প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

দীপক চৌধুরী : বঙ্গবন্ধুর দেখানো পথেই হাঁটতে হবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে

দীপক চৌধুরী : বিভীষিকাময় সেই ২১ আগস্টে মুহুর্মুহু গ্রেনেড হামলায় ছিন্নভিন্ন হয়ে গিয়েছিল অনেক মানুষের দেহ। ২৪ জন নিহত হন। পাঁচশ আহত। যারা বেঁচে আছেন এখনো তাদের সারা শরীর ঘুরে বেড়ায় স্প্লি ন্টার। কিন্তু ভাগ্যক্রমে বেঁচে যান শেখ হাসিনা। কেউ কেউ বলে থাকেন, এদেশে হিংসাশ্রয়ী রাজনীতি চলে। কিন্তু আমি বলবো, শুধু এটা হিংসাশ্রয়ী নয়, হামলার মূল উদ্দেশ্য ছিল হত্যার চূড়ান্ত রূপ। ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা ছিল সমূলে বিনাশের পরিকল্পনা। ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্ট জাতির পিতাকে সপরিবারে হত্যা করা হয়েছিল। আর ২০০৪-এর ২১ আগস্ট ছিল বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনাকে হত্যার একমাত্র উদ্দেশ্য, যা প্রমাণিত। এ গ্রেনেড হামলায় তৎকালীন বিএনপি সরকারকে দায়ী করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেছেন, ‘এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই যে খালেদা জিয়া এবং তার ছেলে তারেক রহমান ওই ঘটনা ঘটিয়েছে।’ তিনি হামলার পরও (২০০৪ খ্রিস্টাব্দ) যখন খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রী ছিলেন- সেইসময়ও খালেদা ও তারেক রহমানকে শেখ হাসিনা দায়ী করেছেন।
গত বৃহস্পতিবার সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে এটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বলেছেন, ‘অগ্রাধিকার ভিত্তিতে শুনানি করার সুযোগ আছে। ঘটনা তো অনেক আগের। তিনি বলেন, পৃথিবীর অন্য কোনো দেশে একটি রাজনৈতিক দলকে নিশ্চিহ্ন করে ফেলতে এরকম কোনো কাণ্ড ঘটানো হয়নি। এ ঘটনায় ২৩ জন অন দ্যা স্পট মারা যান।’

আদালতে খালেদা জিয়া ও তার দুই ছেলের দুর্নীতি প্রমাণ হওয়ায় সাজা হয়েছে। তারা শুধু দুর্নীতির মাধ্যমে টাকার মালিক হয়েই ক্ষান্ত হননি, সেই টাকা বিদেশে পাচারও করেছেন। গ্রেনেড হামলার পরিকল্পনা বাস্তবায়নকারী মুফতি হান্নানের স্বীকারোক্তি থেকে এমন সব তথ্য বেরিয়ে আসে যা এদেশের মানুষের কাছে কল্পনারও বাইরে ছিল। বিস্ময় করা এসব তথ্যে দেশকাঁপানো এ গ্রেনেড হামলায় তারেকের জড়িত থাকার প্রমাণ বেরিয়ে আসে। মুফতি হান্নান জানায়, তারেকের নির্দেশেই ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা চালানো হয়। বিএনপি সরকারের শিক্ষা উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টুর বাসা থেকে নেয়া ১৫টি গ্রেনেড দিয়ে ওই দিনই শেখ হাসিনাকে হত্যার জন্য ঢাকায় আওয়ামী লীগের জনসভায় হামলা চালানো হয়। ওই হামলার পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য জঙ্গি নেতাদের সঙ্গে হাওয়া ভবনে একাধিকবার বৈঠক হয়। দেশে সীমাহীন দুর্নীতি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের দায়ে দণ্ড মাথায় নিয়ে লন্ডনে ফেরারি আসামি বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। আর এখন জাতির পিতার কন্যা বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী। সৃষ্টি হয়েছে নতুন ইতিহাস। তিনি জাতির পিতার কন্যা। শরীরে তাঁর রক্ত। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যে কত গভীরভাবে এদেশের মানুষ ও মাটিকে ভালবাসতেন তা এক বিস্ময়কর ইতিহাস। চিন্তা চেতনায় তাঁর সমসাময়িকদের চেয়ে যোজন যোজন এগিয়ে ছিলেন। গোটা পৃথিবীর নেতাদের মধ্যে তিনি আলোচিত ও সম্মানীত ছিলেন তাঁর সততা, ব্যক্তিত্ব ও ইতিহাস সৃষ্টির জন্য। তিনি ছিলেন স্পষ্টবাদী ও সুবক্তা। সহজ-সরল ও সাধারণ ভাষায় মানুষের কথাগুলো বলতে পারতেন। ক্ষমতাকে তিনি কখনও বড় মনে করতেন না। সদ্য স্বাধীনতা অর্জনের পর বঙ্গবন্ধু কত গভীর ও তাৎপর্যপূর্ণ ভাষণ দিয়েছিলেন তা একটু দেখে নিতে পারি এ প্রজন্মের আমরা। (১৯ আগস্ট, ১৯৭২-এ বাংলাদেশ ছাত্রলীগের দ্বিতীয় জাতীয় সম্মেলন উদ্বোধনকালে প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান কর্তৃক প্রদত্ত ভাষণের একাংশ এখানে উল্লেখ করছি।) সেদিন তিনি বলেছিলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর গদির জন্য আমি রাজনীতি করি নাই। তা তোমরা জানো। বারবার প্রধানমন্ত্রী হবার সুযোগ আমি পেয়েছি। আদর্শের প্রশ্নে ফাঁসির কাষ্ঠে ঝুলতে রাজি হয়েছি, কিন্তু প্রধানমন্ত্রিত্ব নিই নাই। আমি জাতির পিতা, বঙ্গবন্ধু। আমি প্রধানমন্ত্রী কেন হবো? কিন্তু হয়েছি এই জন্য যে, জনসাধারণের পেটে খাবার নাই। দুনিয়া থেকে খাবার আনতে হয়। আটত্রিশ লক্ষ টন খাবার আনতে হয়েছে বিদেশ হতে।’’ বঙ্গবন্ধুর মহানুভবতা, আদর্শ ও সেসব সরলোক্তি মানুষের প্রাণে স্পর্শ করেছিল। এরপরের ইতিহাস তো আমাদের সবারই জানা।

খালেদা জিয়া রাজপথে স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে মিছিল-সমাবেশ করলেও মূলত ক্ষমতায় বসবার পরই বিএনপির প্রকৃত চরিত্র ফুটে ওঠে। ক্যান্টনমেন্টের ভেতর থেকে সৃষ্ট জিয়াউর রহমানের বিএনপি মুক্তিযোদ্ধা আর সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রতি যেসব সহিংস আচরণ করেছে তা কোনোভাবেই তুলনার নয়। আমরা যদি ১৯৭৯, ’৮৬, ’৯, ’৯৬ আর ২০০১ এর রাজনীতি নিয়ে বমি তাহলে দেখা মিলবে সাম্প্রদায়িকতা কাকে বলে এবং তা কত প্রকার। এদেশে ২০০১ এর নির্বাচনোত্তর সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাস পৃথিবীর অন্যতম জঘন্য রেকর্ড। বিএনপি-জামায়াত জোট কীভাবে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর তাণ্ডব চালিয়েছিল তা কী ভুলবার। এগারো বছরের একটি হিন্দু মেয়েকে গণধর্ষণের পর নিজেকে সহ্য না করতে পেরে মা বলেছিলেন, বাবারা তোমরা ওরে ছেড়ে দাও। আমার মেয়েটি ছোট। সুতরাং ‘ধর্ষণ’ নিয়ে বিএনপি জামায়াতের কথা বলা থেকে বিরত থাকা দরকার। ১৯৭১ এর মহান মুক্তিযুদ্ধ সাম্প্রদায়িকতাকে মাটিচাপা দিয়েছে সেই যুদ্ধ। এদেশের রাজনীতিকে কলুষিত, ঘৃণিত ও দলিত করার কৌশলে শ্রেষ্ঠ বিএনপি নিক্ষিপ্ত হয়েছে ইতিহাসের প্রতিশোধে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে নিকৃষ্টভাবে দল গঠন করার কীর্তি দলটির আছে বিধায় অমরবাণীর অনেক ‘বাণী’ দিয়েছেন দলের প্রতিষ্ঠাতা ও শীর্ষস্থানীয় নেতারা। ইতিহাসে প্রমাণ পাওয়া যায়, গণবিরোধীকর্মকাণ্ড দলটির একশ্রেণির নেতার সম্পৃক্ততা আছে। যুদ্ধাপরাধী রাজাকারদের মন্ত্রী-এমপি বানানো, রাজনীতিতে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ছবিকে নিষিদ্ধ করা, ভাষণকে নিষিদ্ধ করা, হত্যাকারীদের প্রতিষ্ঠা করা, ঘাতকদের দেশ থেকে পালাতে সহায়তা করা, হত্যাকাণ্ডের বিচার বন্ধ করার মতো কুখ্যাত ‘ইনডেমনিটি’ বিল পাশ করা। ক্ষমতাসীন সরকার ও প্রধানবিরোধী দলের মধ্যে প্রতিহিংসার রাজনীতিতে চ্যাম্পিয়ন বিএনপি ২০১৩-তে জাতীয় নির্বাচন প্রতিহত করার ঘোষণা দিয়ে ইতিহাসে নজীরবিহীন অবস্থান সৃষ্টি করে আছে।

পরিশেষে বলবো, বর্তমান সময়ে সবকিছুকে ডিঙ্গিয়ে আলোচনায় এসেছে চাঞ্চল্যকর কিছু ঘটনা। যদিও এরচয়ে ভয়াবহ ও ভয়াল ঘটনা এদেশে অতীতে ঘটে গেছে। এরপর যেহেতু প্রধানমনন্ত্রী শেখ হাসিনা বঙ্গবন্ধুর দেখানো পথেই দেশের অগ্রগতি ও উন্নয়নের রাস্তা ধরে হাঁটছেন সুতরাং সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোয় অপরাধীদের কঠিন ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি জরুরি হয়ে পড়েছে। বাংলার মানুষ যাতে বলতে পারে, অপরাধীদের উচিৎ বিচার হয়েছে। মেজর অব. সিনহা হত্যায় অপরাধীদের গ্রেপ্তার ও তদন্ত চলছে। মানুষ আশাবাদি। শিগগিরই কঠিন ও আইনানুযায়ী বিচার হবে। বিতর্কিত ঠিকাদার জিকে শামীম, ওয়েস্টিনের পাপিয়া এবং সর্বশেষ করোনা টেস্ট কেলেঙ্কারির সাহেদ-সাবরিনারা গত কয়েক মাস ধরে আলোচ্য বিষয়। এসব মামলার কোনও কোনোটির অভিযোগ গঠন হয়ে বিচার শুরু হলেও এখনও কোভিড-১৯-এর কারণে অনেক মামলায় তা হয়নি। সর্বশেষ আলোচনার কেন্দ্রবন্দু হয়ে উঠেছিলেন সাহেদ করিম ওরফে মোহাম্মদ সাহেদ, আরিফ চৌধুরী ও ডা. সাবরিনা চৌধুরী। তাদের বিরুদ্ধে কোডিভ-১৯ এর পরীক্ষার ‘ নেগেটিভ সনদ’ দিয়ে মানুষের সঙ্গে প্রতারণা এবং কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার মামলা হয়। শুধু তাই নয়, দলে ‘হাইব্রিড’ ও অপরাধীদের শনাক্ত করা সময়ের দাবি। উপজেলা পর্যায়ে স্থানীয় আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের অনৈতিক কর্মকাণ্ডকে নাকি ‘উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা’ কর্তৃক সমর্থন দিতে বাধ্য করার মতো ঘটনাও ঘটছে। সুতরাং দলীয় নীতির কারণেই কঠিন হওয়া বাঞ্ছনীয়। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ দলটি তো বিএনপি, বামদল বা জাতীয় পার্টি নয়।

কয়েকমাস আগে এক অনুষ্ঠানে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ বলেছেন, বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক বিকাশের প্রধান অন্তরায় দুর্নীতি। তাত্ত্বিকভাবে অনেকে বলেন, অর্থনৈতিক বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে দুর্নীতিও বিকশিত হয়। কমিশন এই দুর্নীতিকেই নিয়ন্ত্রণ ও নির্মূলে নিরলসভাবে কাজ করছে বলে প্রচার করা হয়। দুর্নীতিবাজদের আইন-আমলে আনা অব্যাহত রয়েছে বলে দেখাও যায়। সুতরাং এসব আলোচিত মামলায় কাউকে ছাড় যাতে না দেওয়া হয় এটা নিশ্চিত হতে হবে। দুর্নীতির লাগাম টেনে ধরা সময়ের দাবি।

লেখক : উপসম্পাদক, আমাদের অর্থনীতি, কলামিস্ট ও কথাসাহিত্যিক

 

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত