প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

ক্যাসিনোর বাস্তবতা ও আমাদের করণীয়

ইমদাদুল হক যুবায়ের : ‘ক্যাসিনো’ ইতালিয়ান শব্দ। ক্যাসিনো বলতে বোঝায় যেখানে জুয়া, নাচ, গান ও বিভিন্ন খেলাধুলার সংমিশ্রণ থাকে। অভিধানে এর অর্থ হলো- নাচঘর; জুয়া খেলার ঘর; তাসখেলা; বা আমোদপ্রমোদের কক্ষ। বাংলা একাডেমির ‘ইংলিশ-বাংলা ডিকশনারীতে’ এর অর্থ বলা হয়েছে, ‘জুয়া ও অন্যান্য বিনোদনমূলক ক্রিয়াকলাপের জন্য ব্যবহৃত কক্ষ বা ভবন; সর্বসাধারণের জন্য উম্মুক্ত নৃত্যশালা।’ প্রতিরাতে বা প্রায়শ ক্যাসিনোয় যাওয়া, গিয়ে কিছুক্ষণ ঘুরে আসা, বা পকেট খালি করে বা পকেট ভরে নীড়ে ফেরা লোকগুলো জুয়াসক্ত আসল জুয়াড়ি। এরা এক ধরণের মানসিক রোগীও বটে। এই রোগ থেকে বেরিয়ে আসা অনেক কঠিন।

জুয়া যখন একজন মানুষের চিন্তা-ভাবনা, কাজ-কর্ম, আচার-আচরণ-সবকিছু নীরবে গ্রাস করে নেয়, যখন বারবার চেষ্টা করার পরও সেই কাজ থেকে বিরত থাকা যায় না, ধীরে ধীরে অর্থনৈতিক, পারিবারিক বা সামাজিক সমস্ত সম্পর্ক নষ্ট হতে থাকে, তখন ব্যক্তি মানসিক রোগীতে পরিণত হওয়ার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। কেউ ব্যবসায়ের নামে, কেউ লোভনীয় পুরষ্কারের অফার দিয়ে সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে এটাকে ছড়িয়ে দিচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায় সমাজের প্রভাবশালী লোকেরা এর পিছনে ইন্ধন জোগায়। এ ক্ষেত্রে অনেকে জানে, তারা যা করছে সেটা হারাম বা অন্যায়। আবার অনেকে জানেই না যে, লটারী বা জুয়া খেলা হারাম।

আরবি ভাষায় জুয়াকে বলে ‘মাইসির’ আর মদকে বলে ‘খিমার’। আর খিমার এবং মাইসির শব্দ দু’টি সমার্থবোধক শব্দ। আবার বাংলা ও উর্দুতে এর প্রতিশব্দ হচ্ছে জুয়া। ইসলামি শরিয়তে জুয়ার যাবতীয় প্রক্রিয়াকে হারাম ও নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন, হে মুমিনগণ! মদ, জুয়া, প্রতিমা এবং ভাগ্য নির্ধারক শরগুলো শয়তানের কার্য বৈ কিছু নয়। অতএব, এগুলো থেকে বেঁচে থাক, যাতে তোমরা কল্যাণ প্রাপ্ত হও। শয়তান তো চায়, মদ ও জুয়ার মাধ্যমে তোমাদের পরস্পরের মাঝে শত্রুতা ও বিদ্বেষ সঞ্চারিত করে দিতে এবং আল্লাহর স্মরণ ও নামাজ থেকে তোমাদের বিরত রাখতে। অতএব, তোমরা এখন কি নিবৃত্ত হবে? (সূরা মায়েদাহ : ৯০-৯১)

আব্দুল্লাহ ইবনে আমর (রা.) থেকে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘পিতা-মাতার অবাধ্য সন্তান, জুয়ায় অংশগ্রহণকারী, খোঁটাদাতা ও মদ্যপায়ী জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না। (দারেমি, হাদীস নং ৩৬৫৬) কিছু লোকের কাছে মনে হতে পারে জুয়া একটি লাভজনক ব্যবসা কিন্তু এর সামান্য কিছু লাভ থাকলেও ক্ষতির পরিমাণ তার চেয়ে বহুগুণে বেশি। যেমন- কালামে বারী তায়ালা হলো, হে মুহাম্মদ! তারা আপনাকে মদ এবং জুয়া সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে। আপনি বলে দিন, এ দুটোর মধ্যে রয়েছে মহাপাপ। আর এতে মানুষের জন্য সামান্য কিছু উপকারিতাও রয়েছে। তবে এগুলোতে উপকারিতা অপেক্ষা ক্ষতির পরিমাণ অনেক বেশি। (সূরা বাকারা : ২১৯)

জাহেলি যুগে জুয়া খেলার প্রচলন চালু ছিল। সে সময়ে শুধুমাত্র ধন-সম্পদের উপরেই জুয়া হত না, বরং কখনো কখনো স্ত্রীদেরকেও জুয়ার সওদা হিসেবে পেশ করা হত। যা ধীরে ধীরে আমাদের সমাজ ব্যবস্থায় প্রবেশ করতে শুরু করেছে। লটারী, জুয়া খেলাকে আপাত:দৃষ্টিতে নির্দোষ আনন্দ মনে হলেও এর সামাজিক, অর্থনৈতিক প্রভাব ভয়ংকর। শুধু আমেরিকাতেই বছরে ৫৪ বিলিয়ন ডলার অর্থনৈতিক ক্ষতি হয় জুয়ার কারণে।

আমাদের সমাজে আজ লটারীর নামে প্রকাশ্যে অপ্রকাশ্যে, অলিতে গলিতে, শহরে কিংবা গ্রামে নামে বেনামে জুয়ার রমরমা ব্যবসা চলছে। কৃষক, তরুণ, শ্রমিক, ব্যবসায়ী, শিক্ষার্থীরা জড়িয়ে পড়ছেন মরণনেশা জুয়ায়। এসব আসরে উড়ছে লাখ লাখ টাকা। সচেতন মহল আজ দেখেও না দেখার ভান করছে। আজ যদি ধর্মপ্রাণ মানুষেরা অনৈতিক এসব কর্মকাণ্ড বন্ধে প্রতিবাদ না করে মুখ বন্ধ করে বসে থাকেন, সমাজের কর্তা ব্যক্তিরা নিজ নিজ অবস্থান থেকে এর প্রতিরোধে কাজ না করেন তাহলে প্রকাশ্যে আল্লাহর সাথে বিদ্রোহের শাস্তি থেকে আমরা কেউই রক্ষা পাবো না।

লেখক: শিক্ষক, জালালাবাদ ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল এন্ড কলেজ।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ