প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

দীপক চৌধুরী : নারীর জন্য নিরাপদ সমাজ তৈরি করতে একটি সময়োপযোগী পদক্ষেপ নিলো পুলিশ

দীপক চৌধুরী: আকর্ষণীয়, মুগ্ধ ও প্রলুব্ধ করার জন্য যে শক্তির ওপর আমাদের দাঁড়ানোর দরকার, যার ওপর ভিত্তি করে গণতন্ত্রের শাসন দাঁড়ায় এখান থেকে সম্ভবত আমরা অনেক দূরে রয়েছি। আমরা কী মানুষকে ভালোবাসতে শিখিনি এখনো? যেমন বাংলাদেশ পুলিশবাহিনীর কথাই বলি না কেনো? পুলিশবাহিনী সমাজের নানারকম সামাজিক কাজে অংশগ্রহণ করে থাকে। পরিত্যক্ত-পঁচা লাশ উদ্ধার, পঞ্চাশ টুকরো লাশের পরিচয় বের করা, করোনায় নিহতব্যক্তির লাশ উদ্ধার করে সমাহিত করা, সাক্ষীকে এনে কোর্টে বিচারকের সামনে হাজির করা বা কুখ্যাত ধর্ষক ও খুনিকে আদালতে উপস্থিত করা। হত্যামামলার চার্জশিট দেওয়া, জীবনবাজি রেখে সিরিয়াল কিলারদের পাকড়াও করা অতঃপর আদালতে হাজির করা। এতো কাজ করার পরও পুলিশকে নেতিবাচক দৃষ্টিতে দেখার কারণ অনুসন্ধান করা জরুরি। সকল সময়ই কিন্তু আমরা পুলিশকে প্রতিপক্ষ হিসেবে দাঁড় করাই। আমরা একবারও ভাবি না বা ভাবতে চাই না বাংলাদেশ পুলিশ ভীনগ্রহ থেকে আসেনি। তারা আমাদেরই ভাই, বোন, চাচা-চাচি, খালা-খালু বা সম্মানিত আত্মীয় যে কেউ হতে পারে। আমি বোঝাতে চেয়েছি তারা আমাদের প্রাণের মানুষ। এই সমাজে পুলিশকে প্রিয় করে তুলতে তাদের রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করে শতভাগ স্বাধীনভাবে কাজ করতে দিতে হবে। এই সত্যকে অস্বীকার করা যায়?

দেশে এ মুহূর্তে আলোচিত ইস্যু ধর্ষণ ও নারী নির্যাতন। এমন একটি জটিল ও মারাত্মক ইস্যুর ব্যাপারে বাংলাদেশ পুলিশের এই প্রতিবাদ সভা অবশ্যই আমাদের চোখ খুলে দিয়েছে। একযোগে সারাদেশে ধর্ষণবিরোধী সমাবেশ করেছে পুলিশ। এ ধরনের প্রতিবাদী সভা-সমাবেশ অতীতে হয়েছে বলে আমার মনে হয়নি। শুধু তাই নয়, এ ধরনের প্রতিবাদী সমাবেশ কোনোকালে কোনোদিন পুলিশ চিন্তাও করেনি। কেন যেনো মনে হচ্ছে ড. বেনজীর আহমেদ বাংলাদেশ পুলিশের আইজিপি না হলে এটা কোনোদিনই সম্ভব হতো না। পুলিশ কর্তৃক আয়োজিত প্রতিবাদী সমাবেশ কখনো হতো না। তিনি সবসময়ই ব্যতিক্রম। অসাধারণ মেধাবী পুলিশ মহাপরিদর্শকের গণমুখী প্রতিটি কাজকে সম্মান দিতে হবে। তাঁর দেশপ্রেম বা জনগণ নিয়ে ভাবনা প্রকৃতপক্ষেই আলোর গতিপথ বিস্তৃত করে। এ ধরনের গণমুখী উদ্যোগ মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাতকেও শক্তিশালী করবে। কাউকে আঘাত দিতে বা আহত করার উদ্দেশে বলছি না, বাস্তবতার আয়নায় বলছি। আমাদের যারা বুদ্ধিজীবী, তারা সমাবেশ-সিম্পোজিয়াম-সেমিনারে আলোচনাকালে বলে থাকেন, ধর্ষণবিরোধী সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। কিন্তু সামাজিক প্রতিরোধটি কীভাবে গড়ে তোলা সম্ভব- এটা বলেন না। এই যে কথামালার ফাঁক এটা তুলে ধরতে হবে। ‘বায়বীয় আলোচনা’য় নারী নির্যাতন প্রতিরোধের মতো কঠিন কাজটি করা সম্ভব হবে না। বাস্তবমুখী পদক্ষেপ অতীব জরুরি। পরিসংখ্যান বলছে, দেশে ধর্ষণসংক্রান্ত মামলায় গত ১১ বছরে পাঁচজনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে। দলবদ্ধভাবে ধর্ষণ এবং এককভাবে ধর্ষণের পর হত্যা বা মৃত্যু ঘটানোর অপরাধে এই মুহূর্তে দেশের বিভিন্ন কারাগারে রয়েছেন মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত আরও ১৪৪ জন। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নথিপত্রে জানা যায়, পাঁচজনের মধ্যে একজনের ফাঁসি হয় ধর্ষণের পর হত্যার দায়ে। দলবদ্ধভাবে ধর্ষণের পর হত্যার দায়ে ফাঁসি হয় বাকি চারজনের। ধর্ষণের পর হত্যায় এবং দলবদ্ধভাবে ধর্ষণের ক্ষেত্রে মৃত্যুদণ্ডের বিধান আগে থেকেই রয়েছে। এরপরও কিছুদিন ধরে এ ব্যাধি চরম আকার ধারণ করে।

অনেকের মধ্যে সন্দেহ ছিল- নারী নির্যাতনবিরোধী সমাবেশ পুলিশ করতে পারবে কিনা। কিন্তু বাস্তব সত্য হলো এটা পুলিশ করেছে। ধর্ষণকারীদের বিরুদ্ধে পুলিশ প্রতিবাদ জানিয়ে সমালোচকদের দেখিয়েছে, যে এটা পুলিশ করতে সক্ষম। ধর্ষণ ও নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক আন্দোলনের মধ্যে এ বিষয়ে সমাবেশ করেছে পুলিশ। নিজের কৌতূহল থেকেই দেখলাম, শনিবার সকালে ঢাকা মহানগরসহ সারা দেশে ধর্ষণ ও নারী নির্যাতনবিরোধী এই সমাবেশ করেছে পুলিশ। এ বিষয়ে পুলিশ সদরদপ্তরের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষার পাশাপাশি ধর্ষণ, নারী ও শিশু নির্যাতনের প্রতিটি ঘটনায় অপরাধীকে আইনের আওতায় আনার লক্ষ্যে পেশাদারিত্বের সাথে নিরলসভাবে দায়িত্ব পালন করছেন পুলিশের প্রতিটি সদস্য।

এদেশের মানুষ মনে করে, এটা অতিগুরুত্বপূর্ণ একটি কাজ। দেশজুড়ে বাংলাদেশ পুলিশের উদ্যোগে ৬ হাজার ৯১২টি বিট পুলিশিং এলাকায় শনিবার একযোগে নারী ধর্ষণ ও নির্যাতন বিরোধী সমাবেশ অনুষ্ঠিত করা চাট্টিখানি কথা নয়। সমাবেশে সংশ্লিষ্ট বিট পুলিশিং এলাকার উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নারী, জনপ্রতিনিধি, শিক্ষক, মসজিদের ইমামসহ সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি- পেশার মানুষ অংশগ্রহণ করেছিলেন। প্রতিটি বিট পুলিশিং এলাকায় আয়োজিত এই সমাবেশে ধর্ষণ ও নারী নির্যাতন বিরোধী পোস্টার, লিফলেট ও প্ল্যাকার্ড প্রদর্শনের মাধ্যমে জনসাধারণকে এসব অপরাধের বিরুদ্ধে এগিয়ে আসার আহ্বান জানানো হয়। এ ধরনের ঘৃণ্য অপরাধের বিরুদ্ধে সচেতন হওয়ার জন্য উদাত্ত আহ্বান জানান পুলিশ কর্মকর্তারা। নির্যাতনের শিকার নারী ও শিশুর পাশে থাকার আহ্বান জানানো হয়। ধর্ষণ ও নির্যাতন বিরোধী সমাবেশ পুলিশ জানায়, নারী ও শিশু নির্যাতনসহ যেকোনও প্রকার অপরাধের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ পুলিশ সোচ্চার রয়েছে। সাধারণ মানুষের সহযোগিতা ও সমর্থনে এ ধরনের অপরাধ নির্মূলে প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করতে বদ্ধপরিকর বাংলাদেশ পুলিশ।

পুলিশ সদর দফতরের জনসংযোগ বিভাগের এআইজি মো. সোহেল রানা সাংবাদিকদের জানান, শনিবার সকাল ১০টায় পুলিশের উদ্যোগে সারাদেশে ছয় হাজার ৯১২টি বিটে একযোগে নারী-শিশু ধর্ষণ ও নির্যাতন-বিরোধী সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে। এই অনুষ্ঠান সরাসরি সম্প্রচার করা হয়েছে বাংলাদেশ পুলিশের বিট পুলিশিং কেন্দ্রের ছয় হাজার ৯১২টি ফেসবুক পেজে। সারাদেশে লাখ লাখ নারী ও পুরুষ সশরীরে উপস্থিত ছিলেন এবং কোটি কোটি দর্শক ও সাধারণ মানুষ এই সমাবেশ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেখেছেন। নিঃসন্দেহে ধর্ষণসহ নারী ও শিশু নির্যাতন-বিরোধী সচেতনতা সৃষ্টিতে এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। ইতোমধ্যেই প্রতিটি বিটের নিজস্ব একটি ফেসবুক পেজ খোলা হয়েছে। নারী ধর্ষণ ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে জনসচেতনতা তৈরির লক্ষ্যে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) ৫০টি থানার ৩০২টি বিট পুলিশিং এলাকায় একযোগে নারী ধর্ষণ ও নির্যাতন বিরোধী সমাবেশ করা হয়েছে। রিকশায় বসে যাওয়ার পথে দেখলাম, সকাল এগারোটায় সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে স্বাস্থ্যবিধি মেনে ডিএমপির সকল বিট এলাকায় একযোগে নারী ধর্ষণ ও নির্যাতন বিরোধী সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে। ধর্ষণ ও নির্যাতন-বিরোধী সমাবেশে পুলিশসহ স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি, জনপ্রতিনিধি, নারী ও শিশু অধিকারকর্মী, স্থানীয় নারী ও স্কুল-কলেজের ছাত্রীরা উপস্থিত ছিলেন। সমাবেশে তারা উল্লেখ করেন, ধর্ষণসহ যেকোনও প্রকার নারী ও শিশু নির্যাতন রোধে সমাজের সব স্তরের মানুষের মধ্যে ব্যাপক গণজাগরণ সৃষ্টি করা সম্ভব হলেই নির্যাতনের সাহস কেউ পাবে না।

আমরা এটা স্বীকার করি, পুলিশের একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ডিআইজির বোধোদয় অনেকখানি বার্তা পৌঁছে দিয়েছে আমাদের সমাজে। ‘যে সমাজে নারীরা নিরাপদ থাকবেন না, নিরাপদে স্কুল-কলেজে যেতে পারবেন না, বাড়িতে নিরাপদে বসবাস করতে পারবেন না- সে সমাজ কোনোদিন সভ্য সমাজে পরিণত হতে পারে না। বেগমগঞ্জে নারীকে নির্যাতন ও বিবস্ত্র ছবি ভাইরাল আমাদের পুলিশ বাহিনীর সঙ্গে গোটা জাতিকে লজ্জায় ফেলেছে বলে চট্টগ্রাম রেঞ্জ পুলিশের ডিআইজি আনোয়ার হোসেন মন্তব্য করেছেন। গতকাল সকালে বেগমগঞ্জের এখলাসপুর ফাজিল মাদ্রাসা ময়দানে নারী ধর্ষণ ও নারী নির্যাতনবিরোধী বিট পুলিশিং সমাবেশে তিনি এ কথা বলেন। নারী নির্যাতন বন্ধে অপরাধীকে প্রশ্রয় না দিতে বক্তব্য দিয়েছেন সিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (অপরাধ ও অভিযান) এসএম মোস্তাক আহমদ খান। এসব সমাবেশ থেকে নারী নির্যাতন প্রতিরোধে অপরাধীদের প্রশ্রয় না দিতে সাধারণ মানুষের প্রতি অনুরোধ জানিয়েছেন পুলিশ কর্মকর্তারা।

বিভিন্ন মামলার রায় বিশ্লেষণ করে গবেষকেরা বলছেন, মৃত্যুদণ্ডের ক্ষেত্রে প্রমাণের দায়ভার অনেক বড় হয়। সে ক্ষেত্রে চুলচেরা সুনিশ্চিত প্রমাণের অভাবে অভিযুক্ত ব্যক্তির খালাস পাওয়ার আশঙ্কা বাড়ে। নিম্ন আদালতে হওয়া মৃত্যুদণ্ডের বেশির ভাগ উচ্চ আদালতে টেকে না। বিচারপ্রার্থীর অপেক্ষার প্রহর দশকের পর দশক গড়ায়। এই বাস্তবতা আমাদের স্বীকার করতেই হবে। তবে মৃত্যুদণ্ডের রায় অপরাধীদের মধ্যে ভয় হিসেবে কাজ করবে বলে আমি বিশ্বাস করি। সম্প্রতি ধর্ষণের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড করা হয়েছে।

বঙ্গবন্ধুকন্যা মানুষের হৃদয়ের কথা বুঝতে পারেন। কখন কী করা উচিত তা অনুধাবন করেন। আপাদমস্তক রাজনীতিমনস্ক হলেও লেখক এবং চিন্তাবিদ আমাদের প্রিয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সর্বদাই তাঁর প্রিয় জনগণের প্রতি আত্মনিবেদিত।

লেখক: উপসম্পাদক, আমাদের অর্থনীতি, সিনিয়র সাংবাদিক ও কথাসাহিত্যিক

 

 

 

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত