প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

টাকায় আর আনছে না টাকা

ডেস্ক রিপোর্ট : অর্থনীতির প্রচলিত প্রবাদ—‘টাকায় টাকা আনে’। কিন্তু বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনীতি এক ধরনের সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। দেখা যাচ্ছে, একদিকে টাকা রাখার খরচই ওঠাতে পারছে না ব্যাংক, অন্যদিকে ব্যাংকে টাকা রেখে সংসার চলছে না আমানতকারীদের। আমানতকারীদের অনেকেই বলছেন, ব্যাংকে টাকা জমা রেখে তারা আগের মতো মুনাফা পাচ্ছেন না। আবার ব্যাংকের এমডিরা বলছেন, ঋণ দিলে সেগুলো ফেরত আসে না। অথচ আমানতের বিপরীতে ঠিকই সুদ গুনতে গিয়ে ব্যাংকের খরচ বেড়ে যাচ্ছে। অর্থাৎ, আমানত নিয়ে ব্যাংক ও গ্রাহক উভয়ই বিপদে রয়েছে।

আমানত নিয়ে ব্যাংকগুলো যে বিপদে আছে, তার প্রমাণ মেলে সরকারের ট্রেজারি বিল ও বন্ডে বিনিয়োগের চিত্র দেখলেই। ব্যাংক খাত থেকে সরকারকে দুই হাজার কোটি টাকার ঋণের ব্যবস্থা করে দেওয়ার জন্য গত ৮ সেপ্টেম্বর নিলামের আয়োজন করেছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংক। সেখানে প্রায় ১১ হাজার কোটি টাকা নিয়ে হাজির হয় ব্যাংকগুলো। তার দুই দিন আগে ৬ সেপ্টেম্বর আড়াই হাজার কোটি টাকার বিপরীতে ব্যাংকগুলো ১২ হাজার কোটি টাকা নিয়ে হাজির হয় কেন্দ্রীয় ব্যাংকে। আবার কলমানি মার্কেটে সুদহারও এক শতাংশে নেমে এসেছে। অর্থাৎ ব্যাংকগুলো আমানতকারীদের টাকা নিয়ে বিপাকে পড়ে গেছে।

শুধু তাই নয়, হাতে থাকা আমানত ন্যূনতম মুনাফায় বিনিয়োগের বিকল্প উৎস খুঁজছে ব্যাংকগুলো। এরই অংশ হিসেবে সরকারের ট্রেজারি বিল ও বন্ডে বিনিয়োগ করতে লাইন ধরেছে তারা।

ব্যাংকাররা জানান, করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে বেশির ভাগ ব্যবসায়ীই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। ফলে আগের দেওয়া ঋণই ফেরত পাওয়া নিয়ে সংশয় রয়েছে। এ কারণে বেশির ভাগ ব্যাংক নতুন করে মেয়াদি ঋণ বিতরণ করতে চাচ্ছে না। এমনি পরিস্থিতিতে বেশির ভাগ ব্যাংকের হাতে বিনিয়োগযোগ্য অর্থ অলস পড়ে রয়েছে। বেশ কয়েকটি ব্যাংক টাকা খাটাতে না পারায়, আমানতকারীদের মুনাফা পরিশোধে হিমশিম খাচ্ছে। এ কারণে অলস অর্থ থেকে ন্যূনতম মুনাফা ঘরে তুলতে ব্যাংকগুলো নানা বিকল্প উৎস খুঁজছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, প্রায় প্রতিদিনই ৯১ দিন ও ১৮২ দিন মেয়াদি ট্রেজারি বিলের নিলামের আয়োজন করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এই নিলামগুলোতে দেখা যায়, গড়ে দেড় হাজার কোটি টাকার বিপরীতে ৫ হাজার কোটি টাকার দরপত্র জমা হচ্ছে।

একটি বেসরকারি ব্যাংকের এমডি নাম প্রকাশ না করে জানান, আমানতকারীদের অর্থ বিনিয়োগ করার জায়গা কমে এসেছে। তিনি উল্লেখ করেন, আগে ব্যবসায়ীদের মধ্যে বিভিন্ন মেয়াদে ঋণ বিতরণ করতো, এখন সেই অর্থে ঋণ বিতরণ হচ্ছে না। তিনি বলেন, বর্তমানে প্রতিটি ব্যাংকের হাতেই বাড়তি তহবিল থাকায় কলমানি মার্কেটের কদর কমে গেছে। এর ফলে কলমানি মার্কেটে সুদহার এক শতাংশে নেমে এসেছে। এ পরিস্থিতিতে বাড়তি মুনাফার জন্য ব্যাংকগুলো ট্রেজারি বিল বন্ডে বিনিয়োগ করতে বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছে।

এ বিষয়ে পূবালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আব্দুল হালিম চৌধুরী বলেন, ‘ব্যাংকগুলোর উদ্বৃত্ত তহবিল অলস বসিয়ে না রেখে নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে সরকারি ট্রেজারি বিল ও বন্ডে বিনিয়োগ করতে চাচ্ছে। তার মতে, এতে সরকার একদিকে কম সুদে ঋণ পাচ্ছে, অন্যদিকে ব্যাংকগুলোর বিনিয়োগও নিরাপদ থাকছে।’

জানা গেছে, সরকারকে স্বল্প মেয়াদে ট্রেজারি বিল ও বন্ডে ধার দিলে এখন আড়াই থেকে ৪ শতাংশ পর্যন্ত মুনাফা পাওয়া যায়। এছাড়া দীর্ঘ মেয়াদে সরকারকে ঋণ দিলে ৮ থেকে সাড়ে ৮ শতাংশ মুনাফা পাওয়া যায়। আর বেসরকারি খাতে ঋণ বিতরণ করলে ফেরত পাওয়ার সম্ভবনাই থাকে না।

এদিকে দেশে করোনার প্রাদুর্ভাব আসার আগে কেউ ব্যাংকে আমানত রাখলে সুদ পেতেন সাড়ে ১০ থেকে ১২ শতাংশ হারে, গত কয়েক মাস ধরে পাচ্ছেন মাত্র ৬ শতাংশ।

রাজধানীর সবুজবাগের আজিজুর রহমান। তিনি ব্যাংক ছাড়া অন্য কোথাও টাকা রাখতে আস্থা পান না। ফলে বাধ্য হয়েই তিনি ব্যাংকে টাকা রাখেন। সেই টাকার সুদ থেকে তিনি সংসার চালান। তবে করোনাকালে আমানতে সুদ কমে যাওয়ায় তিনি বিপাকে পড়েছেন। তিনি জানান, করোনার দুঃসময়ে এমনিতেই তার জীবনযাত্রা কঠিন হয়েছে। আমানতের সুদ আয় কমে যাওয়ার কারণে তিনি আরও দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে পড়েছেন। তিনি উল্লেখ করেন, তার ৬ শতাংশ সুদের অধিকাংশই খেয়ে ফেলে মূল্যস্ফীতি।

ব্যাংক কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অর্থাৎ গত বছর কেউ ব্যাংকে ১০ লাখ টাকা রাখলে তিনি এক লাখ ২০ হাজার টাকা সুদ পেতেন। এখন সেই ১০ লাখ টাকার বিপরীতে ব্যাংক তাকে সুদ দিচ্ছে মাত্র ৬০ হাজার টাকা।

এদিকে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হিসাবে গত আগস্টে বার্ষিক গড় মূল্যস্ফীতি ছিল ৫ দশমিক ৬৫ শতাংশ। অর্থাৎ গত বছর যার ব্যয় হয়েছে ১০০ টাকা। এখন তাকে ব্যয় করতে হচ্ছে ১০৫ টাকা ৬৫ পয়সা।

অর্থাৎ ব্যাংক ১০ লাখ টাকার বিপরীতে কাউকে ৬০ হাজার টাকা দিলেও মূল্যস্ফীতি তার ৫৬ হাজার টাকা খেয়ে ফেলছে। এর সঙ্গে উৎসে কর, আবগারি শুল্ক বা এক্সাইজ ডিউটি দিতে হবে। ব্যাংক সার্ভিস চার্জ হিসাবে বছরে দুইবার ৩০০ টাকা করে ৬০০ কেটে নেবে। এই ৬০০ টাকা সার্ভিস চার্জের বিপরীতে ১৫ শতাংশ হারে অর্থাৎ ৯০ টাকা ভ্যাট কাটা হবে। ফলে দেখা যাচ্ছে, ১০ লাখ টাকা ব্যাংকে আমানত রাখলে তার আয় হবে ৬০ হাজার টাকা। আর খরচ হবে ৬৬ হাজার ১৯০ টাকা।

প্রসঙ্গত, গত এপ্রিল থেকে ক্রেডিট কার্ড ছাড়া সব ঋণের সুদহার ৯ শতাংশ নির্ধারণের পর মেয়াদি আমানতে এখন বেশিরভাগ ব্যাংক ৬ শতাংশ সুদ দিচ্ছে। আমানতের পরিমাণ ও মেয়াদ ভেদে কোনও কোনও ক্ষেত্রে সাড়ে ৬ শতাংশ সুদ দেওয়া হচ্ছে। তবে অধিকাংশ ব্যাংক বেশি সুদের আমানত স্কিম বন্ধ করে দিয়েছে। যদিও চাকরি হারিয়ে বা আয় কমে যাওয়ায় অনেকেই নিজ থেকে মেয়াদপূর্তির আগেই স্কিম ভাঙিয়ে ফেলছেন। এক্ষেত্রে তারা সুদ পাচ্ছেন সঞ্চয়ী হারে। বর্তমানে সাধারণ সঞ্চয়ী হিসাবে ব্যাংকগুলো ২ থেকে ৪ শতাংশ সুদ দিচ্ছে।

এ প্রসঙ্গে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক আহসান মনসুর বলেন, ‘মানুষের আয় যে কমে গেছে ব্যাংকের আমানতকারীরা তার বড় প্রমাণ।’ তিনি বলেন, ‘মূল্যস্ফীতি, আবগারি শুল্ক, বিভিন্ন ধরনের চার্জ বিবেচনায় নিলে ব্যাংকে টাকা রেখে মানুষ প্রকৃতপক্ষে কোনও লাভই পাচ্ছে না। তবে ব্যাংকের ভালো বিকল্প না থাকায় বাধ্য হয়ে মানুষ ব্যাংকে আসছে।’ তিনি উল্লেখ করেন, উন্নত দেশের ব্যাংকগুলোতে আমানত রেখে এক শতাংশ বা দুই শতাংশ সুদ পাওয়া যায়। তবুও সেসব দেশের আমানতকারীরা ঠকে না। কারণ, ওই সব দেশে মূল্যস্ফীতি খুব কম থাকে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত জুন পর্যন্ত ব্যাংক খাতে মোট আমানত রয়েছে ১৩ লাখ ৫ হাজার ৪৫৪ কোটি টাকা। আর ঋণের পরিমাণ রয়েছে ১০ লাখ ৬৪ হাজার ৭১৩ কোটি টাকা।

সূত্র : বাংলা ট্রিবিউন

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত