প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

ড. মোহাম্মদ আখেরুজ্জামান : আমাদের সমাজের অপরাধ ও অপরাধী

ড. মোহাম্মদ আখেরুজ্জামান : অপরাধ হচ্ছে এক ধরনের কাজ যা সমাজ কিংবা রাষ্ট্রের আইনে মানুষের করা/পরিচালনা করা নিষিদ্ধ। আর যে মানুষটি ঐ অপরাধ মূলক কাজ করে তাকে আমরা অপরাধী বলি। অপরাধ কখনো ভাল হতে পারে না কিন্তু অপরাধী ভাল হতে পারে। আবার অপরাধের ধরন ছোট, বড়, মাঝারি, ম্যানুয়াল, ডিজিটাল বিভিন্ন ধরনের হতে পারে। এই অপরাধের ধরন, প্রভাব, এবং বিস্তার বুঝে অপরাধীকে আমাদের সমাজ বিভিন্ন ধরনের শাস্তি দিয়ে থাকে। তবে অপরাধ একা কিছুই করতে পারে না অপরাধীকে ছাড়া, কিন্তু অপরাধী সবই করতে পারে অপরাধ কে ছাড়া। আবার স্থান কাল পাত্র ভেদে অপরাধের ধরন বিভিন্ন রকম হয়ে থাকে।

তবে অপরাধীকে নিয়ে যাই বলি না কেন, যে যত বড় অপরাধী সে তত বেশি বুদ্ধিমান এতে কোন ভুল নাই। বড় ধরনের বুদ্ধিমান না হলে কেউ কোন দিন বড় ধরনের অপরাধ করতে পারে না। বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থায় কি আছে জানি না তবে, আমার মত যারা নব্বই দশকের স্কুল পড়ুয়া ছাত্রছাত্রী ছিলেন তারা সকলেই হয়ত ভাবসম্প্রসারন হিসেবে গরগর করে মুখস্ত করেছে দুর্জন বিদ্যান হলেও পরিত্যাজ্য। আমি ছিলাম সেকালে অধম ছাত্র তাই এই ভাবসম্প্রসারনের আগামাথা না বুঝে কানা হাফেজের মত মুখস্ত করে কোন মতে পাশ করে এসেছি। সেসময় ভাল কোন উদাহরণ চোখের সামনে না থাকায় বইয়ের পাতা থেকে মুখস্ত করা ছাড়া উপায় ছিল না। বর্তমানে মিডিয়ার কারণে এই ভাবসম্প্রসারনের মর্ম কথা ভাল ভাবে বুঝতে পেরেছি । এখন যদি ক্লাস নাইনে পড়তাম তাহলে হয়ত ডাক্তার সাবরিনাকে ভিলেনের চরিত্রে বসিয়ে এযুগের সৃজনশীল পদ্ধতির আদলে সুন্দর করে এই ভাবসম্প্রসারনের লিখে গোল্ডেন এ প্লাস পাওয়ার একটা সুব্যবস্থা করতে পারতাম।

তবে যাই বলিনা কেন মানুষের মেধা এবং বুদ্ধি যদি সঠিক পথে কাজে না লাগে তাহলে সেই বুদ্ধি এবং মেধা আমাদের সমাজে আরও বেশি বিপদের সৃষ্টি করে। গত কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশে অনেক গুলো বড় ধরনের অপরাধ সৃষ্টিকারী অপরাধীকে আমরা দেখতে পেয়েছি। সম্প্রতি বাংলাদেশে বহুল আলোচিত অপরাধী মুখ পাপিয়া, সাহেদ, ডাক্তার সাবরিনা, আরিফ চৌধুরী, ওসি প্রদীপ কেউ কিন্তু কম মেধাবী কিংবা কম বুদ্ধিমান লোক নন। বুদ্ধিই যদি না থাকত তাহলে এতো বড় অপরাধের ঝুলি তাদের হাতের নাগালে আসতে পারত না। চিন্তা করতে পারেন পাপিয়া কিংবা সাহেদের মত মানুষ যাদের কিনা বাংলাদেশের সকল প্রভাবশালী লোকের সাথে চেনা যানা ছিল। কিন্তু কিভাবে সম্ভব? আমি কিংবা আপনি কেন পাড়ছি না? এটা কি শুধুই রাজনৈতিক প্রভাব? তাদের এই রাজনৈতিক প্রভাব কিভাবে আসল? কেউ কি তাদেরকে ঝাঁকা/বস্তা ভর্তি রাজনৈতিক প্রভাব বাসায় এসে দিয়ে গেছে? না, অবশ্যই তারা নিজের বুদ্ধি, মেধা এবং আমাদের সমাজের অন্য অপরাধীদের সহযোগিতায় নিজেকে আজকের এই আসনে নিয়ে এসেছেন। তবে হ্যাঁ আপনারা এটাকে বুদ্ধি না বলে অবশ্য কুবুদ্ধিও বলতে পারেন। তাই আমাদের সমাজ থেকে অপরাধীকে নয় অপরাধকে পরিচালিত করে এমন ব্যক্তি কিংবা সংগঠনকে খুঁজে খুঁজে নিস্ক্রিয় করতে পারলে তবেই অপরাধী নির্মূল হবে। মদের বোতল না ফেলে মদের ফ্যাক্টরী বন্ধ করতে হবে। তাহলে কিছুদিন পরে মদের বোতল আর খোঁজে পাওয়া যাবে না।

অপরাধী ভাই বোনদের বলেছি আপনার যে মেধা এবং বুদ্ধি আছে তা দিয়ে দেশে আপনার যথেষ্ট সুনাম অর্জনের সুযোগ আছে। কেন আপনি আপনার নিজের প্রশান্তিকে দূরে ঠেলে দিচ্ছেন? টাকার জন্য? সন্তান কিংবা পরিবারের সুখের জন্য? কিন্তু কিভাবে? একবার ভেবে দেখেন, আপনি আপনার বুদ্ধি দিয়ে শত শত মানুষকে দেশ থেকে বিদেশে দিনরাত একাকার করে ঘুরাতে পারছেন। তাহলে কেন আপনাকে অপরাধ করতে হবে? সমাজের জন্য কাজ করার যথেষ্ট বুদ্ধি, শক্তি, জনবল, নেটওয়ার্ক সবই আপনার আছে। আপনি তাহলে কেন সমাজে কিংবা দেশের আইনের সাথে লোকচুরি করছেন। শুধু তাই না দিন শেষে আপনাকে ঘুমানোর জন্য মদের বোতলে ডুব দিতে হচ্ছে, মনের শান্তির জন্য নাইট ক্লাবে যেতে হচ্ছে, দেহের প্রশান্তির জন্য নিজের বৈধ স্বামী/স্ত্রী রেখে অন্য পুরুষ কিংবা নারীর সাথে বিছানায় যেতে হচ্ছে। অবশেষে তৈরি হচ্ছে পারিবারিক, সামাজিক, কিংবা জাতীয় কলহ। এরপর একসময় অপরাধী হিসেবে ধরা পরে মিডিয়ার সামনে মাথা নিচু করে বসে থাকতে হচ্ছে আপনাকেই। অথচ আপনিই আপনার মেধা এবং বুদ্ধি দিয়ে হতে পারতেন পরিবারে, সমাজের কিংবা দেশের জন্য হিরো। যাতে মানুষ আপনাকে সম্মান করে সাড়া জীবন মনে রাখত। দিন শেষে হতে পারতেন পরিবারের প্রিয় ব্যাক্তি, সমাজের প্রিয়জন, দেশের প্রিয় মুখ। অথচ আপনার সামান্য ভুলের কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির স্বীকার হয়েছেন আপনি নিজে। দেশের মানুষের চোখে হয়েছেন অপরাধী, মিডিয়ার লোক খুঁজে বেড়াচ্ছে আপনার ছোট বড় সকল অপকর্ম। যে লোকটি আপনার টাকায় সংসার চালাচ্ছে সেও আজ আপনাকে দূরে ঠেলে দেবে। যাদের সুখের জন্য আপনি দুনিয়ার মধ্যে এতো কিছু করছেন সেই সন্তান কিংবা পরিবারের লোকেরাও আপনার অপরাধের জন্য সমাজে নানা ভাবে নির্যাতিত হবে এবং একসময় সেই সন্তান কিংবা পরিবারের লোকেরাই আপনাকে ঘৃণা করতে থাকবে। পরিশেষে আপনার কর্মের ফল হিসেবে থানা, পুলিশ, জেল, হাজত আপনাকেই ভোগ করতে হবে।

অপরাধ করে কেউ কোন দিন সুখী হতে পেড়েছে এমন উদাহরণ পৃথিবীতে নেই। তাই ক্ষণিকের সুখকে ভোগ না করে, বুদ্ধিকে শুদ্ধি পথে চালিয়ে আত্মতৃপ্তি নিয়ে জীবন চালান। নিজেও ভাল থাকবেন আমরাও ভাল থাকব। আমরা অপরাধীকে নয় অপরাধকে ঘৃণা করি, সচেতন সমাজ গড়ি।

ড. মোহাম্মদ আখেরুজ্জামান, টোকিও, জাপান।

 

 

 

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত