প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

সিলেট কারাগার: বরাদ্দের অনেক কিছুই নেই বন্দিদের খাবারে

যুগান্তর: সিলেট কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দিদের খাবার পরিবেশনে বড় ধরনের অনিয়ম পেয়েছে তদন্ত কমিটি। এ বিষয়ে গঠিত তদন্ত কমিটির কাছে ১৫ বন্দি তাদের জবানবন্দিতে খাবারের মান নিয়ে ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরেছেন। অথচ তদন্ত কমিটির রিপোর্টে দায়ীদের শুধু সতর্ক করা হয়েছে, যা রহস্যজনক বলেছেন সংশ্লিষ্টরা।

‘সিলেট কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দিদের খাবার ও রক্ষীদের রেশনে ব্যাপক দুর্নীতি’ শিরোনামে ২৩ সেপ্টেম্বর তথ্যবহুল সংবাদ প্রকাশিত হয়। ওই দিনই কারা অধিদফতর চট্টগ্রাম বিভাগের কারা উপমহাপরিদর্শক একেএম ফজলুল হককে আহ্বায়ক ও মুন্সীগঞ্জের জেলার দেওয়ান মো. তারিকুল ইসলামকে সদস্য সচিব ও নেত্রকোনার জেল সুপার আবদুল কুদ্দুসকে সদস্য করে তিন সদস্য বিশিষ্ট তদন্ত কমিটি করা হয়। কমিটি ১ অক্টোবর কারা অধিদফতরে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয়। তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের বিভিন্ন অংশে অনিয়ম-দুর্নীতির চিত্র বেরিয়ে আসে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, অনিয়ম ও দুর্নীতির শাস্তি কোনো ক্রমেই ‘সতর্ক’ করা হতে পারে না। তিনি বলেন, যেখানে তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে খাবার পরিবেশনে দৃশ্যত অনিয়ম হয়েছে, সেখানে শুধু সতর্ক করা হয় কীভাবে? তাই যথাযথ অনুসন্ধান সাপেক্ষে তদন্ত প্রক্রিয়া শেষ করতে হবে। তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী দায়ীদের চিহ্নিত করা খুব সহজ ও সম্ভব। কঠিন কিছু নয়। তাই এ অনিয়ম বন্ধ করতে হলে দায়ীদের অবশ্যই দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি বা জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। না হলে শুধু ‘সতর্ক’ অনিয়ম বাড়াবে, ঝুঁকিটা থেকেই যাবে।

প্রতিবেদনে দেখা যায়, কোনো প্রকার রাখডাক না রেখেই বিক্ষুব্ধ বন্দিরা সরাসরি তদন্ত কমিটির কাছে বলেছেন, খাবার রান্না ও মান ভালো নয়। স্বাদ না হওয়ায় তরকারি খেতে সমস্যা হয়। ৪-৫ প্রকার তরকারির সমন্বয়ে সবজি রান্না করা হলেও কচুরমুখী ও কাঁকরোল প্রতিদিনই অধিক পরিমাণে দেয়া হয়।

এদিকে বন্দিদের খাদ্যের মেনু, স্টোর অর্ডার, গেট আর্টিকেল, ডায়েট রোল ও বণ্টন রেজিস্টার পর্যালোচনার উদ্ধৃতি দিয়ে তদন্ত প্রতিবেদনের এক জায়গায় বলা হয়, ‘খাদ্যের মেনু অনুযায়ী তরকারি সরবরাহ করা হয়েছে। তবে মেনুতে আলু উল্লেখ থাকলেও তরকারি কেনার সময় স্টোর থেকে আলু কেনার অর্ডার দেয়া হয়নি। আলুর পরিবর্তে অন্য সবজি নেয়া হয়েছে।’

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সিলেট কেন্দ্রীয় কারাগারে খাদ্যদ্রব্যের টেন্ডারে অংশগ্রহণকারী ঠিকাদারদের মধ্যে বিভিন্ন খাদ্যদ্রব্যের মূল্য দাখিলের ক্ষেত্রে অস্বাভাবিক কম দর দাখিল করার প্রতিযোগিতা রয়েছে। কাজ পাওয়ার জন্য প্রতিটি আইটেমের বিপরীতে যে দর দেয়া হয় তা দিয়ে বর্তমানে সেগুলো আদৌ কেনা সম্ভব নয়। বিশেষ করে মাছ, মাংস, তরিতরকারিসহ বিভিন্ন পণ্যের দাখিলকৃত দর বাজার দরের চেয়ে অধিক কম। ফলে যে বা যারাই কাজ পেয়ে থাকেন তারা সরবরাহকৃত সবজির মান কখনও বজায় রাখার চেষ্টা করেন না।

এ বিষয়ে সিলেট কেন্দ্রীয় কারাগারের বিতর্কিত বিদায়ী সিনিয়র জেল সুপার আবদুল জলিলকেও জিজ্ঞাসাবাদ করেন তদন্ত কমিটি। তদন্ত কমিটির কাছে তিনি বলেন, ‘একেকজন বন্দির রুচি একেক রকম। বন্দিদের রান্না বন্দিরাই করেন। বন্দিদের রান্নার জন্য নির্ধারিত কোনো বাবুর্চি নেই। মাঝে-মধ্যে রান্নায় অভিজ্ঞ বন্দি জামিন বা মুক্তি পেয়ে বের হয়ে গেলে নতুন আরেকজন রান্নার দায়িত্ব পালন করেন। এ কারণে স্বাদ ভিন্ন হতে পারে।’ কিন্তু আবদুল জলিলের এ বক্তব্যের সঙ্গে বাস্তবতার কোনো মিল নেই। যারা রান্নার দায়িত্বে আছেন বিশেষ সূত্রের মাধ্যমে তারা যুগান্তরকে জানিয়েছেন, রান্না করার জন্য সাধারণত পরিমাণমত যা যা লাগে তা কখনও দেয়া হয় না। এ কারণে তারা কেন, বিশ্বের সেরা রাঁধুনি ভাড়া করে আনলেও জেলাখানার রান্না কোনোদিন ভালো হবে না। কারণ বন্দিদের জন্য বরাদ্দের বেশিরভাগই লুটপাট করা হয়। এর জন্য দায়ী জেল সুপার ও জেলার। তাদের হাতেই ভালো-মন্দ নির্ভর করে।

তদন্ত কমিটির সভাপতি একেএম ফজলুল হক যুগান্তরে প্রকাশিত তথ্যের সত্যতা সম্পর্কে সিলেটের জেলা প্রশাসক এম কাজী এমদাদুল ইসলামকে ফোন করেও জানতে চান। জেলা প্রশাসকের বরাত দিয়ে তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, তিনি প্রতি মাসে কারাগার পরিদর্শনসহ সব সময় কারাগারের খোঁজখবর রাখেন। কারাগার পরিচালনা নিয়ে তিনি সিলেট কারা প্রশাসন সম্পর্কে সন্তোষ প্রকাশ করেন বলেও তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

কারা প্রশাসনের এক কর্মকর্তা যুগান্তরকে বলেন, সিলেট জেলা প্রশাসক মহামারী করোনা শুরু হওয়ার পর ২১ সেপ্টেম্বর কারা পরিদর্শনে গেছেন। দীর্ঘ ৫ মাস সশরীরে তিনি কারাগারে যাননি। তিনি কীভাবে সন্তোষ প্রকাশ করলেন তা রহস্যজনক। তবে এ বিষয়ে ডিসির বক্তব্য নেয়া সম্ভব হয়নি। মুঠোফোনে তাকে এ বিষয়ে খুদেবার্তা পাঠানো হলেও তিনি কোনো প্রত্যুত্তর দেননি।

এদিকে দায়ী ব্যক্তি চিহ্নিতকরণ ও মতামত দিয়ে তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘সিলেট কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দিদের খাবার ও বন্দিদের রেশন, রক্ষীদের ডিউটি বণ্টন ও অফিসে বেশ কিছু সংখ্যক কারারক্ষী দীর্ঘদিন ধরে কর্মরত আছেন। তাদের কাজের ব্যাপারে সিনিয়র জেল সুপার (আবদুল জলিল) ও জেলারের (মুজিবুর রহমান) সঠিক তদারকির ঘাটতি রয়েছে বলে তদন্ত কমিটি মনে করে। বন্দিদের খাবারের মান ও বন্টনে সিনিয়র জেল সুপার ও জেলারের আরও নজরদারির প্রয়োজন ছিল।

প্রতিবেদনের সুপারিশ করে বলা হয়, জেল সুপার আবদুল জলিল ও জেলার মুজিবুর রহমানকে কারারক্ষীদের রেশন বণ্টন ও বন্দিদের খাবার তদারকিসহ তাদের অভিযোগ শ্রবণ ও সমস্যা সমাধানের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট বিধিবিধান ও সার্কুলার অনুসরণে অধিক যত্নবান হওয়ার জন্য সতর্ক করা যেতে পারে। সিলেট কেন্দ্রীয় কারাগারসহ বাংলাদেশের সব কারাগারে প্রতিটি ওয়ার্ডে প্রতিদিনের প্রাপ্য খাদ্য তালিকা ঝুলিয়ে রাখার নির্দেশ দেয়া যেতে পারে। সিনিয়র জেল সুপার, জেল সুপার, জেলার কর্তৃক প্রতিটি বন্দি ওয়ার্ড, সেল, হাসপাতাল, সাধারণ চৌকা ও অন্যান্য স্থাপনা নিয়মিত পরিদর্শন করার জন্য নির্দেশ দেয়া যেতে পারে। দীর্ঘদিন কারারক্ষীদের একই দায়িত্বে না রাখার জন্য কারা কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেয়া যেতে পারে।

এদিকে সূত্র জানায়, যে ডিআইজির নেতৃত্বে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে সেই একেএম ফজলুল হক নিজেই তো সিলেট বিভাগের ভারপ্রাপ্ত কারা উপমহাপরিদর্শকের দায়িত্বে ছিলেন। এ অনিয়মের দায় তিনিও এড়িয়ে যেতে পারেন না। মূলত যার ওপর দায় বর্তায় তাকে এ অনিয়ম-দুর্নীতির তদন্ত করতে দেয়া হয়েছে। ফলে তিনি কোনোমতে দায়সারা রিপোর্ট দিয়ে জড়িতদের রক্ষা করার অপচেষ্টা করেছেন। এছাড়া সিলেট কারা ডিআইজি অফিসে কর্মরত উচ্চমান সহকারী কিরণ তালুকদার ৯ বছর ধরে ধরাকে সরা জ্ঞান করেন। তাকে কেউ কিছু বলে না। কারণ সব দুর্নীতির সাক্ষী এ কিরণ। মদ্যপ অবস্থায় প্রকাশ্যে মতালামি করলেও ডোপ টেস্ট করে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয় না।

জানতে চাইলে তদন্ত কমিটির সভাপতি কারা ডিআইজি একেএম ফজলুল হক বলেন, বন্দিদের জবানবন্দিতে যেভাবে অনিয়ম তুলে ধরা হয়েছে। আমরা প্রতিবেদন জমা দিয়েছি।

 

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত