প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

সক্ষমতা পাঁচ গুণ বেশি, তবু কচ্ছপগতি চট্টগ্রামের
করোনা পরীক্ষায় চট্টগ্রামের পাঁচ ল্যাব পেরে উঠছে না কক্সবাজারের সঙ্গে

চট্টগ্রাম প্রতিদিন প্রতিবেদন : চট্টগ্রামে করোনাভাইরাস পরীক্ষার পাঁচ পাঁচটি ল্যাব দিনে যখন ৬০০-৭০০ নমুনা পরীক্ষা করতেই হিমশিম খাচ্ছে, তখন কক্সবাজার মেডিকেল কলেজ ল্যাব দিনে করোনার নমুনা পরীক্ষা করছে একাই ৬০০-৭০০। চট্টগ্রামের পাঁচটি ল্যাবে শুধু যে করোনার নমুনা পরীক্ষা কম হচ্ছে তা নয়, এর মধ্যে জমে গেছে প্রায় ৪ হাজার নমুনার বিশাল পাহাড়ও। অথচ চট্টগ্রামের ল্যাবগুলোতে যে লোকবল আছে, তা কক্সবাজারের চেয়ে প্রায় পাঁচ গুণ বেশি। চট্টগ্রামে নমুনা পরীক্ষা হয় আটটি পিসিআর মেশিনে, অন্যদিকে কক্সবাজারে আছে শুধু দুটি।

তাহলে চট্টগ্রামকে ছাড়িয়ে কক্সবাজারের ‘ম্যাজিক’টা কোথায়— এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে দেখা গেল, গত ১৭ থেকে ১৯ জুন কক্সবাজার মেডিকেল কলেজ ল্যাবে করোনার নমুনা পরীক্ষা হয়েছে যথাক্রমে ৬৫৩, ৭৫০ ও ৬৬৯টি। গত দুদিনে সে সংখ্যাটি ছিল কম। ২০ ও ২১ জুন ওই ল্যাবে পরীক্ষা হয়েছে যথাক্রমে মাত্র ২২৪ ও ২৫৭টি নমুনা। যেখানে নিয়মিত ৬০০-৭০০ করে নমুনা পরীক্ষা হচ্ছিল, সেখানে হঠাৎ করে আড়াইশতের ঘরে কেন নেমে গেল দিনের টেস্টের সংখ্যা?

এই বিষয়ে জানতে চাইলে কক্সবাজার মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ ডা. অনুপম বড়ুয়া বলেন, ‘দিনে আমাদের ৬০০ থেকে ৭০০ পরীক্ষা করার সক্ষমতা আছে। কিন্তু এই দুদিন নমুনা কম পেয়েছি তাই কম পরীক্ষা হচ্ছে। ৬০০-৭০০ নমুনা এলেও পরীক্ষা করা যেতো।’

দুটি পিসিআর মেশিন ও ১৫ জন টেকনোলজিস্টের একটি ল্যাব নিয়ে এই যখন কক্সবাজারের করোনা পরীক্ষার অবস্থা তখন সম্পূর্ণ উল্টো চিত্র তার প্রতিবেশী ও দেশের বাণিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রামে।

করোনা পরীক্ষার পাঁচটি ল্যাবে আটটি পিসিআর মেশিন এবং কক্সবাজার ল্যাবের চেয়ে প্রায় ৫ গুণ বেশি লোকবল নিয়ে এখানে সবমিলিয়ে প্রতিদিন পরীক্ষা হচ্ছে মাত্র ৬০০ থেকে ৭৫০টি নমুনা। বিপরীতে জমে গেছে প্রায় চার হাজার নমুনার বিশাল পাহাড়। অবস্থা এমন এক পর্যায়ে গিয়ে ঠেকেছে যে, পরিস্থিতি সামাল দিতে চট্টগ্রাম থেকে গত সপ্তাহে তিন হাজার নমুনা ঢাকায় পাঠানো হয়েছে— যেগুলোর ফলাফল পাওয়া যায়নি এখনও।

চট্টগ্রামে বর্তমানে পাঁচটি ল্যাবে করোনার নমুনা পরীক্ষা হচ্ছে। এগুলো হচ্ছে বিআইটিআইডি ল্যাব, সিভাসু ল্যাব, চট্টগ্রাম মেডিকেল ল্যাব, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ল্যাব ও বেসরকারি ইমপেরিয়াল হাসপাতাল ল্যাব।

কক্সবাজারের কয়েক গুণ বেশি সক্ষমতা থাকার পরও করোনা টেস্টের এই সংকট কেন কাটিয়ে উঠতে পারছে না চট্টগ্রাম? তবে কি সক্ষমতায় এগিয়ে থেকেও সদিচ্ছায় কক্সবাজারের চেয়ে পিছিয়ে আছে চট্টগ্রাম— এমন প্রশ্ন নিয়ে চট্টগ্রাম প্রতিদিন মুখোমুখি হয়েছিল চট্টগ্রামের দুটি ল্যাবের প্রধানের সাথে।

তারা জানান, চট্টগ্রামে করোনা টেস্টের ক্ষেত্রে বাজেটের সমস্যা প্রকট। পাশাপাশি কিটের সরবরাহ প্রয়োজনের তুলনায় কম। এর মধ্যে অব্যবস্থাপনা ও সমন্বয়হীনতাও রয়েছে প্রচুর। লোকবল আপাতদৃষ্টিতে কক্সবাজারের চেয়ে বেশি মনে হলেও কক্সবাজার ল্যাবে কাজ করা ১৫ জন টেকনোলজিস্টের সবাই প্রফেশনাল এবং শুধুমাত্র টেস্টের কাজই তারা করেন। অন্যদিকে চট্টগ্রামে বেশিরভাগ টেকনোলজিস্টই স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করছেন। আবার একই সাথে তাদের নমুনা সংগ্রহ ও পরীক্ষা দুটোই করতে হচ্ছে।

চট্টগ্রামে লোকবলকে সবচেয়ে বড় সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করে ফৌজদারহাটের বিশেষায়িত হাসপাতাল বিআইটিআইডি ল্যাবের প্রধান ডা. শাকিল আহমেদ বলেন, ‘দেখুন কক্সবাজারে ১৫ জন টেকনোলজিস্ট কাজ করে। উনারা সবাই প্রফেশনাল। আর আমাদের এখানে লোকই নেই। কাজ করতে হচ্ছে স্বেচ্ছাসেবকদের নিয়ে। এই একই লোকদের নমুনা সংগ্রহ করতে হচ্ছে। সেটা পরীক্ষা করতে হচ্ছে। আবার ডাটা এন্ট্রি ও কম্পিউটার টাইপের কাজও করতে হচ্ছে।’

অব্যবস্থাপনা ও কিটের অপর্যাপ্ত সরবরাহের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমাদের পাঁচটি ল্যাবকে আলাদা আলাদা করে ঢাকা থেকে গিয়ে কিট আনতে হচ্ছে। দেখা যাচ্ছে ১০ হাজার টাকা খরচ করে একজনকে ঢাকায় পাঠানোর পর যে কিট পাওয়া গেল তাতে ২৫০ করে আমরা ৫-৬ দিন পরীক্ষা করতে পারছি। এখন এর চেয়ে বেশি গতিতে টেস্ট করলে তিন দিন পরে আবার কাউকে ঢাকা পাঠাতে হবে। এখানে কিছু সমস্যা আছে। যদি আমরা এসব বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকের কার্যালয় থেকে সংগ্রহ করতে পারতাম, তাহলেও কিছুটা চেঞ্জ দেখা যেতো। এখন ৪-৫ দিনের রি-এজেন্ট আনার জন্য ঢাকায় লোক পাঠাতে হয়। এটাও রিসোর্সের এক ধরনের অপচয়।’

সিভাসু ল্যাবের প্রধান ড. জুনায়েদ সিদ্দিকী বলেন, ‘আমরা সরকারের কাছ থেকে শুধু কিট পাই। এর বাইরে প্রতি টেস্টে আমাদের ১০০ টাকা করে বাড়তি খরচ আছে। যারা কাজ করছে তাদের থাকা খাওয়ার ব্যাপার আছে। এসব খরচের জন্য আমাদের কোনো ফান্ড নেই। ভার্সিটির ফান্ড থেকে দেওয়া হচ্ছে এসব। প্রতিদিন গড়ে ১৫০ করে নমুনা পরীক্ষা করলেও মাস শেষে ভার্সিটির ফান্ড থেকে ৫ থেকে ৬ লাখ টাকা খরচ হচ্ছে। এর বাইরে কিট সরবরাহের হিসেবটাও আমাদের মাথায় রাখতে হচ্ছে। তাছাড়া আমাদের এখানে যে ১০ জন কাজ করে তাদের সবাই ছাত্র। কেউই টেকনোলজিস্ট না।’

তিনি আরও বলেন, ‘সমন্বয়েরও কিছুটা অভাব আছে। আমরা এই শহরে পাঁচটি ল্যাবে কাজ করি। আমাদের নিজেদের মধ্যে সেভাবে সমন্বয় নাই। আমি কিটের জন্য আলাদা গাড়ি পাঠাচ্ছি ঢাকায়, বাকিরাও আলাদা পাঠাচ্ছে। অথচ চাইলে এগুলো সব এক জায়গা থেকে আমরা নিতে পারতাম। আমরা একসাথে বসে নিজেদের অভিজ্ঞতা, সমস্যা নিয়েও আলোচনা করলে অনেক কিছু সমৃদ্ধ হতো। এমন কিছুও হচ্ছে না।’

সিভিল সার্জন ডা. সেখ ফজলে রাব্বি চট্টগ্রাম প্রতিদিনকে বলেন, ‘কক্সবাজার বলতে গেলে আইইডিসিআরের (রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট) আরেকটা ব্রাঞ্চ। ওইখানে রোহিঙ্গারা থাকার কারণে আন্তর্জাতিকভাবে সব রকম সুবিধা কক্সবাজার ল্যাবকে দেওয়া হচ্ছে। জনবল থেকে শুরু করে কিট— সবকিছুই তাদের জন্য আলাদা। যাতে রোহিঙ্গাদের মাধ্যমে বাংলাদেশের মানুষের কিছু না হয়। তাই কক্সবাজার পুরো বাংলাদেশ থেকে আলাদা। কক্সবাজারের সাথে কারও তুলনা করা যাবে না। আন্তর্জাতিক সমর্থন ও তহবিল তাদের দেওয়া হয়েছে। বলতে গেলে আইইডিসিআরের আলাদা একটা প্রজেক্ট কক্সবাজার ল্যাব।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের আরটি-পিসিআর মেশিন কম, জনবল কম, কিটের স্বল্পতা কিছু রয়েছে। আবার টেকনিশিয়ান যারা কাজ করছে তাদের কয়েকজন কোভিড-১৯ পজিটিভ হয়ে গেছে। এ কারণে জনবল আরও কমে গেছে। সবমিলিয়ে যত নমুনা আমরা পরীক্ষা করতে পারবো, তার চেয়ে বেশি নমুনা সংগ্রহ হয়। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ল্যাবে যদি দিনে ৫০০ নমুনাও পরীক্ষা করা সম্ভব হয় তাহলে এই সমস্যা আর থাকবে না।’

সিভিল সার্জন বরাবরের মতো আশার বাণী শোনালেও প্রশ্ন থেকে যায় অনেক। করোনায় দেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চট্টগ্রামে করোনা পরীক্ষাটুকুও যদি করতে হয় ল্যাবগুলোর গাঁটের পয়সা খরচ করে, হাতেগোণা কয়েকজন টেকনোলজিস্টকে একই সাথে যদি নমুনা সংগ্রহ ও পরীক্ষা দুটোই করতে হয়, প্রয়োজনের তুলনায় কিটের সরবরাহই যদি খুব সামান্য হয়— তাহলে চট্টগ্রামে করোনাভাইরাসের বিস্তার কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে— এ নিয়ে শঙ্কায় রয়েছেন করোনা পরীক্ষা ও চিকিৎসার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অনেকেই।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত