প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

ডা. খোন্দকার মেহেদী আকরাম: ডেঙ্গু ভাইরাস সংক্রমণ কি কোভিড-১৯ রোগে প্রতিরক্ষা দেয়?

ডা. খোন্দকার মেহেদী আকরাম: সম্প্রতি ব্রাজিলে চালানো একটা গবেষণা থেকে দেখা যায় যে, পূর্বে ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত মানুষের ভেতরে করোনাভাইরাস সংক্রমণের প্রবণতা অপেক্ষাকৃত কম এবং এই সংক্রমণ থেকে সিভিয়ার কোভিডে মৃত্যুহারও কম। এই গবেষণা পত্রটি প্রি-প্রিন্ট সার্ভার সবফজীরাতে প্রকাশিত হয়েছে ২১ সেপ্টেম্বর এবং বর্তমানে একটি পিয়ার রিভিউড জার্নালে প্রকাশের অপেক্ষায় রয়েছে। করোনায় আক্রান্তের দিক দিয়ে বিশে^ ব্রাজিল রয়েছে তৃতীয় স্থানে। তবে দেশটিতে সংক্রমণ বিস্তারে আঞ্চলিক অসামঞ্জস্যতা দেখা যায় প্রকটভাবে, যা গাণিতিক মডেলে অ্যানোমালি হিসেবে গণ্য হয়। ব্রাজিলের বেশ কিছু রাষ্ট্রে বা শহরে করোনা সংক্রমণ অপেক্ষাকৃত অনেক বেশি। আবার কিছু কিছু অঞ্চলে এই সংক্রমণ খুবই কম পরিলক্ষিত হয়। করোনা সংক্রমণের এ ধরনের আঞ্চলিক বিস্তার নতুন কিছু নয়। বাংলাদেশেও দেখা যায় কিছু জেলা বা শহর করোনায় অন্যান্য অঞ্চলের চেয়ে অপেক্ষাকৃত বেশি আক্রান্ত। এর অবশ্য অনেকগুলো কারণ থাকতে পারে।

তবে ব্রাজিলের গবেষকদল সংক্রমণ বিস্তারের কয়েকটি টেকনিক্যাল কারণ ছাড়াও একটি গুরুত্বপূর্ণ ইমিউনোলজিক্যাল কারণ উদঘাটন করেছেন। গোটা ব্রাজিলে চালানো ইপিডেমিওলোজিক্যাল এবং সেরোকনভার্শন ডাটাবেইজ সার্ভেতে তারা দেখতে পান যে ব্রাজিলের যে অঞ্চলগুলো ২০১৯-২০২০ সময়টিতে ডেঙ্গু মহামারীতে আক্রান্ত হয়েছিল সে অঞ্চলগুলোতে মার্চে শুরু হওয়া করোনা সংক্রমণ এবং পরবর্তী সময়ে তার বিস্তারের গতি অন্যান্য ডেঙ্গুমুক্ত অঞ্চলের চেয়ে অনেক কম। ইমিউনোলজিক্যাল রেকর্ড থেকে দেখা যায় যে মূলত যাদের শরীরে ডেঙ্গুভাইরাসের এন্টিবডি ছিল তারা করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছে কম। একইভাবে ব্রাজিলের যেসব শহরের মানুষের ভেতরে ডেঙ্গু ভাইরাসের এন্টিবডি পাওয়া যায়, সেসব শহরে করোনা সংক্রমণও গড়পরতায় অনেক কম।

এরপর গবেষকগণ দেখার চেষ্টা করেন যে আরেকটি মশাবাহীত ভাইরাস চিকুনগুনিয়া সংক্রমণের সাথে করোনাভাইরাস সংক্রমণের কোন সম্পর্ক আছে কিনা। তারা একইভাবে ভৌগলিক এবং ইমিউনোলজিক্যাল সার্ভে চালান এবং দেখতে পান যে চিকুনগুনিয়া সংক্রমণ করোনাভাইরাস সংক্রমণে কোনো প্রকার প্রভাব ফেলে না। অর্থাৎ ডেঙ্গু ভাইরাসের সংক্রমণে তৈরি হওয়া এন্টিবডি করোনাভাইরাসের বিপরীতে যে প্রতিরোধ গড়ে তোলে তা চিকুনগুনিয়ায় তৈরি হওয়া এন্টিবডি করতে পারে না।

ডেঙ্গু জ¦রপ্রবণ অঞ্চলগুলো যে শুধু ব্রাজিলেই করোনার মহামারীর তিব্রতা থেকে রক্ষা পেয়েছে তাই নয়, বরং এমনটি দেখা গেছে পৃথিবীর আরও ১৫ টি ডেঙ্গু আক্রান্ত অন্যান্য দেশেও। এদের মধ্যে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, ল্যাটিন আমেরিকা এবং প্রশান্ত ও ভারত মহাসাগর সংলগ্ন দ্বীপগুলোতে দেখা যায় যে ডেঙ্গু জ্বরের প্রাদুর্ভাব ওই অঞ্চলগুলোকে করোনা মহামারী থেকে রক্ষা করেছে। এই ফলাফল থেকে এটা অনেকটা পরিস্কার যে ডেঙ্গু জ্বরের বিপরীতে তৈরি হওয়া রোগপ্রতিরোধক ক্ষমতা করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধেও প্রতিরোধ গড়ে তোলে। বাংলাদেশে ডেঙ্গু জ্বরের প্রাদুর্ভাব

গত বছরের সেপ্টেম্বরে বাংলাদেশে রেকর্ড সংখ্যক প্রায় ৮২ হাজার ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হয়, এবং নভেম্বরে সংখ্যাটি বেড়ে দাঁড়ায় ১ লাখে, যার ভেতরে অর্ধেকের বেশি রোগীই ছিল ঢাকাতে। ২০১৯ এর আগস্ট-ডিসেম্বরে ঢাকার ভেতরে এলাকা অনুযায়ী ডেঙ্গুর সেরোপ্রিভ্যালেন্স বা সংক্রমণের বিস্তার কেমন ছিলো? এবং এ বছর ওই স্থানগুলোতে করোনাভাইরাসের সেরোপ্রিভ্যালেন্স বা সংক্রমণ কেমন? বস্তি এলাকাগুলোতে কি গত বছর ডেঙ্গুর প্রকোপ বেশি ছিলো? এ বছর ঢাকার বস্তি এলাকাগুলোতে করোনা সংক্রমণের হার কেমন? ধারণা করা হয় রাজধানীর বস্তি এলাকায় বসবাসকারীদের ভেতরে করোনা সংক্রমণ অপেক্ষাকৃত অনেক কম। ঢাকায় একটা সেরোপ্রিভ্যালেন্স সার্ভে করলে আসল তথ্যটা জানা যাবে যে ব্রাজিলের মতো ঢাকার বস্তিগুলোতেও ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব করোনা সংক্রমণে কোনো ভূমিকা রাখছে কি না।

ডেঙ্গু ইমিউনিটি কিভাবে করোনা প্রতিরোধ করে? ডেঙ্গুভাইরাস এবং করোনাভাইরাস দুটি দু’ধরনের ভাইরাস। ডেঙ্গু হচ্ছে ফ্ল্যাভিভাইরাস যা মানুষে ছড়ায় এডিস মশার মাধ্যমে। আর করোনাভাইরাস হলো করোনাভিরিডি গোত্রের রেসপিরেটরি ভাইরাস যা মানুষ থেকে মানুষে ছড়ায় হাঁচি কাশির মাধ্যমে। দুটো ভাইরাস দু’গোত্রের হলেও এরা উভয়ই পজেটিভ সেন্স আরএনএ ভাইরাস। এই দুটো ভাইরাসই রক্তনালিকার এন্ডোথেলিয়াল কোষকে সংক্রমিত করে এবং সিভিয়ার রোগের ক্ষেত্রে সাইটোকাইন স্টোর্ম সংগঠনের মাধ্যমে মৃত্যু ঘটাতে পারে। ডেঙ্গু এবং করোনা এই দুটি ভাইরাসই সিভিয়ার রোগে রক্ত জমাট বাঁধায়। রক্ত পরীক্ষায় এই দুই ভাইরাসের ক্ষেত্রেই ডি-ডাইমারের উপস্থিতি বেড়ে যায়। অর্থাৎ ভাইরাসের গৌত্রগত ভিন্নতা থাকলেও তাদের দ্বারা সংগঠিত ক্লিনিক্যাল সিম্পটম সমুহে অনেক সাদৃশ্য রয়েছে।

অন্যদিকে, ল্যাবরেটরী গবেষণায় দেখা যায় যে দুটো দু’ধরনের ভাইরাস হলেও ডেঙ্গু ভাইরাস এবং করোনাভাইরাসের নিউক্লিয়োক্যাপসিড প্রোটিনের ভেতরে বেশ অনেকটা সাদৃশ্য রয়েছে। ধারণা করা হয় এই সাদৃশ্যের কারণে ডেঙ্গু ভাইরাসের নিউক্লিয়োক্যাপসিড প্রোটিনের বিপরীতে তৈরি হওয়া এন্টিবডি এবং টি-সেল ইমিউনিটি সম্ভবত করোনাভাইরাসের বিপরীতেও ইমিউনিটি দেয়। সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে যে মার্স এবং সার্স ভাইরাসের বিপরীতে তৈরি হওয়া টি-সেলগুলো করোনাভাইরাসের বিপরীতেও ইমিউন রিঅ্যাকশন করে। আবার এটাও দেখা গেছে যে অন্যান্য করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগীদের শরীরে তৈরি হওয়া ইমিউনিটি নোভেল করোনাভাইরাসের বিপরীতেও কার্যকরী । এর আগে এন্টিবডি টেস্টে দেখা যায় কিছু কিছু ক্ষেত্রে ডেঙ্গু এবং করোনাভাইরাসের এন্টিবডি ক্রস রিয়্যাক্ট করে। সুতরাং, বলা যায় ডেঙ্গুর বিপরীতে তৈরি হওয়া নিউট্রালাইজিং এন্টিবডি এবং সেল-মেডিয়েটেড ইমিউনিটি কিছুটা হলেও করোনাভাইরাসের বিপরীতে কার্যকরী হতে পারে।

ডেঙ্গু জ্বরে প্রাকৃতিকভাবে তৈরি হওয়া ইমিউনিটি যদি করোনাভাইরাসের বিপরীতেও ইমিউনিটি দিয়ে থাকে, তাহলে প্রশ্ন আসতে পারে ডেঙ্গু ভ্যাকসিন কি কোভিড-১৯ এ প্রতিরক্ষা দিতে পারে? তত্ত্বগতভাবে পারা উচিত। তবে এর উপরে এখন পর্যন্ত তেমন কোনো গবেষণা হয়নি।
সমস্যা হলো এখনো সর্বসাধারণের ব্যবহারের জন্য একটি নিরাপদ ও সম্পূর্ণ কার্যকরী ডেঙ্গু ভ্যাকসিন প্রস্তুত হয়নি। সানোফির ডেংভ্যাক্সিয়া নামক একটি ডেঙ্গু ভ্যাকসিনকে জনসাধারণের জন্য অনুমোদন দেয়া হয়েছে যদিও। কিন্তু এই ভ্যাকসিনটি সেরোনেগেটিভ (যার রক্তে ডেঙ্গু এন্টিবডি নেই) মানুষে ইমিউনিটি দেয় মাত্র ৩৮ শতাংশ। শুধু তাই নয়, সেরোনেগেটিভ ভ্যাকসিন গ্রহীতাদের মধ্যে মারাত্মক পার্শ্বপ্রতিক্রয়াও পরিলক্ষিত হয়। এ কারণেই এখন এই ভ্যাকসিনটি দেওয়ার পূর্বে রক্তে ডেঙ্গুর এন্টিবডি পরীক্ষা করে দেখা হয়। রক্তে যদি ডেঙ্গু এন্টিবডি না থাকে, তাহলে তাকে আর ভ্যাকসিনটি দেওয়া হয় না। ডেঙ্গুর আরেকটি নতুন ভ্যাকসিন ঞঅক-০০৩ ফেইজ-৩ ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে ভালো ফল দেখিয়েছে। প্রায় ১৩ হাজার ভলান্টিয়ারের উপর চালানো ট্রায়ালে ভ্যাকসিনটি সুরক্ষা দিয়েছে শতকরা ৮০ থেকে ৯০ ভাগ। ভবিষ্যতে বৃহৎ পরিসরে গবেষণা করে দেখা দরকার যে ডেঙ্গু ভ্যাকসিন প্রকৃতপক্ষেই কোভিড-১৯ এ কোনো প্রকার প্রতিরক্ষা দেয় কিনা।

লেখক : এমবিবিএস, এমএসসি, পিএইচডি। সিনিয়র রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট, শেফিল্ড ইউনিভার্সিটি, যুক্তরাজ্য

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত