প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

প্রভাষ আমিন: শুধু একটি মাস নয়, চিরদিনের জন্য বাংলাদেশ ক্রসফায়ারশূন্য হোক

প্রভাষ আমিন:  যারা ক্রসফায়ারের চাইছেন, মনে করছেন আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ক্রসফায়ারই একমাত্র সমাধান; তাদের আবেগটা বুঝতেও আমার অসুবিধা হয় না। বেগমগঞ্জের ভিডিওটি দেখার পর আরো অনেকের মত আমারও প্রচন্ড রাগ হয়েছে। আমিও দায়ীদের কঠিন শাস্তি চেয়েছি। কিন্তু কঠিন শাস্তি মানে কিন্তু ক্রসফায়ার নয়। আমি প্রচলিত আইনে দ্রুত তাদের শাস্তি চাই। আমি জানি, ক্রসফায়ার হলো প্রচলিত বিচার ব্যবস্থার প্রতি প্রবল অনাস্থার ফল। বাংলাদেশের আদালতগুলোর মামলাজট, বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা, প্রভাবশালী আসামীর বিরুদ্ধে কেউ সাক্ষি দিতে না যাওয়া, পুলিশের দুর্বল তদন্ত, আইনের নানা দুর্বলতা, বিত্তশালী আসামীর আইন এবং বিচার প্রক্রিয়া কিনে নেয়া ইত্যাদি নানাবিধ কারণে মানুষ ন্যায়বিচার পায় না। রাজনৈতিক ও অর্থের দাপটে অপরাধীরা বারবার পার পেয়ে যায়, সমাজে বুক ফুলিয়ে চলে। এসব কারণে মানুষ প্রচলিত বিচার ব্যবস্থার ওপর আস্থা হারিয়ে ফেলেছে। তারা মামলা, তদন্ত, দ্রুত বিচার, আইন-আদালতের ওপর ভরসা করতে চাচ্ছে না। তারা দ্রুত বিচার নয়, দ্রুততম বিচার চান। ধর তক্তা, মার পেরেক স্টাইল।
ক্রসফায়ারের সর্বশেষ যুক্তি হয়ে এসেছে বহুল আলোচিত অধ্যক্ষ গোপালকৃষ্ণ মুহুরী হত্যা মামলার বিচার প্রক্রিয়া। ২০০১ সালের ১৬ নভেম্বর চট্টগ্রামেরজামাল খান রোডে বাসায় ঢুকে অস্ত্রধারী ক্যাডাররা গোপালকৃষ্ণ মুহুরীকেহত্যা করে। ২০০৩ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে চার আসামি- নাছির, আজম, আলমগীর কবির ও তছলিমউদ্দিন মন্টুকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়। ২০০৫ সালের মার্চে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি নাছির র‌্যাবের ক্রসফায়ারে নিহত হয়। ২০০৬ সালে হাইকোর্ট রায়ে আজম, আলমগীর কবির ও তছলিমউদ্দিন মন্টুর মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখে। কিন্তু দীর্ঘ বিচার প্রক্রিয়া শেষে আজম, আলমগীর কবির ও তছলিমউদ্দিন মন্টুর মৃত্যুদণ্ড রদ করে আমৃত্যু কারাদণ্ডের আদেশ দিয়েছেন আপিল বিভাগ।
প্রথম কথা হলো, একটি হত্যা মামলার বিচার শেষ হতে ১৯ বছর লেগেছে। আর বিচারিক প্রক্রিয়ার চূড়ান্ত ধাপে অভিযুক্তদের সাজা কমে গেছে। এখন কেউ যদি বলেন, নাছিরের মত বাকি তিন আসামীকেও যদি র‌্যাব বা পুলিশ ২০০৫ সালেই ক্রসফায়ারে মেরে ফেলতো তাহলেই গোপাল কৃষ্ণ মুহুরীর পরিবার ন্যায়বিচার পেতো? কী জবাব দেবেন। তবে দীর্ঘসূত্রিতা বা বিচারহীনতার দোহাই দিয়েও বিচারবহির্ভূত কর্মকান্ডকে উস্কে দেয়ার সুযোগ নেই। আমাদের আসলে বিচার ব্যবস্থার সমস্যাগুলোর সমাধান করতে হবে। মামলা্জট কমানোর উপায় বের করতে হবে। বিচারক বাড়াতে হবে। তদন্ত যাতে ঠিকভাবে হয় তা নিশ্চিত করতে হবে। সাক্ষিরা যাতে নির্ভয়ে সাক্ষ্য দিতে পারে, তা নিশ্চিত করতে হবে। এলিট ফোর্স বানানোর পাশাপাশি এলিট কোর্ট বানাতে হবে। বিচার ব্যবস্থার ত্রুটিগুলো দূর করতে সরকারের ওপর চাপ দিতে হবে। কিন্তু বিচার ব্যবস্থার সমস্যার জগদ্দল সরানো অনেকে কঠিন। আর ক্রসফায়ার অনেক সহজ। তাই আমরা কঠিন দাবি না করে সহজ পন্থায় বিচারের উপায় বের করে নিয়েছি।
সমস্যা হলো বাংলাদেশে প্রচলিত বিচার প্রক্রিয়ার মৌলিক ধারণাটা হলো, দুই জন দোষী ছাড়া পেয়ে যাক, তবু কোনো নির্দোষ ব্যক্তি যেন সাজা না পান। শাস্তি দেয়ার আগে অভিযুক্ত ব্যাক্তির বিরুদ্ধে অপরাধ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হতে হয়। আর ক্রসফায়ারের ধারণাটা হলো, আটক ব্যক্তির ব্যাপারে
সন্দেহ হলেই পুলিশ তার মাথায় পিস্তল ঠেকিয়ে গুলি করে দিতে পারে। মারার পর খোঁজ শুরু হয়, তার বিরুদ্ধে কয়টি মামলা ছিল। মামলার তালিকা যত লম্বা, ক্রসফায়ারের বৈধতা যেন তত বেশি। মানুষের জীবন অমূল্য। কারণ বিজ্ঞানীরা অনেক কিছূ পেরেছেন, মানুষের জীবন বানাতে পারেননি। এবং পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষের প্রতিটি মানুষ আলাদা। একজনের আঙ্গুলের ছাপের সাথে আরেকজনেরটা মিলবে না। একজনের ডিএনএন’এর সাথে আরেকজনেরটা মিলবে না। প্রতিটি মানুষই
সৃষ্টিকর্তার অপার বিস্ময়। তাই সুনিশ্চিত না হলে মৃত্যুদন্ড দেয়া হয় না। এমনিতে বিশ্বের অনেকে দেশে মৃত্যুদন্ডের বিধান নেই। যেসব দেশের আছে, সেখানেও মৃত্যুদন্ড বাস্তবায়নের আগে অনেকগুলো ধাপ আছে। বাংলাদেশে নিম্ন আদালত, হাইকোর্ট, আপিল বিভাগ, রিভিউ, রাষ্ট্রপতির ক্ষমা- সব ধাপ শেষ হওয়োর পরই কেবল মৃত্যুদন্ড কার্যকর হয়। কিন্তু ক্রসফায়ারে কোনো ধাপ নেই, বিচার নেই, আপিল নেই। সন্দেহ হলেই ঢুশ। একই দেশে দুই ধরনের বিচার চলতে পারে না।
যতই ক্ষোভ থাকুক, আইনের ত্রুটি থাকুক, বিচারহীনতা থাকক; বিচারবহির্ভূত কোনো কিছু সমর্থন করার সুযোগ নেই। আইন পছন্দ না হলে সংশোধনের দাবি করবো, বিচার প্রক্রিয়ার কোনো ব্যত্যয় হলে প্রতিবাদ করবো। কিন্তু তাড়াহুড়ো করে কোনো অন্যায়কে প্রশ্রয় দেয়ার সুযোগ নেই। ‘জাস্টিস ডিলেইড, জাস্টিস ডিনাইড’ এটা যেমন সত্যি; আবার ‘জাস্টিস হারিড, জাস্টিস বারিড’; এটাও তো অসত্য নয়। তাই যৌক্তিক সময়ে বিচারের জন্য আমাদের র্ধৈয্য ধারণ করতে হবে। যে দেশে বঙ্গবন্ধুর আত্মস্বীকৃত খুনী এবং যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হয়েছে স্বাভাবিক আদালতে, যথাযথ প্রক্রিয়া শেষে; সে দেশে কিছুতেই ক্রসফায়া্র চলতে পারে না। আমি ক্রসফায়ার নয়, দ্রুত বিচার চাই, আইনের শাসন চাই। আমরা চাই বারবার সেপ্টেম্বর ফিরে আসুক, শুধু একটি মাস নয়, চিরদিনের জন্য বাংলাদেশ ক্রসফায়ারশূন্য হোক। ফেসবুক থেকে

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত