প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

রুমি আহমেদ: কোভিড-১৯ দীর্ঘযাত্রীরা

রুমি আহমেদ : কোভিড-১৯ নিয়ে মেডিকেল জার্নালে প্রকাশিত আর্টিকেলের সংখ্যা এখন পঞ্চাশ হাজারের উপর। তারপরও কোভিড-১৯ রোগটা এতো নতুন ও এর উপসর্গ ও জটিলতা এতো ব্যাপক বিস্তৃত ও দীর্ঘমেয়াদি যে প্রতিদিন এতো নতুন তথ্য আসছে যে-অনেক ক্ষেত্রেই চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা কোভিড-১৯ সংক্রান্ত সমস্ত বৈজ্ঞানিক তথ্যগুলোকে সময়মতো সাধারণ মানুষ বা সাধারণ চিকিৎসক সমাজের কাছে তুলে ধরে গিয়ে তাল মেলাতে পারছেন না। অনেক ক্ষেত্রেই রোগীরা রোগটার অপ্রকাশিত বা আনডিস্কভার্ড দিকগুলো নিজেরাই নোট করছেন এবং দলবদ্ধ হয়ে স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে রোগটার নতুন ডাইমেনশন নিয়ে কাজ শুরু করে দিচ্ছেন। এর একটা বড় উদাহরণ হচ্ছে কোভিড লং হলার। যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইর্য়কে কোভিডে ভোগা কয়েক হাজার তরুণ-তরুণী প্রথমেই নিজেরা নিজেদের মধ্যে আলাপ আলোচনা শুরু করে দেখলো যে এদের সবার কোভিড-১৯ হয়ে ভালো হয়ে গিয়েছে। কিন্তু তারপরও প্রায় সবাই-ই একই ধরনের লিঙ্গারিং সিমটমে ভুগছে। অনেকের ফিরে ফিরে গায়ে গায়ে জ্বর আসছে, অনেকের জ্বর জ্বর ভাবটা যাচ্ছে না, অনেকের জয়েন্ট পেইনটা যাচ্ছে না,অনেকের প্রচণ্ড হ্যাঁ ব্যাথা একটা প্রাত্যহিক ব্যাপার হয়ে গেছে কোভিড নেগেটিভ হয়ে যাবার পরেও। নিজেদের ওরা বলা শুরু করলো কোভিড লং হলার এবং জ্বর জ্বর ভাবটা যাচ্ছে না, অনেকের জয়েন্ট পেইনটা যাচ্ছে না, অনেকের প্রচণ্ড গা ব্যাথা একটা প্রাত্যহিক ব্যাপার হয়ে গিয়েছে কোভিড নেগেটিভ হয়ে যাবার পরও। নিজেদের ওরা বলা শুরু করলো কোভিড লং হলার এবং লং কোভিড হ্যাসট্যাগ ব্যবহার করে স্যোশাল মিডিয়াতে অ্যাওয়ার্নেস এবং সাপোর্ট গ্রুপ ক্রিয়েট করলো। স্বল্প সময়ের মধ্যে ভুক্তভোগী রোগীরা স্বল্প সময়ের মধ্যে ভুক্তভোগী রোগীরা গ্রুপের মেম্বার হওয়া শুরু করলো এবং সদস্য সংখ্যা লক্ষের উপর হয়ে গেলো। যদিও প্রথমে এই ব্যাপারটা নিয়ে রোগীরাই কথা বলা শুরু করেছিলেনÑ ধীরে ধীরে চিকিৎসকরাও ব্যাপারটা প্রত্যক্ষ করতে থাকলো যখন প্রথম ধাক্কার রোগীরা হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়ে বা হাসপাতালে না গিয়ে নেগেটিভ হওয়ার পর ও মাস, দু’মাস, তিন মাস ধরে চলা সিম্পটম নিয়ে ডাক্তারদের কাছে ফিরে আসা শুরু করলো এবং অতি সম্প্রতি এই অভিজ্ঞতাগুলো ডাক্তাররা এনালাইজ করে শেয়ার করা শুরু করেছেন। সিডিসি কয়েক সপ্তাহ আগে একটা সার্ভে প্রকাশ করেছে যে ৩৫ শতাংশ রোগী কোভিড আক্রান্ত হবার ২-৩ সপ্তাহ পর পর্যন্তÍ বিভিন্ন ধরনের সিম্পটম এ ভুগতে থাকে। অতি সম্প্রতি ইটালি থেকে আসা একটা রিসার্চে দেখা যায় যে শতকরা ৮৭ শতাংশ কোভিড রোগীর অন্তÍত একটা উপসর্গ থেকে যায় মাসের পর মাস। যেসব উপসর্গ ক্রনিক হয়ে যায় তার মধ্যে কমন হচ্ছে দুর্বলতা-ফ্যাটিগ আর শ্বাস কষ্ট। কোভিড রোগীরা ভালো হয়ে যাবার পরও বেশ কিছু ক্রনিক -দীর্ঘমেয়াদি উপস্বর্গের কথা বারবার বলছেন।

একটা বড় উপসর্গ হচ্ছে ব্রেইন ফগ-সারাক্ষণ মাথা ঝিম ঝিম করা, মাথা ধরে থাকা, কনসেন্ট্রেশন করা বা কোনো কাজে মনোনিবেশ করার অক্ষমতা বা মাথাব্যাথা করা। অনেকের একেবারে নতুন করে রাতে ইনসোমনিয়া হচ্ছে। অনেকে পিটিএসডি-এর মতো দুঃস্বপ্ন দেখছেন। অনেকে আবার সারাদিন খালি পরে পরে ঘুমাচ্ছেন। কারো কারো মেমোরি-স্মৃতি শক্তি লোপ পাচ্ছে, কিছু কিছু বিষয়ে অনেকের বলা নেই কওয়া নেই মাথার চুল পড়া শুরু করেছে। অনেকের স্কিন রাশ হচ্ছে বিশেষ করে শরীরে নিচের অংশে। জ্বর ও জয়েন্ট পেইন বা গায়ে ব্যাথা কথা তো আগে বলেছি। মায়ালজিক এনসেফ্যালাইটিস টাইপের নার্ভ প্রদাহ অনেককেই ক্রনিক ফ্যাটিগ সিনড্রোম টাইপের টাইপের সিম্পটম ভোগাচ্ছে। অনেকের মধ্যেই স্ট্রোক করার বা রক্ত জমাট বাধার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে কোভিড থেকে ভালো হয়ে যাবার পর। বুকে ব্যাথা বা বুকে অস্বস্তি অনেক কোভিড থেকে ভালো হয়ে যাওয়া রোগীর একটা নিত্যনৈমিত্তিক কমপ্লেইন।

শ্বাস বা ফুসফুস সংক্রান্ত ক্রনিক সিমটম বিভিন্ন ধরনের। একটা হচ্ছে শুকনা কাশি। ভাইরাস ভালো হয়ে গিয়েছে কিন্তু শুকনো কাশি যাচ্ছে না। কাশতে কাশতে নাড়িভুড়ি বের হয়ে যাবার উপক্রম। এটা কিন্তু নতুন কিছু না। অন্য ভাইরাল সংক্রমণে আমরা এটা আগে দেখেছি-এখন কোভিডে দেখছি। লাঙ ফাইব্রোসিস থেকে শ্বাসকষ্ট আর অক্সিজেনের অভাব বাকি জীবনের জন্য রয়ে যেতে পারে অনেকের ক্ষেত্রে। অনেকের আবার দেখছি কোভিড ভালো হয়ে যাবার পরও লো গ্রেড ফুসফুসের ক্রনিক প্রদাহ রয়ে গিয়েছে। গন্ধ শোকার ক্ষমতা চলে যাওয়া অনেক ক্ষেত্রে কোভিড ইনফেকশনের শুরুতেই হয়। কিন্তু এই সমস্যাটা কোভিড ভালো হয়ে যাবার পরও অনেকের রয়ে যাচ্ছে। অনেকেই জিহ্বায় স্বাদ পাচ্ছেন না একেবারেই। শিশু- বালক বালিকাদের বেলায়ও দেখা যাচ্ছে ওদের ও ক্রনিক প্রদাহ জনিত কিছু রেয়ার অসুখ হচ্ছে কোভিড ভাইরাসের দীর্ঘমেয়াদী এফেক্টের ফলে।

এগুলো কেন হচ্ছে- এগুলো কীভাবে চিকিৎসা করবো সে ব্যাপারে অকাট্য প্রমাণসহ বৈজ্ঞানিক কোনো ব্যাখ্যা এখনো আমাদের হাতে নেই। তবে পূর্ববর্তী কিছু ভাইরাসের দীর্ঘমেয়াদী এফেক্ট স্টাডি করে আমরা কোভিডের সাথে অনেক মিল খুঁজে পাই। কোভিডের কাজিন সার্স-১ বা মার্স-এর ক্ষেত্রেও মাঝে মাঝে একই ব্যাপার দেখেছি, যেমন দেখেছি স্মল পক্স চিকেন পক্স চিকুনগুনিয়া ভাইরাসের ক্ষেত্রেও। ভাইরাসটা আমাদের শরীরকে আক্রমণ করে এক পর্যায়ে আমাদের ডিফেন্স সিস্টেম বা ইম্মিউন সিস্টেমের কাছে হার মেনে শরীর থেকে বিদায় নেয়। ভাইরাস ভালো হয়ে যায়Ñশরীর ভাইরাস মুক্ত হয়ে যায়। কিন্তু ধ্বংস হয়ে যাবার আগে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গে প্রদাহের আগুন জ্বালিয়ে দিয়ে যায়। এই প্রদাহটা ধিকি ধিকি জ্বলতে থাকে অনেক দিন ধরে এবং এই প্রদাহগুলোই হয়তো উপরে বর্ণিত অনেকগুলো সিমটমের কারণ।

আমি কীভাবে চিকিৎসা করছি এই উপসর্গগুলোর? চিকিৎসা করতে হবে কিনা তা নির্ভর করবে উপসর্গের উপর এবং আক্রান্ত অর্গানের উপর। অনেক ক্ষেত্রে হালকা জ্বর চলতে থাকলে বা ফুসফুসের সিটি স্ক্যান প্রদাহ সাজেস্ট করলে আমি খুব লো ডোজ স্টেরয়েড দিয়ে চেষ্টা করি। অনেক ক্ষেত্রে দেখছি এই রোগীগুলোকে একের পর এক এন্টিবায়োটিক দেওয়া হচ্ছে। এই প্রদাহের বিরুদ্ধে এন্টিবায়োটিক কাজ করবে না, বরং ব্যাপকহারে এন্টিবায়োটিক রেজিস্টেন্সের আশংকা তৈরি হয়। একটা কথা আমাদের সবার, বিশেষ করে বিদেশে আমার চিকিৎসক বন্ধুদের বোঝা খুব দরকার যে ৫০, ০০০ পেপার প্রকাশিত হওয়া সত্ত্বেও মেডিকেল সায়েন্স এখন পর্যন্ত কোভিড-১৯ রোগটা সম্পর্কে কিছুই জানে না। কিন্তু আমাদের বিজ্ঞান ভাইরাস সম্পর্কে অনেক কিছুই জানে-ভাইরাস রোগ নিয়েও অনেক কিছুই জানে। আমাদের বেসিক সায়েন্সের বইগুলোতে প্রদাহ, বিশেষ ভাইরাস পরবর্তী প্রদাহ নিয়ে ব্যাপক পরিমাণ জ্ঞানসঞ্চিত আছে। আমরা কোভিড-১৯ এর অনেক চিকিৎসাই করতে পারি ভাইরাস ও মানবদেহ-ভাইরাস ইন্টারেকশনের জ্ঞান দিয়ে। দেশে বিদেশের চিকিৎসক বন্ধুদের আবার বলি, আপনি যদি সোশ্যাল মিডিয়া, টিভি চ্যানেল ও পত্রপত্রিকায় নিজেকে কোভিড বিশেষজ্ঞ হিসেবে পরিচয় দিয়ে জনস্বাস্থ্যে অবদান রাখতে চান তা খুব ভালো কথা, কিন্তু এটা মনে রাখা দরকার যে বিশেষজ্ঞ হবার জন্য নিজের প্রস্তুতি,স্তু‘তি, ট্রেইনিং আর অভিজ্ঞতা অর্জনটা খুব জরুরি। কোভিড-১৯ আমাদের চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে যাচ্ছে যে কোভিড-১৯ বুঝতে হলে আমাকে ভাইরাস বুঝতে হবে, ভাইরোলজি বুঝতে হবে, বেসিক প্যাথলজি, ইম্মিউনোলোজি ও ফিজিওলজি আবার পড়তে হবে ও বুঝতে হবে। জ্ঞানার্জনের কোনো শেষ নেই, সময় অসময় নেই। ফেসবুক থেকে

সর্বাধিক পঠিত