প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

নটরাজ হুমায়ুন ফরিদীর জন্মদিন আজ

আলী আসগর স্বপন : জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র অর্থনীতিতে প্রথম শ্রেনীতে প্রথম। বীর মুুক্তিযোদ্ধা,ফরিদী নাটককেই বেশী ভালবাসতেন।তিনি অকালে মারা যান।

বাংলাদেশের মঞ্চনাটক, টেলিভিশন এবং সিনেমা জগতের অত্যন্ত জনপ্রিয় একজন অভিনেতা ছিলেন হুমায়ুন ফরীদি। অভিনয়ের সাবলীলতায় মঞ্চ, টিভি ও চলচ্চিত্রের কোটি মানুষকে মোহিত করেছেন এই অভিনেতা। দাপুটে অভিনয় করে মানুষকে হাসিয়েছেন, আবার কখনো বা কাঁদিয়েছেন।

১৯৮০র দশকে মঞ্চ নাটক দিয়ে তাঁর অভিনয় জীবন শুরু হলেও পরে অসংখ্য টিভি নাটকে এবং পরে এক দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি চলচ্চিত্রেও অভিনয় করে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। বিভিন্ন চরিত্রে সমান দক্ষতার সঙ্গে অভিনয় করার অসাধারণ ক্ষমতা ছিল হুমায়ুন ফরীদির। হুমায়ুন ফরীদি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের ছাত্র ছিলেন। ১৯৭৬ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম নাট্য উৎসব আয়োজনের মধ্যে দিয়ে ফরীদি বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্য অঙ্গনে ব্যাপক পরিচিত হয়ে ওঠেন।
হুমায়ুন ফরীদি একজন জন্ম অভিনেতা তিন দশকে চুটিয়ে অভিনয় করেছেন মঞ্চ, টেলিভিশন ও চলচ্চিত্রে। যেখানেই গিয়েছেন সাফল্যের বরপুত্র হয়েছেন। সব ক্ষেত্রেই যোগ করেছেন বহুমাত্রিক ব্যঞ্জনা।

অভিনেতা ও নাট্য সংগঠক হুমায়ুন ফরীদির জন্ম ১৯৫২ সালের ২৯ মে ঢাকার নারিন্দায়। তাঁর বাবার নাম এটিএম নূরুল ইসলাম ও মায়ের নাম বেগম ফরিদা ইসলাম। দুই ভাই তিন বোনের মধ্যে হুমায়ুন ফরীদি ছিলেন দ্বিতীয়। বাবার বদলির চাকরীর সুবাদে ফরীদিকে মৌলভীবাজার, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, চাঁদপুর, কিশোরগঞ্জ, মাদারীপুরসহ অসংখ্য জেলায় ঘুরতে হয়েছে। ছোটবেলায় ছন্নছাড়া স্বভাবের জন্য ফরীদিকে ‘পাগলা’ ‘সম্রাট’,‘গৌতম’-এমন নানা নামে ডাকা হত। তিনি নিজ গ্রাম গাজীপুরের কালীগঞ্জে প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করেন। এরপর মাদারীপুর ইউনাইটেড উচ্চ বিদ্যালয় হতে ১৯৬৮ সালে এসএসসি এবং চাঁদপুর কলেজ থেকে ১৯৭০ সালে এইচএসসি পাস করেন। হুমায়ুন ফরীদি ১৯৭০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জৈব রসায়ন (অর্গানিক কেমিস্ট্রিতে) বিভাগে অনার্স কোর্সে ভর্তি হন, কিন্তু মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে পিতার কর্মস্থল চাঁদপুর ঘুরে চলে গেলেন যুদ্ধে।

নয় মাসের যুদ্ধ শেষে লাল-সবুজের পতাকা হাতে ঢাকায় ফিরলেও ঢাকা ভার্সিটিতে তিনি আর ফেরেননি। স্বাধীনতার পর টানা পাঁচ বছর বোহেমিয়ান জীবন কাটিয়ে শেষে তিনি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি বিভাগে স্নাতক (সম্মান) কোর্সে ভর্তি হন। স্নাতক ফাইনাল পরীক্ষায় তিনি প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হন। তিনি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে নাট্যচর্চার সাথে জড়িয়ে পড়েন। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি বিশিষ্ট নাট্যকার, বিশ্ববিদ্যলায়ের পুরোধা ব্যক্তিত্ব সেলিম আল দীনের সংস্পর্শে আসেন, তার ঘনিষ্ঠ সহযোগীও হয়ে ওঠেন। এই ক্যাম্পাসেই ‘আত্মস্থ ও হিরন্ময়ীদের বৃত্তান্ত’ নামে একটি নাটক লিখে নির্দেশনা দেন এবং অভিনয়ও করেন। ১৯৭৬ সালে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে তিনি ঢাকা থিয়েটারে যোগ দেন এবং নাট্যোৎসবের প্রধান আয়োজক হিসেবে কাজ করে সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করেন, উৎসবে সূত্রেই তিনি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় অঙ্গনে তাঁর ব্যাপক পরিচিতি গড়ে ওঠে।

স্বাধীনতা উত্তরকালে বাঙালির নিজস্ব নাট্য আঙ্গিক গঠনে গ্রাম থিয়েটারের ভূমিকা অসামান্য। এর মূল সঞ্চালক ছিলেন কয়েকজন নাট্য ব্যক্তিত্ব যেমন সেলিম আল দীন, নাসির উদ্দীন ইউসুফ বাচ্চু, আফজাল হোসেন, গোলাম মোস্তফা, পিযূষ বন্দোপাধ্যায়, সুবর্ণা মোস্তফা এবং হুমায়ুন ফরীদি। ঢাকা থিয়েটারে ‘ভূত’ নাটক নির্দেশনার মাধ্যমে মঞ্চ নাট্যধারায় অভিষেক ঘটে হুমায়ুন ফরীদির। সেলিম আল দীনের ‘সংবাদ কার্টুন’-এ একটি ছোট্ট চরিত্রে অভিনয় করে হুমায়ুন ফরীদি মঞ্চে উঠে আসেন। অবশ্য এর আগে ১৯৬৪ সালে মাত্র ১২ বছর বয়সে কিশোরগঞ্জে মহল্লার নাটক ‘এক কন্যার জনক’-এ অভিনয় করেন। বাংলাদেশে যখন নাট্য মঞ্চের সংকট তখন তিনি মহিলা সমিতি এবং গাইড হাউজ থেকে মঞ্চনাটকে অভিনয় চালিয়ে যান। বেশ কিছু মঞ্চ নাটকে অভিনয় করে ব্যাপক খ্যাতি অর্জন করেন। তাঁর অভিনীত মঞ্চ নাটকগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে- শকুন্তলা, কির্তনখোলা, কেরামত মঙ্গল, মুনতাসীর ফ্যান্টাসি এবং ফণীমনসা, ধূর্ত উইঁ। মঞ্চ নাটককে প্রসারিত করার লক্ষ্যে তিনি গড়ে তোলেন নাটক কেন্দ্রিক বিভিন্ন সংগঠন। গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশন ও গ্রাম থিয়েটার এর অন্যতম। বাংলাদেশ গ্রাম থিয়েটারের সদস্য হিসেবে তিনি গ্রাম থিয়েটারের চট্টগ্রাম বিভাগীয় প্রধান হিসেবে কাজ করেছেন।

টেলিভিশন নাটকে হুমায়ুন ফরীদির অভিষেক ঘটে নিখোঁজ সংবাদ নাটকের মধ্যদিয়ে।এরপর তিনি অসংখ্য নাটকে অভিনয় করেছেন। সংশপ্তক নাটকের কান কাটা রমজান চরিত্রটি ফরীদিকে বাঙলা নাট্যামোদী দর্শকের কাছে ব্যাপক পরিচিতি এনে দেয়। তিনি টেলিভিশন নাট্যাভিনয়ের প্রথাগত ধ্যান ধারণা ভেঙ্গে সৃষ্টি করেন এক নতুন অভিনয় ধারা।

চলচ্চিত্রে তাঁর আগমন ঘটে তানভীর মোকাম্মেলের হুলিয়া ছবির মাধ্যমে। প্রথম বাণিজ্যিক চলচ্চিত্র শহীদুল ইসলাম খোকন পরিচালিত ‘সন্ত্রাস’। চলচ্চিত্রে তিনি খল চরিত্রে অভিনয় করে এক নতুন মাত্রা আনেন। হুমায়ুন ফরীদি কিছু বাংলা চলচ্চিত্রে খলনায়কের অভিনয় করে ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করেন। তিনি একাধারে আর্ট ফিল্ম এবং বাণিজ্যিক ধারার চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন। আর্ট ফিল্মে তাঁর অভিনীত চলচ্চিত্রের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো হুলিয়া, ব্যাচেলর, আহা, মাতৃত্ব, বহুব্রীহি, মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্র জয়যাত্রা, শ্যামল ছায়া ও একাত্তরের যিশু। তাঁর অভিনীত বাণিজ্যিক ধারার চলচ্চিত্রের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো দহন, সন্ত্রাস, বিশ্বপ্রেমিক, ত্যাগ, মায়ের মর্যাদা, অধিকার চায়, মায়ের অধিকার, ভন্ড, রিটার্ন টিকেট, প্রাণের চেয়ে প্রিয়, কখনো মেঘ কখনো বৃষ্টি, দূরত্ব, পদ্মানদীর মাঝি ইত্যাদি। হুমায়ুন ফরীদি চলচ্চিত্র জগতে প্রবেশ করে সেখানেও তিনি বিপুল জনপ্রিয়তা লাভ করেন।

বাংলাদেশের নাট্য ও সিনেমা জগতে তিনি অসাধারণ ও অবিসংবাদিত চরিত্রে অভিনয়ের জন্য স্মরণীয় হয়ে আছেন।
দারুণ বুদ্ধিদীপ্ত এবং রোমান্টিক এ মানুষটি ব্যক্তিগত জীবনে প্রথমে তার সহপাঠীর বোন ফরিদপুরের মেয়ে নাজমুন আরা বেগম মিনুর গলায় বেলী ফুলের মালা দিয়ে বিয়ে করেছিলেন। তখন এ বিয়ে সারা দেশে ব্যাপক আলোড়ন তোলে। এ ঘরে তাদের একটি কন্যাসন্তান রয়েছে। নাম দেবযানি। পরে তিনি ঘর বাঁধেন প্রখ্যাত অভিনেত্রী সুবর্ণা মুস্তাফার সঙ্গে। কিন্তু ২০০৮ সালে তাদের বিচ্ছেদ হয়ে যায়।

হুমায়ুন ফরীদি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যকলা বিভাগে অতিথি শিক্ষক হিসেবে অভিনয় বিষয়ে কিছুদিন পাঠ দান করেন। তিনি বাংলা চলচ্চিত্রে অশ্লীলতা রোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। তাঁকে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪০ বছর পূর্তি উৎসবে সম্মাননা প্রদান করা হয়। ২০০৪ সালে মাতৃত্ব ছবির জন্য জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করেন।

২০১২ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি (১ ফাল্গুন) সকাল ১০টার দিকে ধানমন্ডিতে নিজের বাসায় বাথরুমে পড়ে গিয়ে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৬০ বছর। মৃত্যুর বেশ কিছুদিন আগে থেকেই ফুসফুসের জটিলতাসহ নানা সমস্যার কারণে তিনি অসুস্থ ছিলেন।

ফেসবুক থেকে

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত