প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

স্বাস্থ্যখাতের সিন্ডিকেটও ক্ষমতার সঙ্গে যোগাযোগ রেখে চলে : আলী রিয়াজ

ফেসবুক থেকে : বাংলাদেশে যখন করোনাভাইরাসে আক্রান্ত এবং মৃত্যুর হার উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে, সেই সময়ে জানা গেলো যে, দেশের স্বাস্থ্য মন্ত্রী অফিসে গেছেন। অনেক দিন পরে তিনি অফিসে গেছেন। এই মন্ত্রণালয়ের দুই বিভাগের সচিব দপ্তরে অনুপস্থিত অনেক দিন ধরে- কারণ একজন করোনায় আক্রান্ত, অপরজনের স্ত্রী করোনায় মৃত্যুর পর আইসোলেশনে আছেন। মন্ত্রী অফিসে আসবেন এই খবর আসার পর – সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনের সূত্রে জানা গেলো – “সক্রিয় হয়ে ওঠেন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কমর্কতারা। প্রাণচাঞ্চল্য ফিরে আসে মন্ত্রণালয়ে। নথিপত্র নিয়ে ছোটাছুটি শুরু হয়।” মানুষের দুর্ভোগ, মৃত্যু, মহামারি এগুলোর কারনে নয় – মন্ত্রীর আগমনে ‘প্রাণচাঞ্চল্য” আসে মন্ত্রনালয়ে। করোনার আগে মন্ত্রীরা কোথাও গেলে তোরণ বানানো হতো। এই সময়ে তা হচ্ছেনা, ভাগ্যিস হচ্ছেনা, না হলে কেউ হয়তো তোরণ বানানোর পরামর্শ দিতে পারতেন। মন্ত্রী অফিসে যান না, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ডিজি) ‘স্ক্রিপ্ট দেখে পড়েন’; আর সেই কথা যখন মন্ত্রীর পছন্দ হয়নি তখন তা বদলে ফেলেন। প্রতিদিন স্বাস্থ্য বুলেটিনের নামে যে তথ্য দেয়া হয় তা কেউ বিশ্বাস করেন বলেও মনে হয় না। আর এইসব তথ্যের ভেতরে যে সব ফাঁক ফোকর আছে, গড়মিল তাতো কারো অজানা নেই।

দেশ শম্বুক গতিতে চলছে তাতে কি, দুর্নীতি চলছে বিদ্যুতের গতিতে। উদাহরণ তো অনেক। স্বাস্থ্য সরঞ্জাম কিনতে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় অনুমোদিত দুটি প্রকল্পের দিকে তাকালেই বুঝতে পারবেন। বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে একটি প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে এক হাজার ১১৭ কোটি টাকা। এর মধ্যে বিশ্বব্যাংক ঋণ দিচ্ছে ৮৫০ কোটি টাকা। বাকি ২৭৭ কোটি টাকা রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে দেওয়া হচ্ছে। এডিবির অর্থায়নে প্রকল্পের বাস্তবায়নে খরচ ধরা হয়েছে এক হাজার ৩৬৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে এডিবির ঋণ ৮৫০ কোটি টাকা। বাকি ৫১৫ কোটি টাকা দেওয়া হচ্ছে রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে। এরই মধ্যে দুটি প্রকল্পের কাজও শুরু হয়েছে। কী সব খরচ আর তার মাত্রা ধরা হয়েছে তা দেখলে ভিমড়ি খাবার জোগাড়। ৫শ টাকার গগলস ৫০০০ টাকা কিংবা ২ হাজারের পিপিই ৪৭০০ টাকায় কেনার প্রস্তাবের কথা বাদ দিলাম, বাদ দিলাম যে ১০ কোটি টাকায় ওয়েবসাইট উন্নয়ন হচ্ছে। দেশে যতগুলো স্থলবন্দর আছে, সেখানে যাতায়াত করা মানুষের শরীরের তাপমাত্রা দেখতে নির্মাণ করা হবে অনাবাসিক ভবন। সেসব ভবন নির্মাণে খরচ দেখানো হয়েছে ১৯০ কোটি টাকা। বুঝুন অবস্থা।
স্বাস্থ্য খাতে এক ধরণের সিন্ডিকেটের কথা এখন জোরে সোরে আলোচিত হচ্ছে, কিন্ত অনেকের কথা শুনে মনে হয় এই প্রথম তাঁরা এই বিষয়ে অবগত হলেন। অথচ গত বছরের ডিসেম্বর মাসে সংসদের পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির বৈঠকের পরে কমিটির একজন প্রভাবশালী সদস্য সাংবাদিকদের বলেছিলেন, ‘পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি মনে করছে, স্বাস্থ্য খাতে একটি সিন্ডিকেট কাজ করছে’ (প্রথম আলো, ২২ ডিসেম্বর ২০১৯)। তিনি বলেছিলেন “এটা কীভাবে ভাঙা যায় সে বিষয়ে পদক্ষেপ নিতে হবে”। পদক্ষেপ কে নেবে? পদক্ষেপ তো নেবে সরকার। এই ঘটনার প্রায় এক বছর আগের কথা বলি, “স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহেদ মালেক বলেছেন, স্বাস্থ্য খাতে খু্ব একটা অব্যবস্থা নেই। যতটুকু আছে তাও থাকবে না। শিগগির স্বাস্থ্য খাতে সিন্ডিকেট ও অনিয়মের বিরুদ্ধে শুদ্ধি অভিযান চলবে” ( যুগান্তর, ১৬ জানুয়ারি ২০১৯)। এই সিন্ডিকেট নিয়ে বাক্যবিস্তার চলছেই – এখন সব দোষ এই বায়বীয় সিন্ডিকেটের, কিংবা একজন ‘ছেলেধরার’ (কালের কন্ঠ ২৩ জুন ২০২০)।

আরেকটা কথা সবাই প্রায় ভুলে যাচ্ছেন ক্ষমতার সঙ্গে যোগাযোগ না থাকলে এই সব সিন্ডিকেট বা ‘ছেলে ধরা’রা আকাশ থেকে পড়েনা, মাটি থেকেও গজায় না। ক্ষমতার রন্ধ্রে রন্ধ্রে দুনীতি থাকবে, কিন্ত একজন দুইজনকে নিয়ে হৈ হৈ করলে কী ফল হয় তাতো জানাই আছে। চটকদার খবর হয়, আলোচনা জমজমাট হয়, আসল কথা এড়িয়ে অনেক উচ্চকন্ঠ হওয়া যায়।

 

সর্বাধিক পঠিত