাফ রিপোর্টার এবং জেলার শাহজাদপুর থেকে আমাদের নিজস্ব সংবাদদাতা জানান, বৃহস্পতিবার গভীর রাত থেকেই র‌্যাব-১২ এর একাধিক দল রাজশাহী ও সিরাজগঞ্জে জঙ্গী আস্তানার সন্ধান পায়। সে মোতাবেক বৃহস্পতিবার রাত থেকেই এবং শুক্রবার ভোর থেকেই অভিযান শুরু করে র‌্যাব।

বৃহস্পতিবার রাতে পৃথক অভিযান চালিয়ে সিরাজগঞ্জ এবং রাজশাহী থেকে জামায়াতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশের (জেএমবি) আঞ্চলিক কমান্ডারসহ সাত জঙ্গীকে গ্রেফতার করা হয়। গ্রেফতারকৃতদের মধ্যে রাজশাহীর আঞ্চলিক কমান্ডারসহ তিন জন রয়েছে। আর সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর থেকে সিরাজগঞ্জ-পাবনা অঞ্চলের সেকেন্ড ইন কমান্ডসহ চার জনকে গ্রেফতার করা হয়।

শাহজাদপুরের ওই বাড়ি থেকে দুটি বিদেশী পিস্তল, রাম দা, চাপাতি, গানপাউডার, ডেটোনেটরসহ বোমা তৈরির সরঞ্জাম, প্রশিক্ষণ নির্দেশিকা, জিহাদী বই এবং উগ্র মতবাদের বই পাওয়া গেছে।

সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর উপজেলার পৌর সদরের শেরখালীর উকিলপাড়া এলাকায় শুক্রবার ভোরে জঙ্গী আস্তানা সন্দেহে ফজলুল হক মাস্টারের একটি টিনশেড বাড়িতে অভিযান চালায় র‌্যাব-১২। ওই বাড়ি থেকে জেএমবির সেকেন্ড ইন কমান্ডসহ চার জঙ্গীকে আটক করা হয়।

প্রায় ৬ ঘণ্টাব্যাপী র‌্যাবের অভিযানে সন্দেহভাজন এই চার জঙ্গী বাড়ি থেকে বেরিয়ে এসে র‌্যাবের কাছে আত্মসমর্পণ করে। আত্মসমর্পণ করা চার জন হচ্ছে, জেএমবির সেকেন্ড ইন কমান্ড কিরন ওরফে হামিম ওরফে শামীম (২২), বাড়ি পাবনা জেলার সাঁথিয়ায়। নাইমুল ইসলাম (২২), তারও বাড়ি পাবনা জেলার সাঁথিয়ায়। সাতক্ষীরা জেলার তারা থানার আমিনুল ইসলাম শান্ত (২৫) এবং দিনাজপুর জেলার কোতোয়ালি থানার আতিউর রহমান ওরফে কলম সৈনিক।

শাহজাদপুরে জঙ্গীদের অবস্থান জানতে পেরে র‌্যাবের গোয়েন্দা বিভাগ ভোর রাতে অভিযান শুরু করে। র‌্যাবের অবস্থান টের পেয়ে জঙ্গীরা র‌্যাবকে উদ্দেশ্য করে গুলিবর্ষণ করে। হতাহত আটকাতে র‌্যাব কৌশল পরিবর্তন করে প্রথমে বাড়িটিকে ঘিরে রাখে। পরবর্তীতে র‌্যাবের অতিরিক্ত পরিচালক (অপারেশন) কর্নেল তোফায়েল মোস্তফা সারোয়ারের নেতৃত্বে নতুনভাবে অপারেশন পরিচালিত হয়।

মাইকে জঙ্গীদের আত্মসমর্পণের আহ্বান জানানো হয়। দীর্ঘ প্রচেষ্টার পর জঙ্গীরা আত্মসমর্পণের সিদ্ধান্ত নেয়। বেলা সাড়ে এগারোটার দিকে র‌্যাব তাদের গ্রেফতার করেন।

সফল অভিযান পরিচালনা শেষে র‌্যাবের এডিসি (অপারেশন) কর্নেল তোফায়েল মোস্তফা সারোয়ার সংবাদ সম্মেলনে জানান, বৃহস্পতিবার রাতে রাজশাহীর শাহ মখদুম থানায় অভিযান চালিয়ে জেএমবির রাজশহী বিভাগীয় আমির জুয়েল আলী ওরফে মাহমুদসহ তিন জনকে গ্রেফতার করা হয়। গ্রেফতারের পরে তাদের জিজ্ঞাসাবাদে বেরিয়ে আসে শাহজাদপুরে আরও জঙ্গীদের অবস্থান জানা যায়।

সেই সূত্র ধরেই শাহজাদপুরে শুক্রবার ভোর পাঁচটায় অভিযান শুরু করা হয়। প্রথমে জঙ্গীরা র‌্যাবকে উদ্দেশ্য করে গুলিবর্ষণ শুরু করে। পরে ওই বাড়িতে দুটি বিদেশী পিস্তল, গানপাউডার, বোমা তৈরির সরঞ্জাম ও পতাকা পাওয়া যায়।

এমন ঘটনার ২৫ দিন আগে শাহজাদপুরে শেরখালীর এই বাড়িটি ভাড়া নিয়ে বসবাস শুরু জঙ্গীরা। তবলীগ জামায়াতের সঙ্গে মিশে তারা নিজেরা সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা করছিল। বৃহস্পতিবার তাদের সাংগঠনিক মিটিং ছিল। সেই খবর জানতে পেরেই অভিযান পরিচালনা করা হয়।

র‌্যাবের লিগ্যাল এ্যান্ড মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল আশিক বিল্লাহ সাংবাদিকদের জানান, এর আগে বৃহস্পতিবার রাতে রাজশাহীর মখদুম থানা এলাকা থেকে জামায়াতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশের (জেএমবি) আঞ্চলিক কমান্ডারসহ তিন জঙ্গীকে আটক করা হয়। তারা হচ্ছে আঞ্চলিক কমান্ডার জুয়েল ওরফে হাবিবুল্লাহ ওরফে মাহমুদ (৩৬), বাড়ি নাটোর জেলার বাগাতি পাড়ায়। খুলনার খালিশপুরের আশরাফুল ইসলাম (২৪) এবং পাবনা জেলার সাঁথিয়া থানার আলিফ হোসেন (২২)। তাদের দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর উপজেলার উকিলপাড়ার ওই বাড়িতে অভিযানের চালানো হয়। আটকের পর তাদের ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। জঙ্গীরা আটককৃতরা র‌্যাব হেফাজতে রয়েছেন।

এদিকে শাহজাদপুর উপজেলার শেরখালীতে জঙ্গী গোষ্ঠীর অবস্থানের খবর জানতে পেরে উৎসুক জনতার ভিড় জমে যায়। শাহজাদপুরবাসী জঙ্গীদের অবস্থান জানতে পেরে অনেকে আতঙ্কিতও হয়ে যান।

এদিকে শুক্রবার বিকেলে ঢাকার উত্তরা ১০ নম্বর সেক্টরের ১৩ নম্বর রোডের একটি নির্মাণাধীন বাড়ি থেকে ৩১টি হাত বোমা উদ্ধার হয়েছে। খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে ছুটে যান ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) বম্ব ডিসপোজাল ইউনিট। ওই বাড়িতে বোমা থাকার সংবাদ পেয়ে বেলা চারটা থেকেই বাড়িটি ঘিরে রাখে পুলিশ। এরপর একে একে বাড়ি থেকে উদ্ধার হয় ৩১টি তাজা বোমা। পরে বোমাগুলো নিষ্ক্রিয় করা হয়।

ঢাকা মহানগর পুলিশের মিডিয়া বিভাগের উপকমিশনার প্রকৌশলী মোঃ ওয়ালিদ হোসেন জানান, ওই বোমাগুলো মজুদে জড়িত থাকার অভিযোগে তুরাগ থানা এলাকার সুমন ও মামুন নামের দুজনকে আটক করা হয়েছে। তারা দুজনই স্থানীয় যুবদলের নেতা। তারা কেন সেখানে হাতবোমাগুলো মজুদ করেছিল, সে বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।

পুলিশ ও গোয়েন্দাদের ধারণা, ঢাকা-১৮ আসনে উপনির্বাচনে ভোট গ্রহণের দিন ওই এলাকায় চারটি বোমা বিস্ফোরিত হয়েছিল। ওই ঘটনায় কয়েকজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তাদের দেয়া তথ্যমতে কামারপাড়া থেকে অবিস্ফোরিত বোমাগুলো উদ্ধার করা হয়েছে। পুলিশের ধারণা অবিস্ফোরিত বোমাগুলো উপনির্বাচনের ভোট গ্রহণের দিন ব্যবহারের কথা ছিল। বোমা মজুদের সঙ্গে বিএনপি-জামায়াত-শিবির ছাড়াও জঙ্গীরা জড়িত থাকতে পারে।

পুলিশের এন্টি টেররিজম ইউনিটের অতিরিক্ত উপমহাপরিদর্শক মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান জানান, নিষিদ্ধ জঙ্গী সংগঠনের সদস্যরা নতুন করে সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা করে যাচ্ছে। বিশেষভাবে হিযবুত তাহরীরের সদস্যরা বেশি সক্রিয়। জঙ্গীরা করোনার কারণে ঘরে থাকা মানুষদের নানাভাবে জঙ্গীবাদে টানার চেষ্টা করছে। কারণ ঘরে থাকা অধিকাংশ মানুষই ইন্টারনেট ব্যবহার করছেন। সে সুযোগটিকে পুরোপুরি কাজে লাগানোর চেষ্টা করে যাচ্ছে।

সম্প্রতি ঢাকার রাজধানীর নর্দ্দা, ভাটারা ও বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা থেকে গ্রেফতার হয় হিযবুত তাহরীরের ছয় জঙ্গী। তারা হচ্ছে, সোহেল (২৯), নূর মোহাম্মদ ওরফে অরুণ ওরফে নুর (৩০), ইব্রাহিম খলিল উল্লাহ (২১), অর্ণব হাসান (২১), সাইফুর রহমান বাবর (৩০) ও নূর মোহাম্মদ শাকিল (২৬)। তাদের কাছে অনলাইন সম্মেলনের ২৬টি পোস্টার পাওয়া গেছে। এরাও দেশে ইসলামী শাসন ব্যবস্থা কায়েম করতে চায়।

পুলিশের কাউন্টার টেররিজম বিভাগ বলছে, জেএমবিসহ কয়েকটি জঙ্গী সংগঠন নিষিদ্ধ হলে দলের সদস্যরা বিভিন্ন জঙ্গী সংগঠনে যোগ দিতে থাকে। তারমধ্যে অন্যতম হিযবুত তাহরীর। দেশে আধুনিক এই জঙ্গী সংগঠনটির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক ড. সৈয়দ গোলাম মাওলা।

বিএনপি-জামায়াতের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ মদদে ২০০৩ সালের ২৩ জানুয়ারি রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে এক গোল টেবিল বৈঠকে বাংলাদেশে দলটির আনুষ্ঠানিক কার্যকম চালুর ঘোষণা দেয়া হয়। এক মাস পর মার্চ মাস থেকেই হিযবুত তাহরীর আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু করে। তাদের সহায়তা করে আসছে ছাত্র শিবির।

রাজধানীতে থাকা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বুয়েটসহ সব সরকারী-বেসরকারী উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে হিযবুত তাহরীরের কার্যক্রম চলত। এই জঙ্গী সংগঠনটির সঙ্গে দেশীয় ইসলামী ও জঙ্গী সংগঠন ছাড়াও আন্তর্জাতিক জঙ্গী সংগঠন লস্কর-ই-তৈয়বা, জৈইশ-ই-মোস্তফা, উলফা, কমতাপুর লিবারেশন ফ্রন্ট, আফিস রেজা কমান্ডো ফোর্সসহ বহু বিদেশী উগ্র ও জঙ্গী সংগঠনের সঙ্গে যোগাযোগ গড়ে তুলে। বিগত বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে কতিপয় বিএনপি ও জামায়াতের বেশ কয়েকজনের প্রত্যক্ষ মদদে হিযবুত তাহরীর নামের জঙ্গী সংগঠনটি গঠন করা হয়। মূলত দেশের সব নিষিদ্ধ জঙ্গী সংগঠনের জঙ্গীদের একত্রিত করতেই দলটি গঠন করা হয়েছিল। সর্বশেষ ২০০৯ সালের ২৪ এপ্রিল স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় হিযবুত তাহরীরের কার্যক্রম বাংলাদেশে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে।

পুলিশের এন্টি টেররিজম ইউনিটের প্রধান অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক কামরুল আহসান জানান, জঙ্গীরা দেশে খিলাফত বা ইসলামী আইন কার্যকর করতে চায়। এজন্য তারা নানাভাবে মানুষকে জঙ্গীবাদের দিকে টানার চেষ্টা করছে। করোনার কারণে অধিকাংশ মানুষ ঘরে থাকছেন। তারা ইন্টারনেট ব্যবহার করছেন। সেই সুযোগটিকেই পুরোপুরি কাজে লাগানোর চেষ্টা করে যাচ্ছে জঙ্গীরা। এজন্য সারাদেশে জঙ্গীবাদবিরোধী ধারবাহিক অভিযান অব্যাহত আছে। একের পর এক জঙ্গী গ্রেফতার হচ্ছে। গ্রেফতারকৃতদের অধিকাংশই নিষিদ্ধ জঙ্গী সংগঠন হিযুবত তাহরীর, আল্লাহর দল, আনসারুল্লাহ বাংলা টিম, জেএমবি, নব্য জেএমবি ও আনসার আল ইসলামের সদস্য। সম্প্রতি নিষিদ্ধ পুরনো জঙ্গী সংগঠন হুজি বা হরকাতুল জিহাদে যোগদান করা কিছু যুবকও গ্রেফতার হয়েছে। হুজিও নতুন করে দল গোছানোর চেষ্টা করছে।

সূত্রটি বলছে, গত ১৫ অক্টোবর মধ্যরাতে অনলাইনে প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে অপপ্রচার এবং উগ্রবাদ প্রচারের দায়ে ঢাকার গাবতলী বাস টার্মিনাল এলাকা থেকে মো. সোহেল রানা ওরফে সাইদুল ইসলাম সোহেল (২৬) নামে এক যুবককে গ্রেফতার করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদে সোহেল আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের একজন সক্রিয় সদস্য বলে স্বীকার করে।

তার কাছে জঙ্গীবাদের আলামতসহ একটি এন্ড্রয়েড মোবাইল সেট, একটি বাটন মোবাইল সেট, ছয়টি বিভিন্ন অপারেটরের সিম কার্ড, একটি পেনড্রাইভ ও পিডিএফ আকারে বিভিন্ন উগ্রবাদী ও উস্কানিমূলক কনটেন্ট পাওয়া গেছে। সে গাজওয়াতুল হিন্দ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে দীর্ঘদিন যাবত অনলাইন প্রচারণাসহ রাষ্ট্রবিরোধী ষড়যন্ত্র করে আসছিল। তারা দেশে খিলাফত প্রতিষ্ঠা অর্থাৎ ইসলামী শাসন ব্যবস্থা কায়েমের উদ্দেশে বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছিল।

এই পুলিশ কর্মকর্তা জানান, উগ্রবাদী কার্যক্রমে সাধারণ মানুষকে উদ্বুদ্ধ করতে জঙ্গীরা ফেসবুকে গোপনে গ্রুপ খুলে দেশের শান্তি-শৃঙ্খলা বিনষ্ট করার চেষ্টা করছে। তারা দেশের নিরাপত্তা, স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব বিনষ্ট করার পাশাপাশি রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় হামলার পরিকল্পনা করছে। জঙ্গীরা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট করে দেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত।

জঙ্গীবাদ নিয়ে কাজ করা পুলিশের বিভিন্ন ইউনিট ও গোয়েন্দা সংস্থার তথ্য মোতাবেক, শতকরা সত্তর শতাংশ জঙ্গী দল পরিবর্তন করেছে। তবে তারা আদর্শ থেকে সরে যায়নি। তাদের একটাই লক্ষ্য দেশে ইসলামী হুকুমত বা শাসন কায়েম করা। দল পরিবর্তন করার পর তারা নিজেদের নামও পরিবর্তন করে ফেলে। গ্রেফতার এড়াতেই তারা এমন কৌশল নিয়েছে। অধিকাংশ জঙ্গী গ্রেফতার এড়াতে জাতীয় পরিচয়ত্র করে না। সব জঙ্গী সংগঠন দেশে ইসলামী শাসন ব্যবস্থা কায়েম করার লক্ষ্য নিয়ে এগুচ্ছে। তাদের সরাসরি মদদ দিচ্ছে যুদ্ধাপরাধীদের দল হিসেবে পরিচিত দেশের অন্যতম একটি ইসলামী দল। দলটি বিএনপির সঙ্গে বহু বছর ধরে গাঁটছড়া বেঁধে রয়েছে। হালের জঙ্গীদের অধিকাংশই প্রযুক্তি নির্ভর। যে সংগঠন যত বেশি গোপন প্রযুক্তি ব্যবহারে পারদর্শী, সেই জঙ্গী সংগঠনের দিকে অন্যান্য জঙ্গী সংগঠনের সদস্যদের ঝুঁকে পড়ার ঝোঁক বেশি।

জঙ্গীদের দল পরিবর্তন করার সুনির্দিষ্ট তথ্য প্রথম প্রকাশ পায় ২০১০ সালের ২৪ মে জেএমবি আমীর ও জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় শূরা কমিটির সাবেক সদস্য মুফতি মাওলানা সাইদুর রহমান জাফর গ্রেফতার হওয়ার পর। এমনকি দেশীয় জঙ্গীদের আত্মঘাতী হামলা চালানোর বিষয়টিও প্রকাশ পায় ওই সময়ই।

জেএমবি আমীরের দেয়া জবানবন্দীতে উঠে আসে দেশে সব ইসলামী ও জঙ্গী সংগঠনের সঙ্গে জামায়াতে ইসলামীর যোগাযোগ থাকার বিষয়টি। এমনকি পুরনো সম্পর্কের জের ধরে জামায়াতের নামানুসারে জঙ্গী সংগঠনটির নাম রাখা হয় জেএমবি বা জামায়াতুল মুজাহিদীন। যদিও এমন অভিযোগ বরাবরই জামায়াতে ইসলামী ভিত্তিহীন বলে দাবি করে আসছে।

জেএমবি প্রধানের ভাষ্য মোতাবেক, তিনি ছাত্র শিবিরের মৌলভীবাজার জেলা শাখার সভাপতি, জামায়াতে ইসলামীর মৌলভীবাজার জেলা শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক, জেলা শাখার আমির ও জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় শূরা সদস্যও ছিলেন। ওই সময় থেকেই তার সঙ্গে জেএমবির যোগাযোগ ছিল। বিগত বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে ২০০৬ সালে দলের নির্দেশে সাইদুর রহমান আনুষ্ঠানিকভাবে জেএমবির প্রধান হিসাবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। জেএমবির আশি ভাগ সদস্যই ছাত্র শিবিরের।

পুলিশের এন্টি টেররিজম ইউনিটের অতিরিক্ত উপমহাপরিদর্শক মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান বলেন, শুধু সব জঙ্গী সংগঠন নয়, দেশের অধিকাংশ ইসলামী সংগঠনের লক্ষ্য দেশে ইসলামী শাসন ব্যবস্থা কায়েম করা। জঙ্গীবাদ দমনে নানামুখী কার্যক্রম অব্যাহত আছে।

র‌্যাবের ইন্টেলিজেন্স উইংয়ের পরিচালক লে. কর্নেল সারওয়ার-বিন-কাশেম বলেন, জঙ্গীবাদ-সন্ত্রাস দমনে বাংলাদেশ বলতে গেলে প্রায় শতভাগের কাছাকাছি সফল। হলি আর্টিজানের পর শুধু র‌্যাবই জঙ্গীবাদ বিরোধী পাঁচ শতাধিক অভিযান চালিয়েছে। যার মধ্যে ১৭টিই ছিল জঙ্গী আস্তানা। অভিযানে প্রায় আড়াই হাজার জঙ্গী গ্রেফতার হয়েছে। ধারাবাহিক অভিযানে এখনও জঙ্গী গ্রেফতার হচ্ছে। র‌্যাবের চালানো অভিযানকালে মারা গেছে ২৫ জঙ্গী। আত্মসমর্পণ করেছে সাত জঙ্গী। উদ্ধার হয়েছে প্রায় সাড়ে ১৫ কেজি উচ্চমাত্রার বিস্ফোরক, নানা ধরনের বহু অস্ত্র, আত্মঘাতী হামলা চালানোর নানা সরঞ্জামাদিসহ নানা আলামত এবং জঙ্গীবাদে অর্থায়নের জন্য মজুদ করা কয়েক কোটি টাকা। যা রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা করা হয়েছে।

পুলিশের একজন উর্ধতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, ১৯৯৯ সাল থেকে চলতি বছর হালানাগদ পর্যন্ত সারাদেশে জঙ্গী সংক্রান্ত এক হাজারের বেশি হামলা হয়েছে। এসব মামলার আসামি হিসেবে গ্রেফতার হয়েছে ৫ হাজারের বেশি জঙ্গী। যাদের মধ্যে অনেকেই জামিনের পর পলাতক রয়েছে।

ঢাকা মহানগর পুলিশের কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিটের প্রধান ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার মনিরুল ইসলাম বলেন, আমরা জঙ্গীবাদ ও সন্ত্রাসবাদের মূলোৎপাটন করতে চাই। সে লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছি। করোনা পরিস্থিতির মধ্যেও তারা কৌশলী অভিযান অব্যাহত রেখেছেন।

পুলিশের সাইবার বিভাগ ও জঙ্গীবাদ নিয়ে কাজ করা সূত্রগুলো বলছে, ফেসবুকে আনসার আল ইসলাম গাজওয়াতুল হিন্দ সমর্থনকারী বিভিন্ন আইডির সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখত। জঙ্গীরা ফেসবুক আইডি ‘মুজাহিদ ইন লোন উলফ’ ও টেলিগ্রাম আইডি ‘জিহাদী সৈনিকসহ নানা আইডি ও গ্রুপ তৈরি করে জঙ্গী তৎপরতা চালানোর চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। এসব মাধ্যমে গ্রেফতারকৃতরা বিভিন্ন গ্রুপ ও চ্যানেলে যুক্ত হয়ে নিয়মিত প্রচার চালিয়ে আসছিল। জনকণ্ঠ

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত